ঢাকা ০৬:০৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

প্রাকৃতিক দুর্যোগে বান্দরবানের রোয়াংছড়ির পর্যটন খাত চরম স্থবির

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১১:১৭:০০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

সাম্প্রতিক সময়ে অনবরত ও ভারী বর্ষণ, ভয়াল পাহাড়ি ঢল এবং আকস্মিক বন্যার কারণে পার্বত্য বান্দরবান জেলার রোয়াংছড়ি উপজেলার সার্বিক পর্যটন খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে বিভিন্ন প্রধান সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এবং সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে পর্যটন কেন্দ্রগুলো বন্ধ রাখার কারণে স্থানীয় শতাধিক নিবন্ধিত পর্যটক গাইড, নৌকার মাঝি এবং পর্যটন খাতের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল শত শত সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ সম্পূর্ণ কর্মহীন হয়ে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

পার্বত্য এলাকার পুরোপুরি পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল এই পরিবারগুলো হঠাৎ করে দৈনন্দিন আয়-রোজগারের সব পথ হারিয়ে চরম খাদ্য সংকট এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের তীব্র অভাবের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকার বহু পরিবার তাদের কোমলমতি শিশু, নারী এবং বয়স্ক সদস্যদের নিয়ে চরম অসহায়ত্ব ও দুর্ভোগের মধ্যে প্রতিদিন অতিবাহিত করছে।

বান্দরবানের রোয়াংছড়ির অন্যতম জনপ্রিয় ও আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র ‘দেবতাখুম’-কে কেন্দ্র করে স্থানীয় যেসব ক্ষুদ্র অর্থনীতি ও জীবিকার ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, পাহাড়ি ঢলের আঘাতে তা এক মুহূর্তে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। সাম্প্রতিক পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট তীব্র ও প্রমত্তা স্রোতের তোড়ে দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটক পারাপারের কাজে ব্যবহৃত ৮টি ইঞ্জিনচালিত ও সাধারণ নৌকা এবং প্রায় ৭০টির মতো ঐতিহ্যবাহী বাঁশের ভেলা সম্পূর্ণ ভেসে গিয়ে ধ্বংস হয়ে গেছে। স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ীদের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এতে আনুমানিক ১০ থেকে ১২ লাখ টাকার মতো বিশাল প্রত্যক্ষ আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে।

সাধারণ পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে রোয়াংছড়ি উপজেলা প্রশাসন পূর্বেই গত ২০ জুলাই পর্যন্ত দেবতাখুম পর্যটনকেন্দ্রে সকল প্রকার পর্যটক প্রবেশ ও অবস্থান সম্পূর্ণরূপে বন্ধ ঘোষণা করেছিল। তবে নির্ধারিত নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা শেষ হলেও, ভেসে যাওয়া নৌকা ও ধ্বংসপ্রাপ্ত ভেলাগুলো নতুন করে পুনর্ব্যবস্থাপনা বা তৈরি না করা পর্যন্ত আগের মতো স্বাভাবিকভাবে পর্যটক সেবা দেওয়া আদৌ সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয় ও অনিশ্চয়তা প্রকাশ করছেন এই খাতের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও স্থানীয় প্রতিনিধিরা।

এই মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট প্রসঙ্গে রোয়াংছড়ি উপজেলা টুরিস্ট গাইড কল্যাণ সমবায় সমিতি লিমিটেডের সম্মানিত সভাপতি চিংনুমং মারমা অত্যন্ত ক্ষোভ ও উদ্বেগের সাথে জানান, টানা ভারী বৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তাঁদের পেশাদার গাইড ও মাঝিদের সাধারণ জীবন-জীবিকা পুরোপুরি লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। বর্তমানে তাঁদের প্রতিদিনের উপার্জনের সকল পথ পুরোপুরি বন্ধ। ফলে অনেক পরিবার এখন ঘরে তীব্র খাদ্য সংকটে ভুগছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারি বা বেসরকারিভাবে দ্রুত ত্রাণ সহায়তা বা খাদ্যসামগ্রী পৌঁছানো না গেলে এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পক্ষে পরিবার নিয়ে টিকে থাকা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।

এদিকে স্থানীয় ভুক্তভোগী বাসিন্দাদের চরম অভিযোগ, দুর্যোগ আঘাত হানার পর বেশ কয়েক দিন অতিবাহিত হয়ে গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত টুরিস্ট গাইড, নৌকার মাঝি এবং পর্যটনসংশ্লিষ্ট সাধারণ শ্রমজীবীদের মানবিক সহায়তায় এখন পর্যন্ত কোনো প্রকার দৃশ্যমান সরকারি অর্থ সহায়তা বা কার্যকর পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু করা হয়নি। সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতি ও মানবিক সংকটের বিষয়ে রোয়াংছড়ি উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাজমিন আলম তুলি জানান, বন্যাকবলিত ও ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা ইতিমধ্যেই তৈরি করা হয়েছে। পরবর্তীতে সরকারি প্রয়োজনীয় অর্থ বা ত্রাণ বরাদ্দ প্রাপ্তি সাপেক্ষে তাদের পুনর্বাসন অথবা আর্থিক সহায়তার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এমন চরম দুর্ভোগময় অবস্থায় রোয়াংছড়ির দেখা দেওয়া মানবিক সংকট মোকাবিলা করা এবং পর্যটননির্ভর প্রান্তিক পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা রক্ষায় অবিলম্বে জরুরি খাদ্য ত্রাণ সহায়তা প্রদান, ক্ষতিগ্রস্ত নৌযান ও বাঁশের ভেলা নতুন করে পুনর্বাসনে আর্থিক সাহায্য করা এবং সার্বিক পর্যটন খাতকে দ্রুত সচল করতে সরকারি জোর উদ্যোগ গ্রহণের আকুল দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ভুক্তভোগী বাসিন্দা ও ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমজীবী মানুষ।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

রাজধানীতে স্ত্রীকে জবাই করে হত্যা: স্বামীর মৃত্যুদণ্ড, ১ লাখ টাকা জরিমানা

প্রাকৃতিক দুর্যোগে বান্দরবানের রোয়াংছড়ির পর্যটন খাত চরম স্থবির

আপডেট সময় : ১১:১৭:০০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

সাম্প্রতিক সময়ে অনবরত ও ভারী বর্ষণ, ভয়াল পাহাড়ি ঢল এবং আকস্মিক বন্যার কারণে পার্বত্য বান্দরবান জেলার রোয়াংছড়ি উপজেলার সার্বিক পর্যটন খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে বিভিন্ন প্রধান সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এবং সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে পর্যটন কেন্দ্রগুলো বন্ধ রাখার কারণে স্থানীয় শতাধিক নিবন্ধিত পর্যটক গাইড, নৌকার মাঝি এবং পর্যটন খাতের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল শত শত সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ সম্পূর্ণ কর্মহীন হয়ে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

পার্বত্য এলাকার পুরোপুরি পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল এই পরিবারগুলো হঠাৎ করে দৈনন্দিন আয়-রোজগারের সব পথ হারিয়ে চরম খাদ্য সংকট এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের তীব্র অভাবের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকার বহু পরিবার তাদের কোমলমতি শিশু, নারী এবং বয়স্ক সদস্যদের নিয়ে চরম অসহায়ত্ব ও দুর্ভোগের মধ্যে প্রতিদিন অতিবাহিত করছে।

বান্দরবানের রোয়াংছড়ির অন্যতম জনপ্রিয় ও আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র ‘দেবতাখুম’-কে কেন্দ্র করে স্থানীয় যেসব ক্ষুদ্র অর্থনীতি ও জীবিকার ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, পাহাড়ি ঢলের আঘাতে তা এক মুহূর্তে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। সাম্প্রতিক পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট তীব্র ও প্রমত্তা স্রোতের তোড়ে দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটক পারাপারের কাজে ব্যবহৃত ৮টি ইঞ্জিনচালিত ও সাধারণ নৌকা এবং প্রায় ৭০টির মতো ঐতিহ্যবাহী বাঁশের ভেলা সম্পূর্ণ ভেসে গিয়ে ধ্বংস হয়ে গেছে। স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ীদের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এতে আনুমানিক ১০ থেকে ১২ লাখ টাকার মতো বিশাল প্রত্যক্ষ আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে।

সাধারণ পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে রোয়াংছড়ি উপজেলা প্রশাসন পূর্বেই গত ২০ জুলাই পর্যন্ত দেবতাখুম পর্যটনকেন্দ্রে সকল প্রকার পর্যটক প্রবেশ ও অবস্থান সম্পূর্ণরূপে বন্ধ ঘোষণা করেছিল। তবে নির্ধারিত নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা শেষ হলেও, ভেসে যাওয়া নৌকা ও ধ্বংসপ্রাপ্ত ভেলাগুলো নতুন করে পুনর্ব্যবস্থাপনা বা তৈরি না করা পর্যন্ত আগের মতো স্বাভাবিকভাবে পর্যটক সেবা দেওয়া আদৌ সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয় ও অনিশ্চয়তা প্রকাশ করছেন এই খাতের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও স্থানীয় প্রতিনিধিরা।

এই মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট প্রসঙ্গে রোয়াংছড়ি উপজেলা টুরিস্ট গাইড কল্যাণ সমবায় সমিতি লিমিটেডের সম্মানিত সভাপতি চিংনুমং মারমা অত্যন্ত ক্ষোভ ও উদ্বেগের সাথে জানান, টানা ভারী বৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তাঁদের পেশাদার গাইড ও মাঝিদের সাধারণ জীবন-জীবিকা পুরোপুরি লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। বর্তমানে তাঁদের প্রতিদিনের উপার্জনের সকল পথ পুরোপুরি বন্ধ। ফলে অনেক পরিবার এখন ঘরে তীব্র খাদ্য সংকটে ভুগছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারি বা বেসরকারিভাবে দ্রুত ত্রাণ সহায়তা বা খাদ্যসামগ্রী পৌঁছানো না গেলে এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পক্ষে পরিবার নিয়ে টিকে থাকা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।

এদিকে স্থানীয় ভুক্তভোগী বাসিন্দাদের চরম অভিযোগ, দুর্যোগ আঘাত হানার পর বেশ কয়েক দিন অতিবাহিত হয়ে গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত টুরিস্ট গাইড, নৌকার মাঝি এবং পর্যটনসংশ্লিষ্ট সাধারণ শ্রমজীবীদের মানবিক সহায়তায় এখন পর্যন্ত কোনো প্রকার দৃশ্যমান সরকারি অর্থ সহায়তা বা কার্যকর পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু করা হয়নি। সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতি ও মানবিক সংকটের বিষয়ে রোয়াংছড়ি উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাজমিন আলম তুলি জানান, বন্যাকবলিত ও ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা ইতিমধ্যেই তৈরি করা হয়েছে। পরবর্তীতে সরকারি প্রয়োজনীয় অর্থ বা ত্রাণ বরাদ্দ প্রাপ্তি সাপেক্ষে তাদের পুনর্বাসন অথবা আর্থিক সহায়তার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এমন চরম দুর্ভোগময় অবস্থায় রোয়াংছড়ির দেখা দেওয়া মানবিক সংকট মোকাবিলা করা এবং পর্যটননির্ভর প্রান্তিক পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা রক্ষায় অবিলম্বে জরুরি খাদ্য ত্রাণ সহায়তা প্রদান, ক্ষতিগ্রস্ত নৌযান ও বাঁশের ভেলা নতুন করে পুনর্বাসনে আর্থিক সাহায্য করা এবং সার্বিক পর্যটন খাতকে দ্রুত সচল করতে সরকারি জোর উদ্যোগ গ্রহণের আকুল দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ভুক্তভোগী বাসিন্দা ও ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমজীবী মানুষ।