ঢাকা ০৬:১০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

আখেরি চাহার সোম্বা: ইতিহাস, বাস্তবতা ও করণীয়

মুসলিম সমাজে প্রচলিত অন্যতম একটি আলোচিত দিবস হলো ‘আখেরি চাহার সোম্বা’। শব্দগত বিশ্লেষণে দেখা যায়, এটি মূলত আরবি ও ফারসি ভাষার একটি মিশ্র বাক্য। এর শাব্দিক অর্থ হলো ‘শেষ’। ফারসি ভাষায় ‘চাহর’ শব্দের অর্থ হলো ‘সফর মাস’ এবং ফারসি ‘সোম্বা’ শব্দের অর্থ হলো ‘বুধাবার’। ফলে সামগ্রিক শব্দার্থের বিচারে ‘আখেরি চাহর সোম্বা’ বলতে হিজরি সনের সফর মাসের শেষ বুধবারকে বোঝানো হয়ে থাকে।

আখেরি চাহার সোম্বা কী ও এর উদযাপন: সাধারণ পরিভাষায়, হিজরি সনের সফর মাসের শেষ বুধবারই হলো আখেরি চাহার সোম্বা। প্রচলিত একটি দীর্ঘ বিশ্বাস ও মতানুযায়ী, এই নির্দিষ্ট দিনে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর জীবনের এক প্রচণ্ড অসুস্থতা থেকে সাময়িক সুস্থতা অনুভব করেছিলেন। তাঁর এই সুস্থতার সংবাদে আনন্দিত হয়ে সাহাবায়ে কেরাম খুশি মনে বিপুল পরিমাণ দান-সদকা করেন এবং মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করেছিলেন। এই বিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই বিশ্বের কোনো কোনো দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা এই দিনে দান-সদকাসহ বিভিন্ন নফল ইবাদত-বন্দেগি পালন করে থাকেন। বাংলাদেশেও এই দিবসটি উদযাপন উপলক্ষ্যে বার্ষিক সরকারি ছুটির তালিকায় একটি ঐচ্ছিক ছুটি হিসেবে রাখা হয়েছে। তবে এ দেশের আলেম ও ইসলামি পণ্ডিতদের মধ্যে এই দিবসটি পালন করার বৈধতা ও ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে বিস্তর মতপার্থক্য এবং বিতর্ক দেখা যায়।

যারা এই দিবসটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালন করে থাকেন, তারা মূলত মহানবী (সা.)-এর জীবনের দুটি ভিন্ন সময়ের অসুস্থতার ঘটনাকে এর পেছনে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। একদল দাবি করেন, সপ্তম হিজরিতে মহানবী (সা.) একবার জাদুতে আক্রান্ত হয়ে প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন এবং দীর্ঘ অসুস্থতার পর সফর মাসের শেষ বুধবারে তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেন। আবার অন্য দলের মতে, মহানবী (সা.) মৃত্যুর আগে যে কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন, সেই সময় সফর মাসের শেষ বুধবারে তিনি কিছুটা সুস্থতা অনুভব করেন এবং নিজে হেঁটে মসজিদে নামাজ পড়তে আসেন। মসজিদে এসে তিনি তখন হযরত আবু বকর (রা.)-কে ইমামতির দায়িত্ব দেন। তবে সেই বুধবারের পর তিনি পুনরায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। মহানবী (সা.)-কে সুস্থ অবস্থায় মসজিদে আসতে দেখে উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম অত্যন্ত আনন্দিত হন এবং শুকরিয়া স্বরূপ নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রচুর দান-সদকা করেছিলেন। এই ঘটনাকে স্মরণ করেই অনেকে প্রতি বছর সফর মাসের শেষ বুধবারে ‘আখেরি চাহার সোম্বা’ পালন করেন। তবে ঐতিহাসিক সত্য হলো, মহানবী (সা.)-এর মৃত্যুর পরে সাহাবায়ে কেরাম এবং তাবেয়িদের মধ্যে কেউই কখনো এই দিনটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদযাপন করেননি।

প্রচলিত বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে যে, রাসুল (সা.)-এর সুস্থতার খুশিতে হযরত আবু বকর (রা.) ৭ হাজার দিনার, হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) ৫ হাজার দিনার, হযরত ওসমান (রা.) ১০ হাজার দিনার, হযরত আলী (রা.) ৩ হাজার দিনার এবং হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) ১০০টি উট ও ১০০টি ঘোড়া আল্লাহর রাস্তায় দান করেছিলেন। এইসব অতি পরিচিত বর্ণনা মূলত ‘বারো চান্দের ফজিলত’ ও ‘রাহাতুল কুলুব’ নামক বইগুলোতে উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে আধুনিক ইসলামি পণ্ডিত, গবেষক ও মুহাদ্দিসগণ এই দুটি কিতাবে বর্ণিত এবং সমাজে বহুল প্রচলিত সফর মাসের শেষ বুধবারের এই পুরো ঘটনাটিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, প্রামাণ্যহীন ও অসত্য বলে দাবি করেছেন।

ঐতিহাসিক তথ্যের অসংগতি ও বাস্তবতা: ইসলামি গবেষকদের মূল বক্তব্য হলো, মহানবী (সা.)-এর অসুস্থ হওয়ার সুনির্দিষ্ট দিন ও ক্ষণ নিয়ে ইতিহাসে যথেষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে, যার কারণে নির্দিষ্ট কোনো দিনকে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা একেবারেই অসম্ভব। যদিও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অসুস্থতার বিবরণ অসংখ্য নির্ভরযোগ্য হাদিসে বিস্তারিতভাবে এসেছে, কিন্তু কোনো হাদিসেই এর নির্দিষ্ট দিন বা তারিখের উল্লেখ নেই। প্রখ্যাত তাবেয়ি ইবনে ইসহাকের মতে, মহানবী (সা.) যে অসুস্থতায় ইন্তেকাল করেছিলেন, তার সূচনা হয়েছিল সফর মাসের শেষ কয়েক রাত বাকি থাকতে অথবা রবিউল আউয়াল মাসের একদম শুরুর দিকে (ইবনে হিশাম, সিরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ: ৪/ ২৮৯)।

এ ছাড়া, ইতিহাসবিদ ইবনে হিশাম বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনার আলোকে মত প্রকাশ করেছেন যে, মহানবী (সা.)-এর অসুস্থতার দিনটি শুরু হয়েছিল ১৮ সফর থেকে এবং তা একনাগাড়ে ১৩ দিন পর্যন্ত স্থায়ী ছিল (ইবনে হিশাম ৯৯৯)। এই মতের হুবহু মিল পাওয়া যায় বিখ্যাত ‘ইসলামি বিশ্বকোষ’-এর ১৩ নম্বর পৃষ্ঠায়।

শুধু তা-ই নয়, মহানবী (সা.) আসলে কোন দিন থেকে প্রথম অসুস্থ বোধ করেছিলেন, সে বিষয়েও ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিস্তর মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেন শনিবার, কেউ বুধবার, আবার কেউ সোমবারের কথা উল্লেখ করেছেন। এমনকি তিনি কত দিন অসুস্থ থাকার পর ইন্তেকাল করেন, তা নিয়েও মতভেদ রয়েছে। বিভিন্ন বর্ণনায় ১০ দিন, ১২ দিন, ১৩ দিন বা ১৪ দিন অসুস্থ থাকার পর তাঁর ইন্তেকালের কথা বলা হয়েছে (জারকানি/শারহুল মাওয়াহিব-১২/ ৮৩; কাসতালানি, আহমদ ইবনে মুহাম্মদ, আল-মাওয়াহিব আল-লাদুন্নিয়া: ৩/ ৩৭৩)।

সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, হুদায়বিয়ার সন্ধির পরে সপ্তম হিজরির মহররম মাসের প্রথম দিকে মহানবী (সা.)-এর ওপর জনৈক ইহুদির জাদুর প্রভাব পড়েছিল। এই জাদুর স্থায়িত্ব সম্পর্কে কোনো বর্ণনায় ছয় মাস, আবার কোনো বর্ণনায় ৪০ দিনের কথা বলা হয়েছে। ফলে জাদুর প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে সুস্থতার তারিখটি কোনোভাবেই ১১ হিজরির সফর মাসের ‘আখেরি চাহার সোম্বা’ বা ‘শেষ বুধবার’ হতে পারে না বলে প্রখ্যাত গবেষক আলেমরা জোরালো মন্তব্য করেছেন (ফাতহুল বারি: ৭/ ৭৪৮, কิตাবুল মাগাজি: ৪৪৪২, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/ ১৯৩, সিরাতুন নবী, শিবলী নোমানী: ২/ ১১৩)।

প্রচলিত এই দাবিটিও সঠিক নয় যে, সেই বুধবারের পর তাঁর সুস্থতায় আর কোনো উন্নতি হয়নি। বরং নির্ভরযোগ্য হাদিস অনুযায়ী, এরপরও তিনি আরেক দিন সুস্থতা বোধ করেছিলেন এবং জোহরের নামাজ আদায় করতে এসেছিলেন (বুখারি ৬৬৪, ৬৮০, ৬৮১; মুসলিম ৪১৮)। এমনকি ইন্তেকালের দিন অর্থাৎ সোমবার সকালেও তিনি যথেষ্ট সুস্থতা অনুভব করেছিলেন, যার কারণে হযরত আবু বকর (রা.) তাঁর কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে নিজের বাড়িতে চলে গিয়েছিলেন (সিরাতে ইবনে ইসহাক ৭১১-৭১২, আর রাওজাতুল উলুফ ৭/৫৪৭-৫৪৮)।

বিশেষভাবে লক্ষণীয় ও করণীয়: ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে, এই দিনটি যদি ইবাদত বা বিশেষ আমলের জন্য সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ হতো, তবে এই দিনটির ফজিলত সম্পর্কে সহিহ হাদিসে কিংবা সাহাবিদের বর্ণনায় স্পষ্টভাবে সুনির্দিষ্ট উল্লেখ থাকত। ধর্মীয় কোনো রীতিনীতি বা আমল যদি নির্ভরযোগ্য ও সহিহ সনদে প্রমাণিত না পাওয়া যায়, তবে সেটার অনুকরণ বা অনুসরণ করা মুসলিম উম্মাহর জন্য বাধ্যতামূলক বা বৈধ নয়। ইসলামি বিধিবিধানের বাইরে গিয়ে এমন মনগড়া প্রথা পালন করা শরিয়তের দৃষ্টিতে ‘বিদআত’ এবং সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

কারণ, ইসলামে কেউ যদি নিজের পক্ষ থেকে কোনো আমলকে ভালো মনে করে ইবাদতের নতুন পদ্ধতি তৈরি করে এবং সওয়াবের আশায় তা পালন করতে শুরু করে, তবে তা সরাসরি বিদআত হিসেবে পরিগণিত হয়। এ বিষয়ে সতর্ক করে স্বয়ং মহানবী (সা.) স্পষ্টভাবে এরশাদ করেছেন, “কেউ যদি এমন কোনো আমল করে, যার প্রতি আমাদের (শরিয়তের) নির্দেশ নেই, তা সরাসরি প্রত্যাখ্যাত।” (সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর: ২৬৯৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ১৭১৮)।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

রাজধানীতে স্ত্রীকে জবাই করে হত্যা: স্বামীর মৃত্যুদণ্ড, ১ লাখ টাকা জরিমানা

আখেরি চাহার সোম্বা: ইতিহাস, বাস্তবতা ও করণীয়

আপডেট সময় : ০৮:৫৮:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬

মুসলিম সমাজে প্রচলিত অন্যতম একটি আলোচিত দিবস হলো ‘আখেরি চাহার সোম্বা’। শব্দগত বিশ্লেষণে দেখা যায়, এটি মূলত আরবি ও ফারসি ভাষার একটি মিশ্র বাক্য। এর শাব্দিক অর্থ হলো ‘শেষ’। ফারসি ভাষায় ‘চাহর’ শব্দের অর্থ হলো ‘সফর মাস’ এবং ফারসি ‘সোম্বা’ শব্দের অর্থ হলো ‘বুধাবার’। ফলে সামগ্রিক শব্দার্থের বিচারে ‘আখেরি চাহর সোম্বা’ বলতে হিজরি সনের সফর মাসের শেষ বুধবারকে বোঝানো হয়ে থাকে।

আখেরি চাহার সোম্বা কী ও এর উদযাপন: সাধারণ পরিভাষায়, হিজরি সনের সফর মাসের শেষ বুধবারই হলো আখেরি চাহার সোম্বা। প্রচলিত একটি দীর্ঘ বিশ্বাস ও মতানুযায়ী, এই নির্দিষ্ট দিনে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর জীবনের এক প্রচণ্ড অসুস্থতা থেকে সাময়িক সুস্থতা অনুভব করেছিলেন। তাঁর এই সুস্থতার সংবাদে আনন্দিত হয়ে সাহাবায়ে কেরাম খুশি মনে বিপুল পরিমাণ দান-সদকা করেন এবং মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করেছিলেন। এই বিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই বিশ্বের কোনো কোনো দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা এই দিনে দান-সদকাসহ বিভিন্ন নফল ইবাদত-বন্দেগি পালন করে থাকেন। বাংলাদেশেও এই দিবসটি উদযাপন উপলক্ষ্যে বার্ষিক সরকারি ছুটির তালিকায় একটি ঐচ্ছিক ছুটি হিসেবে রাখা হয়েছে। তবে এ দেশের আলেম ও ইসলামি পণ্ডিতদের মধ্যে এই দিবসটি পালন করার বৈধতা ও ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে বিস্তর মতপার্থক্য এবং বিতর্ক দেখা যায়।

যারা এই দিবসটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালন করে থাকেন, তারা মূলত মহানবী (সা.)-এর জীবনের দুটি ভিন্ন সময়ের অসুস্থতার ঘটনাকে এর পেছনে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। একদল দাবি করেন, সপ্তম হিজরিতে মহানবী (সা.) একবার জাদুতে আক্রান্ত হয়ে প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন এবং দীর্ঘ অসুস্থতার পর সফর মাসের শেষ বুধবারে তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেন। আবার অন্য দলের মতে, মহানবী (সা.) মৃত্যুর আগে যে কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন, সেই সময় সফর মাসের শেষ বুধবারে তিনি কিছুটা সুস্থতা অনুভব করেন এবং নিজে হেঁটে মসজিদে নামাজ পড়তে আসেন। মসজিদে এসে তিনি তখন হযরত আবু বকর (রা.)-কে ইমামতির দায়িত্ব দেন। তবে সেই বুধবারের পর তিনি পুনরায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। মহানবী (সা.)-কে সুস্থ অবস্থায় মসজিদে আসতে দেখে উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম অত্যন্ত আনন্দিত হন এবং শুকরিয়া স্বরূপ নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রচুর দান-সদকা করেছিলেন। এই ঘটনাকে স্মরণ করেই অনেকে প্রতি বছর সফর মাসের শেষ বুধবারে ‘আখেরি চাহার সোম্বা’ পালন করেন। তবে ঐতিহাসিক সত্য হলো, মহানবী (সা.)-এর মৃত্যুর পরে সাহাবায়ে কেরাম এবং তাবেয়িদের মধ্যে কেউই কখনো এই দিনটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদযাপন করেননি।

প্রচলিত বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে যে, রাসুল (সা.)-এর সুস্থতার খুশিতে হযরত আবু বকর (রা.) ৭ হাজার দিনার, হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) ৫ হাজার দিনার, হযরত ওসমান (রা.) ১০ হাজার দিনার, হযরত আলী (রা.) ৩ হাজার দিনার এবং হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) ১০০টি উট ও ১০০টি ঘোড়া আল্লাহর রাস্তায় দান করেছিলেন। এইসব অতি পরিচিত বর্ণনা মূলত ‘বারো চান্দের ফজিলত’ ও ‘রাহাতুল কুলুব’ নামক বইগুলোতে উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে আধুনিক ইসলামি পণ্ডিত, গবেষক ও মুহাদ্দিসগণ এই দুটি কিতাবে বর্ণিত এবং সমাজে বহুল প্রচলিত সফর মাসের শেষ বুধবারের এই পুরো ঘটনাটিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, প্রামাণ্যহীন ও অসত্য বলে দাবি করেছেন।

ঐতিহাসিক তথ্যের অসংগতি ও বাস্তবতা: ইসলামি গবেষকদের মূল বক্তব্য হলো, মহানবী (সা.)-এর অসুস্থ হওয়ার সুনির্দিষ্ট দিন ও ক্ষণ নিয়ে ইতিহাসে যথেষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে, যার কারণে নির্দিষ্ট কোনো দিনকে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা একেবারেই অসম্ভব। যদিও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অসুস্থতার বিবরণ অসংখ্য নির্ভরযোগ্য হাদিসে বিস্তারিতভাবে এসেছে, কিন্তু কোনো হাদিসেই এর নির্দিষ্ট দিন বা তারিখের উল্লেখ নেই। প্রখ্যাত তাবেয়ি ইবনে ইসহাকের মতে, মহানবী (সা.) যে অসুস্থতায় ইন্তেকাল করেছিলেন, তার সূচনা হয়েছিল সফর মাসের শেষ কয়েক রাত বাকি থাকতে অথবা রবিউল আউয়াল মাসের একদম শুরুর দিকে (ইবনে হিশাম, সিরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ: ৪/ ২৮৯)।

এ ছাড়া, ইতিহাসবিদ ইবনে হিশাম বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনার আলোকে মত প্রকাশ করেছেন যে, মহানবী (সা.)-এর অসুস্থতার দিনটি শুরু হয়েছিল ১৮ সফর থেকে এবং তা একনাগাড়ে ১৩ দিন পর্যন্ত স্থায়ী ছিল (ইবনে হিশাম ৯৯৯)। এই মতের হুবহু মিল পাওয়া যায় বিখ্যাত ‘ইসলামি বিশ্বকোষ’-এর ১৩ নম্বর পৃষ্ঠায়।

শুধু তা-ই নয়, মহানবী (সা.) আসলে কোন দিন থেকে প্রথম অসুস্থ বোধ করেছিলেন, সে বিষয়েও ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিস্তর মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেন শনিবার, কেউ বুধবার, আবার কেউ সোমবারের কথা উল্লেখ করেছেন। এমনকি তিনি কত দিন অসুস্থ থাকার পর ইন্তেকাল করেন, তা নিয়েও মতভেদ রয়েছে। বিভিন্ন বর্ণনায় ১০ দিন, ১২ দিন, ১৩ দিন বা ১৪ দিন অসুস্থ থাকার পর তাঁর ইন্তেকালের কথা বলা হয়েছে (জারকানি/শারহুল মাওয়াহিব-১২/ ৮৩; কাসতালানি, আহমদ ইবনে মুহাম্মদ, আল-মাওয়াহিব আল-লাদুন্নিয়া: ৩/ ৩৭৩)।

সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, হুদায়বিয়ার সন্ধির পরে সপ্তম হিজরির মহররম মাসের প্রথম দিকে মহানবী (সা.)-এর ওপর জনৈক ইহুদির জাদুর প্রভাব পড়েছিল। এই জাদুর স্থায়িত্ব সম্পর্কে কোনো বর্ণনায় ছয় মাস, আবার কোনো বর্ণনায় ৪০ দিনের কথা বলা হয়েছে। ফলে জাদুর প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে সুস্থতার তারিখটি কোনোভাবেই ১১ হিজরির সফর মাসের ‘আখেরি চাহার সোম্বা’ বা ‘শেষ বুধবার’ হতে পারে না বলে প্রখ্যাত গবেষক আলেমরা জোরালো মন্তব্য করেছেন (ফাতহুল বারি: ৭/ ৭৪৮, কิตাবুল মাগাজি: ৪৪৪২, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/ ১৯৩, সিরাতুন নবী, শিবলী নোমানী: ২/ ১১৩)।

প্রচলিত এই দাবিটিও সঠিক নয় যে, সেই বুধবারের পর তাঁর সুস্থতায় আর কোনো উন্নতি হয়নি। বরং নির্ভরযোগ্য হাদিস অনুযায়ী, এরপরও তিনি আরেক দিন সুস্থতা বোধ করেছিলেন এবং জোহরের নামাজ আদায় করতে এসেছিলেন (বুখারি ৬৬৪, ৬৮০, ৬৮১; মুসলিম ৪১৮)। এমনকি ইন্তেকালের দিন অর্থাৎ সোমবার সকালেও তিনি যথেষ্ট সুস্থতা অনুভব করেছিলেন, যার কারণে হযরত আবু বকর (রা.) তাঁর কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে নিজের বাড়িতে চলে গিয়েছিলেন (সিরাতে ইবনে ইসহাক ৭১১-৭১২, আর রাওজাতুল উলুফ ৭/৫৪৭-৫৪৮)।

বিশেষভাবে লক্ষণীয় ও করণীয়: ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে, এই দিনটি যদি ইবাদত বা বিশেষ আমলের জন্য সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ হতো, তবে এই দিনটির ফজিলত সম্পর্কে সহিহ হাদিসে কিংবা সাহাবিদের বর্ণনায় স্পষ্টভাবে সুনির্দিষ্ট উল্লেখ থাকত। ধর্মীয় কোনো রীতিনীতি বা আমল যদি নির্ভরযোগ্য ও সহিহ সনদে প্রমাণিত না পাওয়া যায়, তবে সেটার অনুকরণ বা অনুসরণ করা মুসলিম উম্মাহর জন্য বাধ্যতামূলক বা বৈধ নয়। ইসলামি বিধিবিধানের বাইরে গিয়ে এমন মনগড়া প্রথা পালন করা শরিয়তের দৃষ্টিতে ‘বিদআত’ এবং সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

কারণ, ইসলামে কেউ যদি নিজের পক্ষ থেকে কোনো আমলকে ভালো মনে করে ইবাদতের নতুন পদ্ধতি তৈরি করে এবং সওয়াবের আশায় তা পালন করতে শুরু করে, তবে তা সরাসরি বিদআত হিসেবে পরিগণিত হয়। এ বিষয়ে সতর্ক করে স্বয়ং মহানবী (সা.) স্পষ্টভাবে এরশাদ করেছেন, “কেউ যদি এমন কোনো আমল করে, যার প্রতি আমাদের (শরিয়তের) নির্দেশ নেই, তা সরাসরি প্রত্যাখ্যাত।” (সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর: ২৬৯৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ১৭১৮)।