গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে অনবরত ও টানা ভারী বর্ষণের ফলে চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলসহ দেশের আরও বেশ কয়েকটি জেলায় এক ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে কেবল যে বহু মূল্যবান মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে তা-ই নয়; বরং দেশের গ্রামীণ অর্থনীতির মূল ভিত্তি তথা কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও ব্যাপক ও মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে। উপদ্রুত এলাকাগুলো থেকে বন্যার পানি যতই নিচের দিকে নামছে, ক্ষয়ক্ষতির সেই গভীর ও ক্ষতবিক্ষত চিহ্নগুলো ততই স্পষ্ট ও দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। এবারের বন্যা আকস্মিক প্রকৃতির হলেও এর ক্ষয়ক্ষতির যে বিশাল ব্যাপকতা, তাতে অতি দ্রুত ও জরুরি ভিত্তিতে ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়িয়ে পর্যাপ্ত সহায়তা ও কার্যকর পুনর্বাসনের উদ্যোগ গ্রহণ করা না হলে দেশের সামগ্রিক খাদ্যনিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
প্রথম আলোর মাঠপর্যায়ের খবর থেকে জানা যাচ্ছে যে, অনবরত বৃষ্টিপাতের কারণে দেশের সর্বমোট ৪৩টি জেলা বন্যাকবলিত হলেও এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ও মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে ১৬টি জেলা। এবারের প্রলয়ংকরী বন্যায় সব মিলিয়ে প্রায় এক লাখ হেক্টর চাষের জমির ফসল সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে যায়। সর্বশেষ শুক্রবার পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, প্রায় ৮২ হাজার হেক্টর জমির ফসল পানির নিচে নিমজ্জিত ছিল। দেশের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) দেওয়া সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এখনো পর্যন্ত দেশের প্রায় ৫৩ হাজার হেক্টর জমির আউশ ধান পানির নিচে তলিয়ে আছে। এর পাশাপাশি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ৯ হাজার হেক্টর জমির আমনের বীজতলা এবং ২০ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমির উৎপাদিত সবজির খেত।
কৃষি খাতের এই অপূরণীয় ক্ষতির পর বন্যায় সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসেছে দেশের মৎস্য চাষের ওপর। বন্যার তীব্র পানির তোড়ে ও প্লাবনে হাজার হাজার পুকুর, ঘের ও খামারের চাষ করা মাছ সম্পূর্ণ ভেসে গেছে। মৎস্য অধিদপ্তরের দেওয়া আনুষ্ঠানিক তথ্য বলছে, এই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ৩৪ হাজার মাছের বাণিজ্যিক খামার ও সাধারণ পুকুর এবং ৩ হাজার ৮৮৯টি বড় মাছের ঘের। বিশেষ করে দেশের চট্টগ্রাম ও পটুয়াখালীসহ উপকূলীয় অঞ্চলের অসংখ্য পুকুর ও চিংড়িঘের ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে মৎস্য খাতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০৭ কোটি ৪১ লাখ টাকায়।
অন্যদিকে, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী জানা যাচ্ছে যে, বন্যার কারণে দেশের গবাদিপশুর খামার, হাঁস-মুরগির খামার (পোলট্রি), দানাদার পশুখাদ্য, খড় এবং ঘাসের খেত মারাত্মকভাবে নষ্ট ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে কেবল এই প্রাণিসম্পদ খাতেই মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮১ কোটি টাকা।
চলতি মৌসুমে অনবরত বৃষ্টি ও ডিজেল–সংকটের কারণে এমনিতেই বোরো ধানের উৎপাদন নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পুরোপুরি পূরণ করতে পারেনি। তার ওপর এই বন্যার তীব্রতার কারণে আউশ ধানের প্রায় ১০ শতাংশ ফসল সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে দেশের শীর্ষস্থানীয় কৃষি অর্থনীতিবিদেরা গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। এই হিসাব অনুযায়ী, এবার আউশের মোট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় তিন লাখ টন কম হতে পারে। এমতাবস্থায়, দেশের ধান ও চালের বাজার যাতে কোনোভাবেই অস্থিতিশীল বা সিন্ডিকেটের কবলে না পড়ে, সেদিকে সরকারকে সর্বোচ্চ নজরদারি রাখতে হবে এবং আগেভাগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। আশু ও জরুরি করণীয় হিসেবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে অবশ্যই আমনের ক্ষতিগ্রস্ত বীজতলা যাতে কৃষকেরা পুনরায় দ্রুত তৈরি করতে পারেন, তার জন্য কৃষক সমাজকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সরকারি সহায়তা ও কারিগরি দিকনির্দেশনা দিতে হবে।
বন্যার এই নেতিবাচক প্রভাব এরই মধ্যে দেশের খুচরা ও পাইকারি বাজারে সরাসরি পড়তে শুরু করেছে। বাজারের নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের সবজি, মাছ, মুরগি ও ডিমের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। দেশে গত প্রায় চার বছর ধরে চলা টানা উচ্চমূল্যস্ফীতির কারণে দরিদ্র, নিম্নবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষেরা জীবনযাত্রার প্রয়োজনীয় দৈনন্দিন ব্যয় চরমভাবে কাটছাঁট করে কোনোমতে বেঁচে আছেন। বন্যার কারণে নতুন করে তৈরি হওয়া এই অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতির চাপ সহ্য করা তাঁদের অনেকের পক্ষেই কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
এবারের বন্যায় দেশজুড়ে এত বড় আকারের ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হলেও সেই তুলনায় সরকারি কিংবা বেসরকারি পর্যায়ের ত্রাণ ও পুনর্বাসন তৎপরতা মাঠপর্যায়ে আশানুরূপ দৃশ্যমান বা কার্যকর নয়। কৃষি, মৎস্য ও পশুসম্পদ খাতে যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, সেটা দ্রুততম সময়ের মধ্যে কাটিয়ে উঠতে হলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, মৎস্য অধিদপ্তর ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পরিহার করে আরও সক্রিয়, গতিশীল এবং উদ্যোগী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রকৃত কৃষক, খামারি ও মৎস্যচাষিদের সঠিক তালিকা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তৈরি করে তাঁদের জন্য বিশেষ সরকারি প্রণোদনা ও সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। আউশচাষি ও সবজিচাষিদের বিনামূল্যে উন্নতমানের বীজসহ প্রয়োজনীয় সার ও কীটনাশকের সহায়তা দিতে হবে। এর পাশাপাশি বন্যা উপদ্রুত অঞ্চলগুলোতে গবাদিপশুর জীবন বাঁচাতে পশুখাদ্যের সরকারি সরবরাহ অবিলম্বে বাড়ানো প্রয়োজন।
আমরা দৃঢ়ভাবে মনে করি, সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সমূহ ও অধীনস্থ অধিদপ্তরগুলো যদি সমন্বিতভাবে ও আন্তরিকতার সাথে উদ্যোগী হয়, তবে বন্যার কারণে সৃষ্টি হওয়া এই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ক্ষতি সম্পূর্ণ কাটিয়ে ওঠা দেশের জন্য মোটেই কঠিন কোনো কাজ নয়।
রিপোর্টারের নাম 

























