ঢাকা ০৪:০৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬

স্মৃতির ক্যানভাস: দুই বছর পর কেমন আছেন রাজপথ কাঁপানো সেই যোদ্ধারা?

ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের রক্তঝরা দিনগুলোর পর কেটে গেছে দীর্ঘ দুটি বছর। ২০২৪ সালের সেই উত্তাল ও অগ্নিগর্ভ সময়ে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন দেশের ছাত্র-জনতা। সেই আন্দোলনের কিছু বিশেষ মুহূর্ত ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দী হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং রাতারাতি তা পরিণত হয়েছিল গণ-অভ্যুত্থানের অবিনশ্বর প্রতীকে। দুই বছর পেরিয়ে ২০২৬ সালের জুলাই মাসে এসে সেই আলোচিত মুখগুলোর জীবনযাত্রা অনেকটাই স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে এসেছে। তবে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি ও অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন নিয়ে তাঁদের প্রত্যেকের মনেই জমা হয়েছে তীব্র ক্ষোভ, আক্ষেপ ও গভীর হতাশা।

ঝুম বৃষ্টিতে শায়লার স্লোগান ও আজকের আশাহত বাস্তবতা: দিনটি ছিল ২০২৪ সালের ২ আগস্ট। রাজধানী ঢাকার উত্তরার রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ প্রাঙ্গণে তখন ঝুম বৃষ্টি হচ্ছিল। কিন্তু প্রকৃতির সেই বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে শত শত মানুষের সম্মিলিত কণ্ঠের স্লোগান বৃষ্টির শব্দকেও ছাপিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল—‘আমার ভাই মরল কেন, প্রশাসন জবাব চাই।’ চলমান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কলেজের একজন শিক্ষার্থীকে আটক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্বিচার গুলি ও হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সেদিন বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং অভিভাবকেরা স্বতঃস্ফূর্ত এক বিক্ষোভে শামিল হয়েছিলেন।

সেই উত্তাল ও ঐতিহাসিক মুহূর্তের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন রাজউক কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থী শায়লা আক্তার শশী। বৃষ্টির মধ্যে একটি রিকশায় বসে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে তাঁর স্লোগান দেওয়ার একটি ছবি সে সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রতীকী চিত্রে রূপ নেয়। শায়লা বর্তমানে বেসরকারি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। নিজের একাডেমিক পড়াশোনায় ফিরে গেলেও আন্দোলনের সেই উত্তেজনাকর স্মৃতি আজও তাঁর মনে সমানভাবে উজ্জ্বল। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই থেকে তিনি সরাসরি আন্দোলনে শরিক হয়েছিলেন।

চলতি বছরের (২০২৬) ৯ জুলাই রাজধানীর আফতাবনগরে কথা হয় শায়লার সঙ্গে। সেই ভাইরাল হওয়া ছবিটির পেছনের গল্প বলতে গিয়ে তিনি জানান, মানববন্ধনে সাধারণ মানুষের এত বিপুল অংশগ্রহণ দেখে তিনি ভীষণ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন। চারপাশের শিক্ষক ও অভিভাবকদের উপস্থিতি তাঁর মনের ভেতরের সব ভয় এক নিমেষে দূর করে দিয়েছিল। পুরো কলেজ প্রাঙ্গণ যখন স্লোগানে মুখর, তখন ঝুম বৃষ্টির মধ্যে তিনি স্লোগানের গভীরে এতটাই নিমজ্জিত হয়ে গিয়েছিলেন যে, কেউ তাঁর ছবি তুলছে তা টের পাননি।

সেদিনের বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার জন্য আজও মস্ত বড় গর্ব হয় শায়লার। তবে এই গর্বের সমান্তরালে তাঁর মনে এখন তীব্র আফসোস ও বেদনা কাজ করে। তাঁর স্পষ্ট ভাষ্য, যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বুকে নিয়ে সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছিল, সেই কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা আজও পূরণ হয়নি। দেশের রাজনৈতিক দলগুলো এখনো নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থ ও ক্ষমতা নিয়েই ব্যস্ত রয়েছে। জুলাইয়ের শহীদদের আজ পর্যন্ত কোনো যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি, এমনকি অনেক গুরুতর আহত ব্যক্তিকে এখনো সম্পূর্ণ নিজের খরচে চিকিৎসাসেবা নিতে হচ্ছে। শায়লার ভাষায়, “একজন জুলাই যোদ্ধা হিসেবে আমি আজকের দেশ দেখে আশাহত এবং খুবই লজ্জিত। এ রকম দেশের জন্য আবু সাঈদ, মুগ্ধরা জীবন দেননি। যে সিস্টেম (ব্যবস্থা) বদলানোর জন্য এত আত্মত্যাগ, আজও সেই একই সিস্টেমের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছি। কোনো পরিবর্তনই আমি দেখি না! পরিবর্তন হলো শুধু দল। জুলাই শুধুই একটা নাম এখন। এর প্রকৃত মূল্যায়ন কেউ করেনি।”

টিনের ঢাল হাতে নাসিরের সেই অদম্য প্রতিরোধ: স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের পতন নিশ্চিত হওয়ার ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ ৪ আগস্ট ২০২৪ তারিখে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এক অভাবনীয় দৃশ্যের অবতারণা ঘটেছিল। পুলিশের মুহুর্মুহু গুলির সামনে টিনের তৈরি একটি অস্থায়ী ঢাল হাতে নিয়ে বীরদর্পে দাঁড়িয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন স্যানিটারি মিস্ত্রি মো. নাসির খান। তাঁর সেই অকুতোভয় প্রতিবাদের ছবিও আন্দোলনের অন্যতম প্রধান প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। নাসির অবশ্য আন্দোলনের শুরু থেকেই রাজপথে ছিলেন এবং জুলাইয়ের ২২ তারিখেই প্রথম বিক্ষোভে যোগ দেন।

মতিঝিল এলাকায় চলতি মাসের ৯ তারিখ নাসিরের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, ৪ আগস্ট সোনারগাঁও হোটেলের পাশে একটি অস্থায়ী বেড়া থেকে একটি টিন টেনে খুলে তা দুই টুকরা করেছিলেন। এর একটি অংশ দিয়ে নিজের আত্মরক্ষার ‘ঢাল’ তৈরি করেন। সেই ঢাল হাতে নিয়ে অন্য আন্দোলনকারীদের পেছেনে ফেলে তিনি সরাসরি পুলিশের মুখোমুখি অবস্থানে চলে যান। একপর্যায়ে পুলিশের ছোড়া ছররা গুলি সরাসরি তাঁর কপালে ও হাতে এসে লাগে। একই সময়ে তাঁর পাশে থাকা আরেকজন আন্দোলনকারীও গুলিবিদ্ধ হন। তীব্র যন্ত্রণায় তখন তিনি আর হাতের সেই টিনের ঢাল ধরে রাখতে পারেননি।

নাসির বলেন, “কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেছিল। পরে যখন দেখলাম, সরকার পাখির মতো গুলি করে দেশের মানুষকে হত্যা করছে, তখন বিবেকের তাড়নায় আমিও রাস্তায় নেমে এসেছিলাম। সেদিন আন্দোলনে না নামলে আক্ষেপ থেকে যেত।” বর্তমান পরিস্থিতির মূল্যায়ন করতে গিয়ে নাসিরের ক্ষোভ, বড় ধরনের সংস্কারের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অন্তর্বর্তী সরকার তা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারেনি। একই সাথে আন্দোলনের আহত যোদ্ধাদের সরকারি তালিকায় নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত না থাকায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। তবে তিনি এও মনে করেন যে, রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য বর্তমান সরকারকে আরও পর্যাপ্ত সময় দেওয়া উচিত।

মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা রায়হান মোল্লার যাতনা: আন্দোলনের চরম উত্তাল ও রক্তক্ষয়ী দিন ১৯ জুলাই তারিখে উত্তরা পূর্ব থানার সামনে পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হয়েছিলেন রায়হান মোল্লা। রক্তাক্ত ও গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাঁর সড়ক বিভাজকের আড়ালে কোনোমতে আশ্রয় নেওয়ার একটি ছবি সে সময় দেশজুড়ে তুমুল আলোচিত ও আলোড়িত হয়েছিল। রায়হান ১৬ জুলাই থেকে রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন।

গণ-অভ্যুত্থানের সময় কলেজ অব অ্যাভিয়েশন টেকনোলজিতে অধ্যয়নরত রায়হান বর্তমানে পড়াশোনা শেষে ব্যবসা করছেন। ব্যবসার পাশাপাশি তিনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের নানাবিধ তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে যাচ্ছেন। ১০ জুলাই কারওয়ান বাজার এলাকায় কথা হয় রায়হানের সঙ্গে। সেদিনের বিভীষিকাময় মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “সেদিন সকালে বন্ধুবান্ধব একত্র হয়ে ঢাকা-ময়মনসিংহ রোডের যান চলাচল বন্ধ করে দিই। ছাত্র-জনতার প্রতিনিধি হয়ে পুলিশের সঙ্গে কথা বলতে গেলে আমাকে মিথ্যা প্ররোচনা দিয়ে আন্দোলনরত সবাইকে নিয়ে চলে যেতে বলে। আমরা চলে যেতে না চাইলে প্রথমে জীবননাশের হুমকি দেয় এবং পরে সরাসরি গুলি ছোড়ে। প্রথম গুলিটা করে আমার দিকে। সঙ্গে সঙ্গে আমার হাত থেকে মাইকটা পড়ে যায় এবং আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। পরে সড়ক বিভাজকের পাশে আশ্রয় নিই।”

শারীরিক ক্ষতগুলো সময়ের ব্যবধানে অনেকটাই সেরে উঠলেও সেদিনের সেই তীব্র গুলির শব্দ, মানুষের বুকফাটা আর্তনাদ আর চিরতরে হারিয়ে যাওয়া চেনা মুখগুলো আজও রায়হানকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে ফেরে। রায়হান বিশ্বাস করেন, জুলাই আন্দোলনের মূল লক্ষ্যই ছিল একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠন করা। বর্তমানে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেলেও মূল লক্ষ্যটি এখনো অর্জিত হয়নি। তাঁর মতে, আইনের শাসন, প্রকৃত ন্যায়বিচার, দুর্নীতি ও বৈষম্য দূর করা এবং দেশের প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনার প্রকৃত বাস্তবায়ন সম্ভব।

মুখ চেপে ধরা সেই ছবির নাহিদুল ও তাঁর বর্তমান মূল্যায়ন: আন্দোলনের শেষভাগে ৩১ জুলাই তারিখে ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছিলেন মো. নাহিদুল ইসলাম। হাইকোর্ট এলাকার মাজার গেটের সামনে থেকে পুলিশ যখন তাঁকে জোরপূর্বক আটক করছিল, তখন এক পুলিশ সদস্য তাঁর মুখ শক্ত করে চেপে ধরেন। এই দৃশ্যটির ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেছিল। নাহিদুল একটি বৈষম্যহীন দেশ গড়ার স্বপ্ন বুকে ধারণ করে ১০ জুলাই আন্দোলনের শুরুতেই শামিল হয়েছিলেন।

নাহিদুল ধানমন্ডির নিউ মডেল ডিগ্রি কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক পরীক্ষা সম্পন্ন করেছেন, তবে এখনো তাঁর চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ হয়নি। বর্তমানে তিনি সহকারী পরিচালক হিসেবে নাটক নির্মাণের কাজের সাথে সম্পৃক্ত আছেন। ৯ জুলাই তাঁর কলেজ প্রাঙ্গণে কথা বলার সময় তিনি সেদিনের স্মৃতিচারণা করে বলেন, “মার্চ ফর ডেমোক্রেসি (জাস্টিস) কর্মসূচিতে পুলিশ মারমুখী আচরণ শুরু করে। এর প্রতিবাদ করতে গেলে এক পুলিশ কর্মকর্তা আমাকে বলে, ‘তোকে মেরে ফেলব।’ আমি তখন বলেছিলাম, ‘আর কত গুম-খুন করলে আপনাদের মনে শান্তি আসবে?’ তখন আমার মুখ চেপে ধরা হয়। পরবর্তী সময়ে আইনজীবীদের সহযোগিতায় হাইকোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে আমাকে ছাড়ানো হয়।”

গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে নাহিদুলের স্পষ্ট মূল্যায়ন হলো, মহান মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে আওয়ামী লীগ সম্পূর্ণ নিজেদের দলীয় বৃত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ ও কুক্ষিগত করেছিল বলেই তাদের পতন ত্বরান্বিত হয়েছিল। ঠিক একইভাবে বর্তমান সময়ে এসে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকেও একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী নিজেদের মধ্যে কুক্ষিগত করার চেষ্টা চালাচ্ছে, যার কারণে অভ্যুত্থানটি ক্রমান্বয়ে ব্যর্থতার দিকে যাচ্ছে। বর্তমান সরকারকে সতর্ক বার্তা দিয়ে নাহিদুল বলেন, তরুণ প্রজন্মকে যদি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে সহযোগিতা করা না হয়, তবে পরবর্তী প্রজন্মও অবধারিতভাবে আগের ভুল প্রজন্মকেই অনুসরণ করবে।

পুলিশের গাড়ির সামনে ‘মানবঢাল’ হওয়া অকুতোভয় নুসরাত: নাহিদুলের মতোই ৩১ জুলাইয়ের সেই একই ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান। ওই কর্মসূচিস্থল থেকে যখন তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই নূর আলমকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে উদ্যত হয়, তখন নুসরাত নিজের জীবনের পরোয়া না করে পুলিশের চলন্ত গাড়ির সামনে ‘মানবঢাল’ হয়ে একাই দাঁড়িয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানান। তাঁর সেই সাহসী প্রতিবাদের ছবিটি আন্দোলনের অন্যতম সেরা ও আলোচিত মুহূর্ত হিসেবে স্মরণ করা হয়। এর আগে ১৮ জুলাই থেকেই তিনি রাজপথের লড়াইয়ে যুক্ত ছিলেন।

ডেমরা এলাকায় ৯ জুলাই নুসরাত প্রথম আলোকে বলেন, “অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেই দাঁড়িয়েছিলাম। এরপর কী হবে, ভাবার সময় ছিল না।” সেদিনের ঘটনার রোমন্থন করে তিনি আরও বলেন, “মার্চ ফর জাস্টিস কর্মসূচিতে হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে পুলিশ শিক্ষার্থীদের ওপর অতর্কিত হামলা করে। সেখান থেকে শিক্ষার্থীদের গ্রেপ্তার করা শুরু করে। নূর আলম ভাইয়াকে যখন গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন আমার জায়গা থেকে যতটুকু প্রতিবাদ করা দরকার, সেটি করেছি। জুলাইয়ের আগে আমি জানতামই না, আমার মধ্যে এত সাহস আছে! সেই সাহস আমাকে এখনো অনুপ্রাণিত করে।”

নুসরাতের ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং দেশের মানুষের ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনা ছাড়া অভ্যুত্থানের আর কোনো বড় প্রত্যাশাই আজ পর্যন্ত পূরণ হয়নি। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নতি, নারীর নিরাপত্তা এবং ‘জুলাই সনদ’-এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে কোনো কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি লক্ষ করা যাচ্ছে না। তিনি মনে করেন, এই মুহূর্তে দেশের জন্য সবচেয়ে জরুরি ও ক্রান্তীয় পদক্ষেপ হলো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা।

শহীদ ভাইয়ের লাশ কাঁধে দুই বোনের ঐতিহাসিক মিছিল ও মিমের কথা: ৫ আগস্ট ২০২৪—আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সেই ঐতিহাসিক দিনটির বিকেলবেলা এক হৃদয়বিদারক অথচ চরম প্রতিরোধী দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছিল ঢাকাবাসী। ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গ থেকে স্বৈরাচারের গুলিতে নিহত ভাই ইসমাইল হোসেন রাব্বির মরদেহ কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন তাঁর দুই বোন মিতু আক্তার ও মিম আক্তার। সেই মরদেহ কাঁধে নিয়েই তাঁরা চানখাঁরপুল এলাকায় এক বিশাল শোক ও প্রতিবাদের মিছিল বের করেছিলেন, যা আন্দোলনের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় প্রতীক হয়ে আছে।

এই দুই বোনের মধ্যে মিতু ছিলেন একজন সাধারণ গৃহিণী এবং মিম ছিলেন কবি নজরুল সরকারি কলেজের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী। মিম ৩ আগস্ট থেকে আন্দোলনের মাঠে সক্রিয় ছিলেন। বর্তমানে ‘জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন’-এ কর্মরত মিমের সঙ্গে ৯ জুলাই রাজধানীর শাহবাগ এলাকায় কথা হয়। দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি এখন আর খুব বেশি ভাবেন না বা আশা রাখেন না উল্লেখ করে জানান, তবে দেশের আগামীতে নির্বাচিত হয়ে আসা যেকোনো সরকারের কাছে তাঁর একমাত্র প্রত্যাশা থাকবে—তারা যেন সর্বদা শহীদ পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ায় এবং দেশের মব জাস্টিস (গণপিটুনি) ও চাঁদাবাজি দমনে আরও কঠোর ও কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের নৃশংস হামলার শিকার লামিয়া রায়হান: ২০২৪ সালের জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে আন্দোলন দিন দিন আরও বিস্তৃত ও ব্যাপক আকার ধারণ করছিল। এই পরিস্থিতিতে ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নৃশংস হামলা চালান ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। সেই ভয়াবহ হামলার মুখে ভিসি চত্বর থেকে জীবন বাঁচাতে আরেকজন নারী শিক্ষার্থীর হাত শক্ত করে ধরে দৌড় দিয়েছিলেন ইডেন মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী লামিয়া রায়হান। তারা যখন পালাচ্ছিলেন, তখনও ছাত্রলীগের একজন নেতা হাতে মোটা লাঠি নিয়ে তাঁদের ওপর চড়াও হতে তেড়ে আসছিল। ওই বিপজ্জনক মুহূর্তের ছবিটি সে সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মারাত্মকভাবে ভাইরাল হয়। লামিয়া ৭ জুলাই থেকেই আন্দোলনের প্রতিটি কর্মসূচিতে সরব ছিলেন।

আজিমপুর এলাকায় ৯ জুলাই লামিয়া প্রথম আলোকে জানান, “সেদিন ছাত্রলীগের হামলার সময় একজন মেয়ে আমার মতোই কী করবে বুঝে উঠতে না পেরে এদিকে-সেদিক তাকাচ্ছিল। তখন ওর হাত ধরে বলি, চলো, আমরা এদিক দিয়ে দৌড় দিই। আমরা যখন দৌড়াচ্ছিলাম, তখন ছাত্রলীগের কয়েকজন আমাদের মারতে তেড়ে আসে। এ রকমই একটি ছবি সে সময় ভাইরাল হয়, যা আমরা পরে জানতে পারি।”

লামিয়া বলেন, তাঁদের সেই ছবিটি সে সময় অনেক মানুষকে ঘরে থেকে বের হয়ে আন্দোলনে যোগ দিতে অনুপ্রাণিত করেছিল জেনে তাঁর ভালো লাগে। তবে বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত ও চাঁদাবাজিমুক্ত একটি কল্যাণমুখী বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন তাঁরা দেখেছিলেন, তার সিংহভাগই আজ দুই বছর পরও অপূর্ণ রয়ে গেছে। তাঁর স্পষ্ট অভিযোগ, একটি বিশেষ গোষ্ঠী জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পুরো কৃতিত্ব ও অর্জনকে সম্পূর্ণ নিজেদের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে, যার দরুন সাধারণ মানুষের মনে এই অভ্যুত্থান নিয়ে আগ্রহ দিন দিন কমে যাচ্ছে। একই সাথে লামিয়ার মনে একটি গভীর আক্ষেপও রয়েছে; তিনি জানান, গত দুই বছরে জুলাই আন্দোলন কেন্দ্রিক দেশে নানা ধরনের বড় বড় কর্মসূচি ও অনুষ্ঠান করা হলেও এবং সেখানে তাঁর ভাইরাল হওয়া ছবিটি বারবার ব্যবহার করা হলেও, তাঁকে বা তাঁর মতো যোদ্ধাদের কোনোদিন কোনো অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।

২০২৪ সালের সেই ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দিনগুলোতে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপটে এই সাতজন ব্যক্তি সরাসরি বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে নিজেদের প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। তাঁদের কাজের ধরন আলাদা হলেও, তাঁদের সকলের চাওয়া ও স্বপ্ন ছিল একেবারেই অভিন্ন—একটি সম্পূর্ণ বৈষম্যহীন ও সাম্যের বাংলাদেশ বিনির্মাণ। শেখ হাসিনা সরকারের পতনকে তাঁরা প্রত্যেকেই একটি ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী অর্জন হিসেবে গণ্য করেন। তবে যে নতুন বাংলাদেশ গড়ার মহান স্বপ্ন ও চেতনা বুকে ধারণ করে দেশের হাজারো মানুষ রাজপথে নিজেদের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিল এবং জীবন উৎসর্গ করেছিল, তার প্রকৃত বাস্তবায়নে দেশকে এখনো অনেক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে বলে তাঁরা মনে করেন। রাজপথের এই বীর যোদ্ধাদের চূড়ান্ত প্রত্যাশা—শহীদদের এই মহান আত্মত্যাগের প্রকৃত ও সঠিক মূল্যায়ন কেবল তখনই সম্ভব হবে, যখন এই রাষ্ট্রে সত্যিকার অর্থে আইনের শাসন, সর্বস্তরে জবাবদিহিতা এবং একটি বৈষম্যহীন সামগ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

বিশ্বজুড়ে ফেসবুকের ডেস্কটপ ভার্সনে বিভ্রাট: ভোগান্তিতে ব্যবহারকারীরা

স্মৃতির ক্যানভাস: দুই বছর পর কেমন আছেন রাজপথ কাঁপানো সেই যোদ্ধারা?

আপডেট সময় : ০৯:৪৫:৫৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬

ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের রক্তঝরা দিনগুলোর পর কেটে গেছে দীর্ঘ দুটি বছর। ২০২৪ সালের সেই উত্তাল ও অগ্নিগর্ভ সময়ে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন দেশের ছাত্র-জনতা। সেই আন্দোলনের কিছু বিশেষ মুহূর্ত ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দী হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং রাতারাতি তা পরিণত হয়েছিল গণ-অভ্যুত্থানের অবিনশ্বর প্রতীকে। দুই বছর পেরিয়ে ২০২৬ সালের জুলাই মাসে এসে সেই আলোচিত মুখগুলোর জীবনযাত্রা অনেকটাই স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে এসেছে। তবে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি ও অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন নিয়ে তাঁদের প্রত্যেকের মনেই জমা হয়েছে তীব্র ক্ষোভ, আক্ষেপ ও গভীর হতাশা।

ঝুম বৃষ্টিতে শায়লার স্লোগান ও আজকের আশাহত বাস্তবতা: দিনটি ছিল ২০২৪ সালের ২ আগস্ট। রাজধানী ঢাকার উত্তরার রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ প্রাঙ্গণে তখন ঝুম বৃষ্টি হচ্ছিল। কিন্তু প্রকৃতির সেই বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে শত শত মানুষের সম্মিলিত কণ্ঠের স্লোগান বৃষ্টির শব্দকেও ছাপিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল—‘আমার ভাই মরল কেন, প্রশাসন জবাব চাই।’ চলমান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কলেজের একজন শিক্ষার্থীকে আটক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্বিচার গুলি ও হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সেদিন বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং অভিভাবকেরা স্বতঃস্ফূর্ত এক বিক্ষোভে শামিল হয়েছিলেন।

সেই উত্তাল ও ঐতিহাসিক মুহূর্তের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন রাজউক কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থী শায়লা আক্তার শশী। বৃষ্টির মধ্যে একটি রিকশায় বসে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে তাঁর স্লোগান দেওয়ার একটি ছবি সে সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রতীকী চিত্রে রূপ নেয়। শায়লা বর্তমানে বেসরকারি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। নিজের একাডেমিক পড়াশোনায় ফিরে গেলেও আন্দোলনের সেই উত্তেজনাকর স্মৃতি আজও তাঁর মনে সমানভাবে উজ্জ্বল। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই থেকে তিনি সরাসরি আন্দোলনে শরিক হয়েছিলেন।

চলতি বছরের (২০২৬) ৯ জুলাই রাজধানীর আফতাবনগরে কথা হয় শায়লার সঙ্গে। সেই ভাইরাল হওয়া ছবিটির পেছনের গল্প বলতে গিয়ে তিনি জানান, মানববন্ধনে সাধারণ মানুষের এত বিপুল অংশগ্রহণ দেখে তিনি ভীষণ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন। চারপাশের শিক্ষক ও অভিভাবকদের উপস্থিতি তাঁর মনের ভেতরের সব ভয় এক নিমেষে দূর করে দিয়েছিল। পুরো কলেজ প্রাঙ্গণ যখন স্লোগানে মুখর, তখন ঝুম বৃষ্টির মধ্যে তিনি স্লোগানের গভীরে এতটাই নিমজ্জিত হয়ে গিয়েছিলেন যে, কেউ তাঁর ছবি তুলছে তা টের পাননি।

সেদিনের বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার জন্য আজও মস্ত বড় গর্ব হয় শায়লার। তবে এই গর্বের সমান্তরালে তাঁর মনে এখন তীব্র আফসোস ও বেদনা কাজ করে। তাঁর স্পষ্ট ভাষ্য, যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বুকে নিয়ে সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছিল, সেই কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা আজও পূরণ হয়নি। দেশের রাজনৈতিক দলগুলো এখনো নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থ ও ক্ষমতা নিয়েই ব্যস্ত রয়েছে। জুলাইয়ের শহীদদের আজ পর্যন্ত কোনো যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি, এমনকি অনেক গুরুতর আহত ব্যক্তিকে এখনো সম্পূর্ণ নিজের খরচে চিকিৎসাসেবা নিতে হচ্ছে। শায়লার ভাষায়, “একজন জুলাই যোদ্ধা হিসেবে আমি আজকের দেশ দেখে আশাহত এবং খুবই লজ্জিত। এ রকম দেশের জন্য আবু সাঈদ, মুগ্ধরা জীবন দেননি। যে সিস্টেম (ব্যবস্থা) বদলানোর জন্য এত আত্মত্যাগ, আজও সেই একই সিস্টেমের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছি। কোনো পরিবর্তনই আমি দেখি না! পরিবর্তন হলো শুধু দল। জুলাই শুধুই একটা নাম এখন। এর প্রকৃত মূল্যায়ন কেউ করেনি।”

টিনের ঢাল হাতে নাসিরের সেই অদম্য প্রতিরোধ: স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের পতন নিশ্চিত হওয়ার ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ ৪ আগস্ট ২০২৪ তারিখে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এক অভাবনীয় দৃশ্যের অবতারণা ঘটেছিল। পুলিশের মুহুর্মুহু গুলির সামনে টিনের তৈরি একটি অস্থায়ী ঢাল হাতে নিয়ে বীরদর্পে দাঁড়িয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন স্যানিটারি মিস্ত্রি মো. নাসির খান। তাঁর সেই অকুতোভয় প্রতিবাদের ছবিও আন্দোলনের অন্যতম প্রধান প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। নাসির অবশ্য আন্দোলনের শুরু থেকেই রাজপথে ছিলেন এবং জুলাইয়ের ২২ তারিখেই প্রথম বিক্ষোভে যোগ দেন।

মতিঝিল এলাকায় চলতি মাসের ৯ তারিখ নাসিরের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, ৪ আগস্ট সোনারগাঁও হোটেলের পাশে একটি অস্থায়ী বেড়া থেকে একটি টিন টেনে খুলে তা দুই টুকরা করেছিলেন। এর একটি অংশ দিয়ে নিজের আত্মরক্ষার ‘ঢাল’ তৈরি করেন। সেই ঢাল হাতে নিয়ে অন্য আন্দোলনকারীদের পেছেনে ফেলে তিনি সরাসরি পুলিশের মুখোমুখি অবস্থানে চলে যান। একপর্যায়ে পুলিশের ছোড়া ছররা গুলি সরাসরি তাঁর কপালে ও হাতে এসে লাগে। একই সময়ে তাঁর পাশে থাকা আরেকজন আন্দোলনকারীও গুলিবিদ্ধ হন। তীব্র যন্ত্রণায় তখন তিনি আর হাতের সেই টিনের ঢাল ধরে রাখতে পারেননি।

নাসির বলেন, “কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেছিল। পরে যখন দেখলাম, সরকার পাখির মতো গুলি করে দেশের মানুষকে হত্যা করছে, তখন বিবেকের তাড়নায় আমিও রাস্তায় নেমে এসেছিলাম। সেদিন আন্দোলনে না নামলে আক্ষেপ থেকে যেত।” বর্তমান পরিস্থিতির মূল্যায়ন করতে গিয়ে নাসিরের ক্ষোভ, বড় ধরনের সংস্কারের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অন্তর্বর্তী সরকার তা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারেনি। একই সাথে আন্দোলনের আহত যোদ্ধাদের সরকারি তালিকায় নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত না থাকায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। তবে তিনি এও মনে করেন যে, রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য বর্তমান সরকারকে আরও পর্যাপ্ত সময় দেওয়া উচিত।

মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা রায়হান মোল্লার যাতনা: আন্দোলনের চরম উত্তাল ও রক্তক্ষয়ী দিন ১৯ জুলাই তারিখে উত্তরা পূর্ব থানার সামনে পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হয়েছিলেন রায়হান মোল্লা। রক্তাক্ত ও গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাঁর সড়ক বিভাজকের আড়ালে কোনোমতে আশ্রয় নেওয়ার একটি ছবি সে সময় দেশজুড়ে তুমুল আলোচিত ও আলোড়িত হয়েছিল। রায়হান ১৬ জুলাই থেকে রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন।

গণ-অভ্যুত্থানের সময় কলেজ অব অ্যাভিয়েশন টেকনোলজিতে অধ্যয়নরত রায়হান বর্তমানে পড়াশোনা শেষে ব্যবসা করছেন। ব্যবসার পাশাপাশি তিনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের নানাবিধ তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে যাচ্ছেন। ১০ জুলাই কারওয়ান বাজার এলাকায় কথা হয় রায়হানের সঙ্গে। সেদিনের বিভীষিকাময় মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “সেদিন সকালে বন্ধুবান্ধব একত্র হয়ে ঢাকা-ময়মনসিংহ রোডের যান চলাচল বন্ধ করে দিই। ছাত্র-জনতার প্রতিনিধি হয়ে পুলিশের সঙ্গে কথা বলতে গেলে আমাকে মিথ্যা প্ররোচনা দিয়ে আন্দোলনরত সবাইকে নিয়ে চলে যেতে বলে। আমরা চলে যেতে না চাইলে প্রথমে জীবননাশের হুমকি দেয় এবং পরে সরাসরি গুলি ছোড়ে। প্রথম গুলিটা করে আমার দিকে। সঙ্গে সঙ্গে আমার হাত থেকে মাইকটা পড়ে যায় এবং আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। পরে সড়ক বিভাজকের পাশে আশ্রয় নিই।”

শারীরিক ক্ষতগুলো সময়ের ব্যবধানে অনেকটাই সেরে উঠলেও সেদিনের সেই তীব্র গুলির শব্দ, মানুষের বুকফাটা আর্তনাদ আর চিরতরে হারিয়ে যাওয়া চেনা মুখগুলো আজও রায়হানকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে ফেরে। রায়হান বিশ্বাস করেন, জুলাই আন্দোলনের মূল লক্ষ্যই ছিল একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠন করা। বর্তমানে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেলেও মূল লক্ষ্যটি এখনো অর্জিত হয়নি। তাঁর মতে, আইনের শাসন, প্রকৃত ন্যায়বিচার, দুর্নীতি ও বৈষম্য দূর করা এবং দেশের প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনার প্রকৃত বাস্তবায়ন সম্ভব।

মুখ চেপে ধরা সেই ছবির নাহিদুল ও তাঁর বর্তমান মূল্যায়ন: আন্দোলনের শেষভাগে ৩১ জুলাই তারিখে ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছিলেন মো. নাহিদুল ইসলাম। হাইকোর্ট এলাকার মাজার গেটের সামনে থেকে পুলিশ যখন তাঁকে জোরপূর্বক আটক করছিল, তখন এক পুলিশ সদস্য তাঁর মুখ শক্ত করে চেপে ধরেন। এই দৃশ্যটির ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেছিল। নাহিদুল একটি বৈষম্যহীন দেশ গড়ার স্বপ্ন বুকে ধারণ করে ১০ জুলাই আন্দোলনের শুরুতেই শামিল হয়েছিলেন।

নাহিদুল ধানমন্ডির নিউ মডেল ডিগ্রি কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক পরীক্ষা সম্পন্ন করেছেন, তবে এখনো তাঁর চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ হয়নি। বর্তমানে তিনি সহকারী পরিচালক হিসেবে নাটক নির্মাণের কাজের সাথে সম্পৃক্ত আছেন। ৯ জুলাই তাঁর কলেজ প্রাঙ্গণে কথা বলার সময় তিনি সেদিনের স্মৃতিচারণা করে বলেন, “মার্চ ফর ডেমোক্রেসি (জাস্টিস) কর্মসূচিতে পুলিশ মারমুখী আচরণ শুরু করে। এর প্রতিবাদ করতে গেলে এক পুলিশ কর্মকর্তা আমাকে বলে, ‘তোকে মেরে ফেলব।’ আমি তখন বলেছিলাম, ‘আর কত গুম-খুন করলে আপনাদের মনে শান্তি আসবে?’ তখন আমার মুখ চেপে ধরা হয়। পরবর্তী সময়ে আইনজীবীদের সহযোগিতায় হাইকোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে আমাকে ছাড়ানো হয়।”

গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে নাহিদুলের স্পষ্ট মূল্যায়ন হলো, মহান মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে আওয়ামী লীগ সম্পূর্ণ নিজেদের দলীয় বৃত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ ও কুক্ষিগত করেছিল বলেই তাদের পতন ত্বরান্বিত হয়েছিল। ঠিক একইভাবে বর্তমান সময়ে এসে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকেও একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী নিজেদের মধ্যে কুক্ষিগত করার চেষ্টা চালাচ্ছে, যার কারণে অভ্যুত্থানটি ক্রমান্বয়ে ব্যর্থতার দিকে যাচ্ছে। বর্তমান সরকারকে সতর্ক বার্তা দিয়ে নাহিদুল বলেন, তরুণ প্রজন্মকে যদি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে সহযোগিতা করা না হয়, তবে পরবর্তী প্রজন্মও অবধারিতভাবে আগের ভুল প্রজন্মকেই অনুসরণ করবে।

পুলিশের গাড়ির সামনে ‘মানবঢাল’ হওয়া অকুতোভয় নুসরাত: নাহিদুলের মতোই ৩১ জুলাইয়ের সেই একই ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান। ওই কর্মসূচিস্থল থেকে যখন তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই নূর আলমকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে উদ্যত হয়, তখন নুসরাত নিজের জীবনের পরোয়া না করে পুলিশের চলন্ত গাড়ির সামনে ‘মানবঢাল’ হয়ে একাই দাঁড়িয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানান। তাঁর সেই সাহসী প্রতিবাদের ছবিটি আন্দোলনের অন্যতম সেরা ও আলোচিত মুহূর্ত হিসেবে স্মরণ করা হয়। এর আগে ১৮ জুলাই থেকেই তিনি রাজপথের লড়াইয়ে যুক্ত ছিলেন।

ডেমরা এলাকায় ৯ জুলাই নুসরাত প্রথম আলোকে বলেন, “অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেই দাঁড়িয়েছিলাম। এরপর কী হবে, ভাবার সময় ছিল না।” সেদিনের ঘটনার রোমন্থন করে তিনি আরও বলেন, “মার্চ ফর জাস্টিস কর্মসূচিতে হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে পুলিশ শিক্ষার্থীদের ওপর অতর্কিত হামলা করে। সেখান থেকে শিক্ষার্থীদের গ্রেপ্তার করা শুরু করে। নূর আলম ভাইয়াকে যখন গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন আমার জায়গা থেকে যতটুকু প্রতিবাদ করা দরকার, সেটি করেছি। জুলাইয়ের আগে আমি জানতামই না, আমার মধ্যে এত সাহস আছে! সেই সাহস আমাকে এখনো অনুপ্রাণিত করে।”

নুসরাতের ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং দেশের মানুষের ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনা ছাড়া অভ্যুত্থানের আর কোনো বড় প্রত্যাশাই আজ পর্যন্ত পূরণ হয়নি। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নতি, নারীর নিরাপত্তা এবং ‘জুলাই সনদ’-এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে কোনো কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি লক্ষ করা যাচ্ছে না। তিনি মনে করেন, এই মুহূর্তে দেশের জন্য সবচেয়ে জরুরি ও ক্রান্তীয় পদক্ষেপ হলো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা।

শহীদ ভাইয়ের লাশ কাঁধে দুই বোনের ঐতিহাসিক মিছিল ও মিমের কথা: ৫ আগস্ট ২০২৪—আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সেই ঐতিহাসিক দিনটির বিকেলবেলা এক হৃদয়বিদারক অথচ চরম প্রতিরোধী দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছিল ঢাকাবাসী। ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গ থেকে স্বৈরাচারের গুলিতে নিহত ভাই ইসমাইল হোসেন রাব্বির মরদেহ কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন তাঁর দুই বোন মিতু আক্তার ও মিম আক্তার। সেই মরদেহ কাঁধে নিয়েই তাঁরা চানখাঁরপুল এলাকায় এক বিশাল শোক ও প্রতিবাদের মিছিল বের করেছিলেন, যা আন্দোলনের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় প্রতীক হয়ে আছে।

এই দুই বোনের মধ্যে মিতু ছিলেন একজন সাধারণ গৃহিণী এবং মিম ছিলেন কবি নজরুল সরকারি কলেজের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী। মিম ৩ আগস্ট থেকে আন্দোলনের মাঠে সক্রিয় ছিলেন। বর্তমানে ‘জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন’-এ কর্মরত মিমের সঙ্গে ৯ জুলাই রাজধানীর শাহবাগ এলাকায় কথা হয়। দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি এখন আর খুব বেশি ভাবেন না বা আশা রাখেন না উল্লেখ করে জানান, তবে দেশের আগামীতে নির্বাচিত হয়ে আসা যেকোনো সরকারের কাছে তাঁর একমাত্র প্রত্যাশা থাকবে—তারা যেন সর্বদা শহীদ পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ায় এবং দেশের মব জাস্টিস (গণপিটুনি) ও চাঁদাবাজি দমনে আরও কঠোর ও কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের নৃশংস হামলার শিকার লামিয়া রায়হান: ২০২৪ সালের জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে আন্দোলন দিন দিন আরও বিস্তৃত ও ব্যাপক আকার ধারণ করছিল। এই পরিস্থিতিতে ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নৃশংস হামলা চালান ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। সেই ভয়াবহ হামলার মুখে ভিসি চত্বর থেকে জীবন বাঁচাতে আরেকজন নারী শিক্ষার্থীর হাত শক্ত করে ধরে দৌড় দিয়েছিলেন ইডেন মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী লামিয়া রায়হান। তারা যখন পালাচ্ছিলেন, তখনও ছাত্রলীগের একজন নেতা হাতে মোটা লাঠি নিয়ে তাঁদের ওপর চড়াও হতে তেড়ে আসছিল। ওই বিপজ্জনক মুহূর্তের ছবিটি সে সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মারাত্মকভাবে ভাইরাল হয়। লামিয়া ৭ জুলাই থেকেই আন্দোলনের প্রতিটি কর্মসূচিতে সরব ছিলেন।

আজিমপুর এলাকায় ৯ জুলাই লামিয়া প্রথম আলোকে জানান, “সেদিন ছাত্রলীগের হামলার সময় একজন মেয়ে আমার মতোই কী করবে বুঝে উঠতে না পেরে এদিকে-সেদিক তাকাচ্ছিল। তখন ওর হাত ধরে বলি, চলো, আমরা এদিক দিয়ে দৌড় দিই। আমরা যখন দৌড়াচ্ছিলাম, তখন ছাত্রলীগের কয়েকজন আমাদের মারতে তেড়ে আসে। এ রকমই একটি ছবি সে সময় ভাইরাল হয়, যা আমরা পরে জানতে পারি।”

লামিয়া বলেন, তাঁদের সেই ছবিটি সে সময় অনেক মানুষকে ঘরে থেকে বের হয়ে আন্দোলনে যোগ দিতে অনুপ্রাণিত করেছিল জেনে তাঁর ভালো লাগে। তবে বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত ও চাঁদাবাজিমুক্ত একটি কল্যাণমুখী বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন তাঁরা দেখেছিলেন, তার সিংহভাগই আজ দুই বছর পরও অপূর্ণ রয়ে গেছে। তাঁর স্পষ্ট অভিযোগ, একটি বিশেষ গোষ্ঠী জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পুরো কৃতিত্ব ও অর্জনকে সম্পূর্ণ নিজেদের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে, যার দরুন সাধারণ মানুষের মনে এই অভ্যুত্থান নিয়ে আগ্রহ দিন দিন কমে যাচ্ছে। একই সাথে লামিয়ার মনে একটি গভীর আক্ষেপও রয়েছে; তিনি জানান, গত দুই বছরে জুলাই আন্দোলন কেন্দ্রিক দেশে নানা ধরনের বড় বড় কর্মসূচি ও অনুষ্ঠান করা হলেও এবং সেখানে তাঁর ভাইরাল হওয়া ছবিটি বারবার ব্যবহার করা হলেও, তাঁকে বা তাঁর মতো যোদ্ধাদের কোনোদিন কোনো অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।

২০২৪ সালের সেই ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দিনগুলোতে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপটে এই সাতজন ব্যক্তি সরাসরি বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে নিজেদের প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। তাঁদের কাজের ধরন আলাদা হলেও, তাঁদের সকলের চাওয়া ও স্বপ্ন ছিল একেবারেই অভিন্ন—একটি সম্পূর্ণ বৈষম্যহীন ও সাম্যের বাংলাদেশ বিনির্মাণ। শেখ হাসিনা সরকারের পতনকে তাঁরা প্রত্যেকেই একটি ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী অর্জন হিসেবে গণ্য করেন। তবে যে নতুন বাংলাদেশ গড়ার মহান স্বপ্ন ও চেতনা বুকে ধারণ করে দেশের হাজারো মানুষ রাজপথে নিজেদের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিল এবং জীবন উৎসর্গ করেছিল, তার প্রকৃত বাস্তবায়নে দেশকে এখনো অনেক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে বলে তাঁরা মনে করেন। রাজপথের এই বীর যোদ্ধাদের চূড়ান্ত প্রত্যাশা—শহীদদের এই মহান আত্মত্যাগের প্রকৃত ও সঠিক মূল্যায়ন কেবল তখনই সম্ভব হবে, যখন এই রাষ্ট্রে সত্যিকার অর্থে আইনের শাসন, সর্বস্তরে জবাবদিহিতা এবং একটি বৈষম্যহীন সামগ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে।