ঢাকা ১১:৩৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

নির্বাচনের আগে স্থলভাগের গ্যাস ব্লক বিদেশিদের ইজারা দিতে তোড়জোড়, দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:৫০:১৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৫
  • ৪৩ বার পড়া হয়েছে

সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর আগ্রহ না পাওয়ার পর এবার স্থলভাগের জন্য গ্যাস উৎপাদন-বণ্টন চুক্তি (পিএসসি) চূড়ান্ত করার তোড়জোড় শুরু করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচনের আগে এমন উদ্যোগ কতটা বাস্তবসম্মত তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকার দেশের স্থলভাগের কোনো গ্যাস ব্লক বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে না দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে ক্ষমতার একেবারে শেষ সময়ে এসে তারা মার্কিন কোম্পানি শেভরনকে বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রের পাশের কিছু জমিতে নতুন অনুসন্ধান ও উত্তোলনের অনুমতি দেয়। এর বাইরে স্থলভাগের জন্য নতুন কোনো পিএসসি করা হয়নি। এখন পর্যন্ত ভোলা ছাড়া দেশের অন্য কোথাও তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বড় কোনো সাফল্যও আসেনি।

জানা গেছে, বিগত সরকারের শেষ দিকে সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের দরপত্র আহ্বান করা হলেও, অন্তর্বর্তী সরকার সেই দরপত্র বাতিল না করে বরং দরপত্র জমা দেওয়ার সময় বাড়ায়। এরপরও কোনো বহুজাতিক কোম্পানি বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আগ্রহ দেখায়নি।

পেট্রোবাংলার সূত্রমতে, দেশে গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে সরকার নতুন করে কূপ খনন করতে চাইছে এবং এ জন্য পেট্রোবাংলার ওপর চাপ রয়েছে। এই কারণে স্থলভাগের জন্য নতুন একটি পিএসসি তৈরি করা হয়েছে। এই পিএসসির মাধ্যমে স্থলভাগের সমতল ও পাহাড়ি—উভয় এলাকাতেই দরপত্র আহ্বান করে বিদেশি কোম্পানিকে কাজ দিতে চাইছে পেট্রোবাংলা।

পেট্রোবাংলার দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, নতুন পিএসসি-তে গ্যাসের দাম অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের (ব্রেন্ট ক্রুড) সঙ্গে সমন্বয় করে নির্ধারণ করা হয়েছে। এই নিয়মে ব্রেন্ট ক্রুডের দামের ৮.৫ শতাংশ গ্যাসের দাম হবে। যেমন, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার হলে এক হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম হবে ৮.৫ ডলার। গত ৯ অক্টোবর আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ৬৬.১০ ডলার, সে হিসাবে প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম হবে ৫.৬১ ডলার। বর্তমানে শেভরনসহ বিদেশি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে পেট্রোবাংলা আড়াই থেকে তিন ডলারের মধ্যে প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাস কেনে। তাই নতুন পিএসসি কার্যকর হলে স্থলভাগের গ্যাসের দামও বাড়বে।

পিএসসি অনুযায়ী, পেট্রোবাংলা এবং দরপত্রে বিজয়ী কোম্পানির মধ্যে চুক্তি হয়। সেই চুক্তি মেনে বিদেশি কোম্পানি বিনিয়োগ করে এবং গ্যাস পেলে ধাপে ধাপে বিনিয়োগের অর্থ তুলে নেয়। বাকি গ্যাস সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী পেট্রোবাংলা এবং উত্তোলনকারী কোম্পানির মধ্যে ভাগ করা হয়। পেট্রোবাংলা ওই কোম্পানির কাছ থেকে গ্যাস কিনে নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে সরবরাহ করে।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি) প্রকৌশলী মো. শোয়েব জানিয়েছেন, নতুন পিএসসি অনুমোদনের জন্য তাঁরা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন। তাঁর দাবি, সাগরের পিএসসির তুলনায় স্থলভাগের গ্যাসের দাম কম হবে। সরকারের অনুমোদন পেলে চলতি বছরের মধ্যে দরপত্র আহ্বান করা যাবে বলেও আশা করছেন তিনি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের ‘অনশোর’ (স্থলভাগ)-এর মতো জায়গায় দরপত্র আহ্বানের জন্য পিএসসি করা মোটেও ঠিক হচ্ছে না। সরকার ইতোমধ্যে সারের দাম ও শিল্পের গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে, যা উৎপাদন কমাবে এবং আমদানি খরচ বাড়াবে। তিনি আরও বলেন, সাগরের মতো স্থলভাগের তেল-গ্যাস অনুসন্ধান বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দিলে গ্যাসের দাম বাড়বে।

তিনি মনে করেন, গ্যাসের ঘাটতি পূরণে এখন বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে, তাই এই অবস্থায় অনশোরের গ্যাস আন্তর্জাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া ঠিক হবে না। শামসুল আলম স্থলভাগে কাজের জন্য বাপেক্সকে শক্তিশালী করার ওপর জোর দেন এবং বলেন, বাপেক্সকে প্রতিযোগিতামূলক সুযোগ দেওয়া উচিত, যাতে তারা বিদেশি কোম্পানির পাশাপাশি কাজ করতে পারে। তিনি আরও বলেন, এভাবে একতরফা বাপেক্সকে বাদ দিয়ে আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে বিদেশি কোম্পানির হাতে দেশের তেল-গ্যাস তুলে দেওয়াটা দেশদ্রোহিতার শামিল।

বর্তমানে দেশের স্থলভাগে দেশি ও বিদেশি মিলে ২২টি গ্যাসক্ষেত্র থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ১৮০০ থেকে ২০০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের জোগান দেওয়া হয়। এর বাইরে ভোলায় দুটি ক্ষেত্র থাকলেও তা সরাসরি জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ করতে পারে না। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সিলেট অঞ্চলের পর ভোলা-বরিশাল অঞ্চল গ্যাসের নতুন কেন্দ্র হতে পারে। যদিও ভোলার পর শরীয়তপুরে কূপ খনন করে বাপেক্স ব্যর্থ হয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা এখনও অনুসন্ধানের বাইরে। সুন্দরবনে গ্যাস পাওয়ার আশা দেখালেও শেভরন সেখানে উত্তোলন অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হবে না বলে মনে করছে।

অপরদিকে, পাহাড়ে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের ইতিহাস বেশ পুরোনো হলেও সেখানে কোনো কোম্পানিই তেমন সাফল্য পায়নি। তিন পার্বত্য জেলার অনুসন্ধানের ইতিহাস বলছে, ১৯১৪ সালে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে প্রথম বার্মা ওয়েল কোম্পানি কূপ খনন করে ব্যর্থ হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে আরও ১২টি কূপ খনন করা হলেও একটিতেও উত্তোলনযোগ্য গ্যাস মেলেনি।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সংসদে সংস্কার না হলে রাজপথে তীব্র আন্দোলনের হুঁশিয়ারি বিরোধী দলের

নির্বাচনের আগে স্থলভাগের গ্যাস ব্লক বিদেশিদের ইজারা দিতে তোড়জোড়, দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা

আপডেট সময় : ১০:৫০:১৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৫

সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর আগ্রহ না পাওয়ার পর এবার স্থলভাগের জন্য গ্যাস উৎপাদন-বণ্টন চুক্তি (পিএসসি) চূড়ান্ত করার তোড়জোড় শুরু করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচনের আগে এমন উদ্যোগ কতটা বাস্তবসম্মত তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকার দেশের স্থলভাগের কোনো গ্যাস ব্লক বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে না দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে ক্ষমতার একেবারে শেষ সময়ে এসে তারা মার্কিন কোম্পানি শেভরনকে বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রের পাশের কিছু জমিতে নতুন অনুসন্ধান ও উত্তোলনের অনুমতি দেয়। এর বাইরে স্থলভাগের জন্য নতুন কোনো পিএসসি করা হয়নি। এখন পর্যন্ত ভোলা ছাড়া দেশের অন্য কোথাও তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বড় কোনো সাফল্যও আসেনি।

জানা গেছে, বিগত সরকারের শেষ দিকে সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের দরপত্র আহ্বান করা হলেও, অন্তর্বর্তী সরকার সেই দরপত্র বাতিল না করে বরং দরপত্র জমা দেওয়ার সময় বাড়ায়। এরপরও কোনো বহুজাতিক কোম্পানি বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আগ্রহ দেখায়নি।

পেট্রোবাংলার সূত্রমতে, দেশে গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে সরকার নতুন করে কূপ খনন করতে চাইছে এবং এ জন্য পেট্রোবাংলার ওপর চাপ রয়েছে। এই কারণে স্থলভাগের জন্য নতুন একটি পিএসসি তৈরি করা হয়েছে। এই পিএসসির মাধ্যমে স্থলভাগের সমতল ও পাহাড়ি—উভয় এলাকাতেই দরপত্র আহ্বান করে বিদেশি কোম্পানিকে কাজ দিতে চাইছে পেট্রোবাংলা।

পেট্রোবাংলার দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, নতুন পিএসসি-তে গ্যাসের দাম অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের (ব্রেন্ট ক্রুড) সঙ্গে সমন্বয় করে নির্ধারণ করা হয়েছে। এই নিয়মে ব্রেন্ট ক্রুডের দামের ৮.৫ শতাংশ গ্যাসের দাম হবে। যেমন, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার হলে এক হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম হবে ৮.৫ ডলার। গত ৯ অক্টোবর আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ৬৬.১০ ডলার, সে হিসাবে প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম হবে ৫.৬১ ডলার। বর্তমানে শেভরনসহ বিদেশি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে পেট্রোবাংলা আড়াই থেকে তিন ডলারের মধ্যে প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাস কেনে। তাই নতুন পিএসসি কার্যকর হলে স্থলভাগের গ্যাসের দামও বাড়বে।

পিএসসি অনুযায়ী, পেট্রোবাংলা এবং দরপত্রে বিজয়ী কোম্পানির মধ্যে চুক্তি হয়। সেই চুক্তি মেনে বিদেশি কোম্পানি বিনিয়োগ করে এবং গ্যাস পেলে ধাপে ধাপে বিনিয়োগের অর্থ তুলে নেয়। বাকি গ্যাস সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী পেট্রোবাংলা এবং উত্তোলনকারী কোম্পানির মধ্যে ভাগ করা হয়। পেট্রোবাংলা ওই কোম্পানির কাছ থেকে গ্যাস কিনে নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে সরবরাহ করে।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি) প্রকৌশলী মো. শোয়েব জানিয়েছেন, নতুন পিএসসি অনুমোদনের জন্য তাঁরা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন। তাঁর দাবি, সাগরের পিএসসির তুলনায় স্থলভাগের গ্যাসের দাম কম হবে। সরকারের অনুমোদন পেলে চলতি বছরের মধ্যে দরপত্র আহ্বান করা যাবে বলেও আশা করছেন তিনি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের ‘অনশোর’ (স্থলভাগ)-এর মতো জায়গায় দরপত্র আহ্বানের জন্য পিএসসি করা মোটেও ঠিক হচ্ছে না। সরকার ইতোমধ্যে সারের দাম ও শিল্পের গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে, যা উৎপাদন কমাবে এবং আমদানি খরচ বাড়াবে। তিনি আরও বলেন, সাগরের মতো স্থলভাগের তেল-গ্যাস অনুসন্ধান বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দিলে গ্যাসের দাম বাড়বে।

তিনি মনে করেন, গ্যাসের ঘাটতি পূরণে এখন বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে, তাই এই অবস্থায় অনশোরের গ্যাস আন্তর্জাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া ঠিক হবে না। শামসুল আলম স্থলভাগে কাজের জন্য বাপেক্সকে শক্তিশালী করার ওপর জোর দেন এবং বলেন, বাপেক্সকে প্রতিযোগিতামূলক সুযোগ দেওয়া উচিত, যাতে তারা বিদেশি কোম্পানির পাশাপাশি কাজ করতে পারে। তিনি আরও বলেন, এভাবে একতরফা বাপেক্সকে বাদ দিয়ে আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে বিদেশি কোম্পানির হাতে দেশের তেল-গ্যাস তুলে দেওয়াটা দেশদ্রোহিতার শামিল।

বর্তমানে দেশের স্থলভাগে দেশি ও বিদেশি মিলে ২২টি গ্যাসক্ষেত্র থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ১৮০০ থেকে ২০০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের জোগান দেওয়া হয়। এর বাইরে ভোলায় দুটি ক্ষেত্র থাকলেও তা সরাসরি জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ করতে পারে না। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সিলেট অঞ্চলের পর ভোলা-বরিশাল অঞ্চল গ্যাসের নতুন কেন্দ্র হতে পারে। যদিও ভোলার পর শরীয়তপুরে কূপ খনন করে বাপেক্স ব্যর্থ হয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা এখনও অনুসন্ধানের বাইরে। সুন্দরবনে গ্যাস পাওয়ার আশা দেখালেও শেভরন সেখানে উত্তোলন অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হবে না বলে মনে করছে।

অপরদিকে, পাহাড়ে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের ইতিহাস বেশ পুরোনো হলেও সেখানে কোনো কোম্পানিই তেমন সাফল্য পায়নি। তিন পার্বত্য জেলার অনুসন্ধানের ইতিহাস বলছে, ১৯১৪ সালে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে প্রথম বার্মা ওয়েল কোম্পানি কূপ খনন করে ব্যর্থ হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে আরও ১২টি কূপ খনন করা হলেও একটিতেও উত্তোলনযোগ্য গ্যাস মেলেনি।