ঢাকা ০৩:৩৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

মৃত্যুকূপে চট্টগ্রাম: পাহাড় কাটা ও খাল ভরাটের বলি হচ্ছে জনজীবন

চট্টগ্রামে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধসে প্রাণহানি এখন এক নিয়মিত ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে। গত কয়েক দিনে প্রায় ত্রিশজনের মতো মানুষ মাটিচাপা পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন, যা কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং একে বিশ্লেষকরা ‘কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে দেখছেন। ২০০৭ সালের জুনে পাহাড়ধসে ১৩০ জনের মৃত্যুর পর থেকে ধারাবাহিকভাবে এই মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৭৬ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে চট্টগ্রামের প্রায় ৬০ শতাংশ পাহাড় কাটা হয়েছিল। পরবর্তী দেড় দশকে বায়েজিদ-ফৌজদারহাট লিংক রোড নির্মাণ এবং জালালাবাদ ও আকবরশাহ এলাকায় বেপরোয়া আগ্রাসনের ফলে আরও ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পাহাড় তার চরিত্র হারিয়েছে। অর্থাৎ, গত ৫০ বছরে চট্টগ্রামের মূল পাহাড়গুলোর প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ ধ্বংসের শিকার হয়েছে, যা এই অঞ্চলকে এখন মৃত্যুকূপে পরিণত করেছে।

চট্টগ্রামের পাহাড়ের ভূতাত্ত্বিক গঠন নরম বেলেমাটি ও কাদা মাটির স্তর দিয়ে তৈরি, যা প্রাকৃতিকভাবেই দুর্বল। পাহাড়ের গাছপালা মাটির শিকড় ধরে রেখে প্রাকৃতিক ‘রিটেইনিং ওয়াল’ হিসেবে কাজ করে। কিন্তু আবাসন প্রকল্প, রাস্তা নির্মাণ কিংবা মাটি বিক্রির লোভে পাহাড়ের পাদদেশ কেটে খাড়া করার কারণে সেই প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে। বর্ষায় একটানা বৃষ্টিপাতে গাছপালাহীন বেলেমাটি স্পঞ্জ হয়ে ওজন বাড়িয়ে ফেলে এবং ‘অভ্যন্তরীণ কৃন্তন শক্তি’ হারিয়ে বিশাল মাটির চাঁই হিসেবে নিচে ধসে পড়ে। একই সঙ্গে নগরের প্রাকৃতিক জলধারা বা ‘ছড়া’গুলো দখল করে কংক্রিটের দেয়াল দিয়ে আটকে ফেলায় জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ি জলীয় চাপের সৃষ্টি হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।

এই বিপর্যয়ের পেছনে কুৎসিত রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সমীকরণ ও সুসংগঠিত সিন্ডিকেটের হাত রয়েছে। পাহাড়ের চূড়ায় উচ্চবিত্তের জন্য বিলাসবহুল প্লট বা রিসোর্ট তৈরি করা হচ্ছে, আর কাটা পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ পাদদেশে সস্তা আশ্রয়ের খোঁজে বসতি গড়ছে ছিন্নমূল মানুষ। রাষ্ট্র কোনো সুনির্দিষ্ট সরকারি শুমারি বা ডাটাবেজ তৈরি না করায় ভূমিদস্যুরা অবাধে পাহাড় সাবাড় করে চলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চট্টগ্রাম নগরীর জন্য প্রথাগত নগর পরিকল্পনা আর কার্যকর নয়; এর পরিবর্তে ‘ওয়েট আরবানিসম’ বা ‘আর্দ্র নগরায়ণ’ ধারণার প্রয়োগ জরুরি। যেখানে পানিকে শত্রু না ভেবে তার স্বাভাবিক প্রবাহকে মেনে নিয়ে সহাবস্থানের নকশা করা হবে।

পাহাড় রক্ষায় সিডিএ ও সিটি কর্পোরেশনের মহাপরিকল্পনায় জিআইএস ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে ‘ইকো-সেনসিটিভ ডিজিটাল জোনিং’ করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোকে কঠোর নজরদারিতে আনা প্রয়োজন। কংক্রিটের খাড়া রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণের চেয়ে পরিবেশবান্ধব ‘বায়ো-ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা বিন্না ঘাস লাগানোর মতো পদ্ধতি বেশি কার্যকর। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী মানুষের জন্য ‘পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ’ মডেলে নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা। ভূমিদস্যুদের হাত থেকে পাহাড় রক্ষা এবং প্রকৃতির সাথে সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করতে না পারলে, মৃত্যু উপত্যকার এই চক্র থেকে চট্টগ্রাম কোনোদিন মুক্তি পাবে না।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

মৃত্যুকূপে চট্টগ্রাম: পাহাড় কাটা ও খাল ভরাটের বলি হচ্ছে জনজীবন

আপডেট সময় : ০২:৩২:০০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

চট্টগ্রামে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধসে প্রাণহানি এখন এক নিয়মিত ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে। গত কয়েক দিনে প্রায় ত্রিশজনের মতো মানুষ মাটিচাপা পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন, যা কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং একে বিশ্লেষকরা ‘কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে দেখছেন। ২০০৭ সালের জুনে পাহাড়ধসে ১৩০ জনের মৃত্যুর পর থেকে ধারাবাহিকভাবে এই মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৭৬ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে চট্টগ্রামের প্রায় ৬০ শতাংশ পাহাড় কাটা হয়েছিল। পরবর্তী দেড় দশকে বায়েজিদ-ফৌজদারহাট লিংক রোড নির্মাণ এবং জালালাবাদ ও আকবরশাহ এলাকায় বেপরোয়া আগ্রাসনের ফলে আরও ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পাহাড় তার চরিত্র হারিয়েছে। অর্থাৎ, গত ৫০ বছরে চট্টগ্রামের মূল পাহাড়গুলোর প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ ধ্বংসের শিকার হয়েছে, যা এই অঞ্চলকে এখন মৃত্যুকূপে পরিণত করেছে।

চট্টগ্রামের পাহাড়ের ভূতাত্ত্বিক গঠন নরম বেলেমাটি ও কাদা মাটির স্তর দিয়ে তৈরি, যা প্রাকৃতিকভাবেই দুর্বল। পাহাড়ের গাছপালা মাটির শিকড় ধরে রেখে প্রাকৃতিক ‘রিটেইনিং ওয়াল’ হিসেবে কাজ করে। কিন্তু আবাসন প্রকল্প, রাস্তা নির্মাণ কিংবা মাটি বিক্রির লোভে পাহাড়ের পাদদেশ কেটে খাড়া করার কারণে সেই প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে। বর্ষায় একটানা বৃষ্টিপাতে গাছপালাহীন বেলেমাটি স্পঞ্জ হয়ে ওজন বাড়িয়ে ফেলে এবং ‘অভ্যন্তরীণ কৃন্তন শক্তি’ হারিয়ে বিশাল মাটির চাঁই হিসেবে নিচে ধসে পড়ে। একই সঙ্গে নগরের প্রাকৃতিক জলধারা বা ‘ছড়া’গুলো দখল করে কংক্রিটের দেয়াল দিয়ে আটকে ফেলায় জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ি জলীয় চাপের সৃষ্টি হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।

এই বিপর্যয়ের পেছনে কুৎসিত রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সমীকরণ ও সুসংগঠিত সিন্ডিকেটের হাত রয়েছে। পাহাড়ের চূড়ায় উচ্চবিত্তের জন্য বিলাসবহুল প্লট বা রিসোর্ট তৈরি করা হচ্ছে, আর কাটা পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ পাদদেশে সস্তা আশ্রয়ের খোঁজে বসতি গড়ছে ছিন্নমূল মানুষ। রাষ্ট্র কোনো সুনির্দিষ্ট সরকারি শুমারি বা ডাটাবেজ তৈরি না করায় ভূমিদস্যুরা অবাধে পাহাড় সাবাড় করে চলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চট্টগ্রাম নগরীর জন্য প্রথাগত নগর পরিকল্পনা আর কার্যকর নয়; এর পরিবর্তে ‘ওয়েট আরবানিসম’ বা ‘আর্দ্র নগরায়ণ’ ধারণার প্রয়োগ জরুরি। যেখানে পানিকে শত্রু না ভেবে তার স্বাভাবিক প্রবাহকে মেনে নিয়ে সহাবস্থানের নকশা করা হবে।

পাহাড় রক্ষায় সিডিএ ও সিটি কর্পোরেশনের মহাপরিকল্পনায় জিআইএস ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে ‘ইকো-সেনসিটিভ ডিজিটাল জোনিং’ করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোকে কঠোর নজরদারিতে আনা প্রয়োজন। কংক্রিটের খাড়া রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণের চেয়ে পরিবেশবান্ধব ‘বায়ো-ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা বিন্না ঘাস লাগানোর মতো পদ্ধতি বেশি কার্যকর। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী মানুষের জন্য ‘পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ’ মডেলে নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা। ভূমিদস্যুদের হাত থেকে পাহাড় রক্ষা এবং প্রকৃতির সাথে সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করতে না পারলে, মৃত্যু উপত্যকার এই চক্র থেকে চট্টগ্রাম কোনোদিন মুক্তি পাবে না।