ঢাকা ০১:১৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

পাহাড় ধসে মৃত্যুঝুঁকিতে কক্সবাজার: রোহিঙ্গা শিবিরে চরম পরিবেশগত ও মানবিক বিপর্যয়

কক্সবাজারজুড়ে এখন পাহাড় ধসের আতঙ্ক গ্রাস করেছে। গত কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে অন্তত দুই ডজন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং এখনো সহস্রাধিক মানুষ চরম মৃত্যুঝুঁকিতে রয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের ব্যাপক হারে প্রবেশের পর থেকে এই অঞ্চলে পরিবেশগত বিপর্যয় ও পাহাড় ধসের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। গত ৯ বছরে পাহাড়ে শতাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, যেখানে তার আগের এক দশকে এই সংখ্যা ছিল মাত্র নয়। উখিয়ার ৩৩টি রোহিঙ্গা শিবির পাহাড় কেটে গড়ে তোলায় গভীর বন ও বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য ধ্বংস হয়েছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার চাপে কক্সবাজারের পরিবেশ মৃতপ্রায় এবং পর্যটন খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রোহিঙ্গাসংকট কেবল পরিবেশগত বিপর্যয় নয়, বরং এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য বহুমুখী হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আশ্রয়শিবিরগুলো ঘিরে মাদক পাচার, মানব পাচার, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর শক্তিশালী অপরাধী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট জালিয়াতি ও সাগরপথে অবৈধভাবে বিদেশ গমনের চেষ্টায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে, যার প্রভাবে শ্রমশক্তি রপ্তানি খাত হুমকির মুখে পড়েছে। স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সম্পদের সীমিত ভাগাভাগি এবং শ্রমবাজারের প্রতিযোগিতায় সামাজিক টানাপোড়েনও বাড়ছে। অন্যদিকে, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও আরাকান আর্মির কর্মকাণ্ডের ফলে বাংলাদেশ সীমান্ত বর্তমানে অত্যন্ত অস্থিতিশীল, যা দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের বিষয়।

এই সংকট নিরসনে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের ‘জাতীয় কর্মপরিকল্পনা কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিতে সামরিক বাহিনী, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা বর্তমান সরকারের কঠোর ও কৌশলগত অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের পরপরই এই কমিটির গঠন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তা কমে আসা এবং সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সরকার এখন প্রত্যাবাসন প্রচেষ্টাকে ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি নিরাপত্তামূলক দৃষ্টিভঙ্গিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। রোহিঙ্গারা এখন আর কেবল একটি মানবিক সমস্যা নয়, বরং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এটি একটি জাতীয় চ্যালেঞ্জ, যার দ্রুত ও টেকসই সমাধান জরুরি।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

চাঁদপুরে গভীর রাতে ডাকাতি, গৃহবধূ নিহত

পাহাড় ধসে মৃত্যুঝুঁকিতে কক্সবাজার: রোহিঙ্গা শিবিরে চরম পরিবেশগত ও মানবিক বিপর্যয়

আপডেট সময় : ১২:০৯:০০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

কক্সবাজারজুড়ে এখন পাহাড় ধসের আতঙ্ক গ্রাস করেছে। গত কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে অন্তত দুই ডজন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং এখনো সহস্রাধিক মানুষ চরম মৃত্যুঝুঁকিতে রয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের ব্যাপক হারে প্রবেশের পর থেকে এই অঞ্চলে পরিবেশগত বিপর্যয় ও পাহাড় ধসের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। গত ৯ বছরে পাহাড়ে শতাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, যেখানে তার আগের এক দশকে এই সংখ্যা ছিল মাত্র নয়। উখিয়ার ৩৩টি রোহিঙ্গা শিবির পাহাড় কেটে গড়ে তোলায় গভীর বন ও বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য ধ্বংস হয়েছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার চাপে কক্সবাজারের পরিবেশ মৃতপ্রায় এবং পর্যটন খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রোহিঙ্গাসংকট কেবল পরিবেশগত বিপর্যয় নয়, বরং এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য বহুমুখী হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আশ্রয়শিবিরগুলো ঘিরে মাদক পাচার, মানব পাচার, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর শক্তিশালী অপরাধী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট জালিয়াতি ও সাগরপথে অবৈধভাবে বিদেশ গমনের চেষ্টায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে, যার প্রভাবে শ্রমশক্তি রপ্তানি খাত হুমকির মুখে পড়েছে। স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সম্পদের সীমিত ভাগাভাগি এবং শ্রমবাজারের প্রতিযোগিতায় সামাজিক টানাপোড়েনও বাড়ছে। অন্যদিকে, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও আরাকান আর্মির কর্মকাণ্ডের ফলে বাংলাদেশ সীমান্ত বর্তমানে অত্যন্ত অস্থিতিশীল, যা দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের বিষয়।

এই সংকট নিরসনে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের ‘জাতীয় কর্মপরিকল্পনা কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিতে সামরিক বাহিনী, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা বর্তমান সরকারের কঠোর ও কৌশলগত অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের পরপরই এই কমিটির গঠন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তা কমে আসা এবং সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সরকার এখন প্রত্যাবাসন প্রচেষ্টাকে ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি নিরাপত্তামূলক দৃষ্টিভঙ্গিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। রোহিঙ্গারা এখন আর কেবল একটি মানবিক সমস্যা নয়, বরং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এটি একটি জাতীয় চ্যালেঞ্জ, যার দ্রুত ও টেকসই সমাধান জরুরি।