ঢাকা ০২:৪৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার: হুমকির মুখে খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষকের জীবন

বাংলাদেশের নাগরিক জীবনে ‘ভেজাল’ এখন এক বড় উদ্বেগের নাম। খাদ্যে ভেজালের পাশাপাশি বর্তমানে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত বালাইনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নতুন করে সংকট তৈরি করছে। কৃষিতে এই প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে ছড়িয়ে পড়ায় দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও নিরাপদতা মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়ছে, পাশাপাশি কৃষকদের জীবন-জীবিকাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অথচ রাসায়নিকের নিয়মতান্ত্রিক ব্যবহার যেখানে ওষুধ, সেখানে অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বিষতুল্য – এই সহজ সত্যটি প্রায়শই উপেক্ষিত হচ্ছে।

মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক উপাদান হলো খাদ্য, যা ক্ষুধা নিবারণ ও পুষ্টিসাধন করে। কিন্তু বর্তমানে আমাদের দেশের মানুষ দৈনন্দিন পুষ্টির জন্য যে খাদ্য গ্রহণ করছে, তা কতটা নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদনে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রায় ৭৫ শতাংশ খাদ্য উৎপাদনে মাত্রাতিরিক্ত বালাইনাশক এবং ২৫ শতাংশ খাদ্য সংরক্ষণ, বাজারজাত ও প্রক্রিয়াজাতকরণে বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় বলে জানা গেছে। ধান, শাকসবজি, ফলমূল ও অন্যান্য ফসল উৎপাদনে এই প্রবণতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

কাঁচা ফল পাকানো এবং আকর্ষণীয় রং আনার জন্য ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ইথেফোন ও রাইপেনের মতো রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলে অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছে ভোক্তারা অসহায় হয়ে পড়েছেন। একসময় জৈব সার, যেমন—গোবর, হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা, ছাই, লতাপাতা, সবুজ সার, কচুরিপানা, ফসলের উচ্ছিষ্টাংশ এবং রান্নাঘরের আবর্জনা পচিয়ে ব্যবহার করা হতো, যা পুষ্টিকর ও বিষমুক্ত খাবার উৎপাদনে সহায়ক ছিল। কিন্তু এখন খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে সঠিক রাসায়নিক সার ও বালাইনাশকের ব্যবহার পদ্ধতি অনুসরণ না করার কারণে খাদ্যগ্রহণের আনন্দ আতঙ্কে রূপ নিচ্ছে।

বালাইনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ছাড়াও কৃষকরা প্রতিনিয়ত নানা কৃষি রাসায়নিকের মিশ্রণে ‘ককটেল’ নামক এক ধরনের বালাইনাশক তৈরি করছেন। এই ‘ককটেল’ বাংলাদেশের কৃষির জন্য একটি মরণব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অনেক সময় কৃষকদের নিজস্ব আগ্রহে, আবার অনেক সময় বালাইনাশক বিক্রেতাদের ভুল পরামর্শে তারা জমিতে এই ‘ককটেল’ স্প্রে করছেন। সাধারণত কীটনাশক, ছত্রাকনাশক, মাকড়নাশক, হরমোন (ভিটামিন) এবং মাইক্রো নিউট্রিয়েন্ট বা অনুখাদ্যগুলো সম্মিলিতভাবে মিশিয়ে গাছে স্প্রে করা হয়, অথচ অনেক ক্ষেত্রেই এগুলোর কোনো প্রয়োজনীয়তাই থাকে না। প্রতিটিই আলাদা আলাদা রাসায়নিক হওয়া সত্ত্বেও অযাচিত মিশ্রণ ফসল ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হয়ে ওঠে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা প্রশমনে মধ্যস্থতায় কাতার, পাকিস্তানসহ আঞ্চলিক দেশগুলো

মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার: হুমকির মুখে খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষকের জীবন

আপডেট সময় : ০১:৩৩:৪০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশের নাগরিক জীবনে ‘ভেজাল’ এখন এক বড় উদ্বেগের নাম। খাদ্যে ভেজালের পাশাপাশি বর্তমানে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত বালাইনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নতুন করে সংকট তৈরি করছে। কৃষিতে এই প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে ছড়িয়ে পড়ায় দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও নিরাপদতা মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়ছে, পাশাপাশি কৃষকদের জীবন-জীবিকাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অথচ রাসায়নিকের নিয়মতান্ত্রিক ব্যবহার যেখানে ওষুধ, সেখানে অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বিষতুল্য – এই সহজ সত্যটি প্রায়শই উপেক্ষিত হচ্ছে।

মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক উপাদান হলো খাদ্য, যা ক্ষুধা নিবারণ ও পুষ্টিসাধন করে। কিন্তু বর্তমানে আমাদের দেশের মানুষ দৈনন্দিন পুষ্টির জন্য যে খাদ্য গ্রহণ করছে, তা কতটা নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদনে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রায় ৭৫ শতাংশ খাদ্য উৎপাদনে মাত্রাতিরিক্ত বালাইনাশক এবং ২৫ শতাংশ খাদ্য সংরক্ষণ, বাজারজাত ও প্রক্রিয়াজাতকরণে বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় বলে জানা গেছে। ধান, শাকসবজি, ফলমূল ও অন্যান্য ফসল উৎপাদনে এই প্রবণতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

কাঁচা ফল পাকানো এবং আকর্ষণীয় রং আনার জন্য ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ইথেফোন ও রাইপেনের মতো রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলে অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছে ভোক্তারা অসহায় হয়ে পড়েছেন। একসময় জৈব সার, যেমন—গোবর, হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা, ছাই, লতাপাতা, সবুজ সার, কচুরিপানা, ফসলের উচ্ছিষ্টাংশ এবং রান্নাঘরের আবর্জনা পচিয়ে ব্যবহার করা হতো, যা পুষ্টিকর ও বিষমুক্ত খাবার উৎপাদনে সহায়ক ছিল। কিন্তু এখন খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে সঠিক রাসায়নিক সার ও বালাইনাশকের ব্যবহার পদ্ধতি অনুসরণ না করার কারণে খাদ্যগ্রহণের আনন্দ আতঙ্কে রূপ নিচ্ছে।

বালাইনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ছাড়াও কৃষকরা প্রতিনিয়ত নানা কৃষি রাসায়নিকের মিশ্রণে ‘ককটেল’ নামক এক ধরনের বালাইনাশক তৈরি করছেন। এই ‘ককটেল’ বাংলাদেশের কৃষির জন্য একটি মরণব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অনেক সময় কৃষকদের নিজস্ব আগ্রহে, আবার অনেক সময় বালাইনাশক বিক্রেতাদের ভুল পরামর্শে তারা জমিতে এই ‘ককটেল’ স্প্রে করছেন। সাধারণত কীটনাশক, ছত্রাকনাশক, মাকড়নাশক, হরমোন (ভিটামিন) এবং মাইক্রো নিউট্রিয়েন্ট বা অনুখাদ্যগুলো সম্মিলিতভাবে মিশিয়ে গাছে স্প্রে করা হয়, অথচ অনেক ক্ষেত্রেই এগুলোর কোনো প্রয়োজনীয়তাই থাকে না। প্রতিটিই আলাদা আলাদা রাসায়নিক হওয়া সত্ত্বেও অযাচিত মিশ্রণ ফসল ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হয়ে ওঠে।