ঢাকা ০৩:২৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

ডিজিটাল পর্দার আসক্তি: শিশুদের ভবিষ্যৎ গ্রাস করছে প্রযুক্তি?

স্মার্টফোন, ট্যাব, টেলিভিশন এবং নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন হলো, এই প্রযুক্তিগুলো কি আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নির্মাণে সহায়তা করছে, নাকি ধীরে ধীরে তাদের গ্রাস করছে?

আসক্তি কেবল কোনো কিছু ‘বেশি’ পরিমাণে করা নয়, বরং এটি এমন এক অবস্থা যেখানে কোনো অভ্যাসের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায়। সেই অভ্যাস ছাড়া স্বাভাবিক থাকা কঠিন হয়ে পড়ে এবং তা ক্ষতিকর জেনেও চালিয়ে যাওয়া হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে আসক্তির প্রকাশ হয়তো ততটা নাটকীয় নয়, তবে এর লক্ষণগুলো সহজেই চেনা যায়। একটি শিশু ডিভাইসের প্রতি আসক্ত কিনা, তা বোঝার জন্য কিছু স্পষ্ট লক্ষণ রয়েছে। যেমন, ডিভাইস কেড়ে নিলে সে অস্বাভাবিক আচরণ করে বা কান্নাকাটি করে। পড়াশোনা, খেলাধুলা, খাওয়া বা ঘুমের চেয়ে স্ক্রিনকে বেশি প্রাধান্য দেয়। স্ক্রিন ছাড়া সে সময় কাটাতে পারে না। এমনকি স্ক্রিনের জন্য মিথ্যা বলা বা লুকিয়ে ডিভাইস ব্যবহার করার প্রবণতাও দেখা যায়। এই লক্ষণগুলো একসঙ্গে উপস্থিত থাকলে বুঝতে হবে, এটি আর নিছক বিনোদনের পর্যায়ে নেই, বরং নির্ভরতায় রূপ নিয়েছে।

সাম্প্রতিক একটি গবেষণা বাংলাদেশের শিশুদের মধ্যে ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহারের উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। আইসিডিডিআর,বি ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ঢাকার ছয়টি স্কুলের (তিনটি বাংলা এবং তিনটি ইংরেজি মাধ্যম) ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী ৪২০ জন শিশুর ওপর একটি গবেষণা পরিচালনা করে। এই গবেষণার ফলাফল সম্প্রতি ‘জার্নাল অব মেডিকেল ইন্টারনেট রিসার্চ (জেএমআইআর) হিউম্যান ফ্যাক্টরস’-এ প্রকাশিত হয়েছে। এতে দেখা গেছে, ঢাকার শিশুরা গড়ে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ডিজিটাল স্ক্রিনে (স্মার্টফোন, টেলিভিশন, ট্যাব বা গেমিং ডিভাইস) ব্যয় করে। প্রতি পাঁচজনের মধ্যে চারজন শিশু প্রতিদিন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রায় দুই ঘণ্টার সীমা অতিক্রম করে স্ক্রিন ব্যবহার করে। প্রায় এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি শিশু চোখের সমস্যায় এবং প্রায় ৮০ শতাংশ শিশু ঘন ঘন মাথাব্যথায় ভুগছে। যারা দিনে দুই ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করে, তারা গড়ে মাত্র ৭.৩ ঘণ্টা ঘুমায়, যা এই বয়সের শিশুদের মস্তিষ্কের সুস্থ বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টার চেয়ে অনেক কম। অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতার শিকার প্রায় ১৪ শতাংশ শিশু, যাদের মধ্যে অতিরিক্ত ব্যবহারকারীদের হার সবচেয়ে বেশি। এছাড়া, প্রতি পাঁচজনের মধ্যে প্রায় দুজন শিশু দুশ্চিন্তা, অতি-চঞ্চলতা বা আচরণগত সমস্যার মতো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে। ডিভাইস আসক্ত শিশুদের স্ক্রিনের আলো তাদের ঘুমচক্রকে ব্যাহত করে এবং দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার কারণে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

লবণাক্ততাকে হার মানিয়ে সবজি চাষ, বদলে দিলেন গ্রামের চিত্র

ডিজিটাল পর্দার আসক্তি: শিশুদের ভবিষ্যৎ গ্রাস করছে প্রযুক্তি?

আপডেট সময় : ১০:৪৮:৩৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

স্মার্টফোন, ট্যাব, টেলিভিশন এবং নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন হলো, এই প্রযুক্তিগুলো কি আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নির্মাণে সহায়তা করছে, নাকি ধীরে ধীরে তাদের গ্রাস করছে?

আসক্তি কেবল কোনো কিছু ‘বেশি’ পরিমাণে করা নয়, বরং এটি এমন এক অবস্থা যেখানে কোনো অভ্যাসের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায়। সেই অভ্যাস ছাড়া স্বাভাবিক থাকা কঠিন হয়ে পড়ে এবং তা ক্ষতিকর জেনেও চালিয়ে যাওয়া হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে আসক্তির প্রকাশ হয়তো ততটা নাটকীয় নয়, তবে এর লক্ষণগুলো সহজেই চেনা যায়। একটি শিশু ডিভাইসের প্রতি আসক্ত কিনা, তা বোঝার জন্য কিছু স্পষ্ট লক্ষণ রয়েছে। যেমন, ডিভাইস কেড়ে নিলে সে অস্বাভাবিক আচরণ করে বা কান্নাকাটি করে। পড়াশোনা, খেলাধুলা, খাওয়া বা ঘুমের চেয়ে স্ক্রিনকে বেশি প্রাধান্য দেয়। স্ক্রিন ছাড়া সে সময় কাটাতে পারে না। এমনকি স্ক্রিনের জন্য মিথ্যা বলা বা লুকিয়ে ডিভাইস ব্যবহার করার প্রবণতাও দেখা যায়। এই লক্ষণগুলো একসঙ্গে উপস্থিত থাকলে বুঝতে হবে, এটি আর নিছক বিনোদনের পর্যায়ে নেই, বরং নির্ভরতায় রূপ নিয়েছে।

সাম্প্রতিক একটি গবেষণা বাংলাদেশের শিশুদের মধ্যে ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহারের উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। আইসিডিডিআর,বি ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ঢাকার ছয়টি স্কুলের (তিনটি বাংলা এবং তিনটি ইংরেজি মাধ্যম) ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী ৪২০ জন শিশুর ওপর একটি গবেষণা পরিচালনা করে। এই গবেষণার ফলাফল সম্প্রতি ‘জার্নাল অব মেডিকেল ইন্টারনেট রিসার্চ (জেএমআইআর) হিউম্যান ফ্যাক্টরস’-এ প্রকাশিত হয়েছে। এতে দেখা গেছে, ঢাকার শিশুরা গড়ে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ডিজিটাল স্ক্রিনে (স্মার্টফোন, টেলিভিশন, ট্যাব বা গেমিং ডিভাইস) ব্যয় করে। প্রতি পাঁচজনের মধ্যে চারজন শিশু প্রতিদিন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রায় দুই ঘণ্টার সীমা অতিক্রম করে স্ক্রিন ব্যবহার করে। প্রায় এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি শিশু চোখের সমস্যায় এবং প্রায় ৮০ শতাংশ শিশু ঘন ঘন মাথাব্যথায় ভুগছে। যারা দিনে দুই ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করে, তারা গড়ে মাত্র ৭.৩ ঘণ্টা ঘুমায়, যা এই বয়সের শিশুদের মস্তিষ্কের সুস্থ বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টার চেয়ে অনেক কম। অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতার শিকার প্রায় ১৪ শতাংশ শিশু, যাদের মধ্যে অতিরিক্ত ব্যবহারকারীদের হার সবচেয়ে বেশি। এছাড়া, প্রতি পাঁচজনের মধ্যে প্রায় দুজন শিশু দুশ্চিন্তা, অতি-চঞ্চলতা বা আচরণগত সমস্যার মতো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে। ডিভাইস আসক্ত শিশুদের স্ক্রিনের আলো তাদের ঘুমচক্রকে ব্যাহত করে এবং দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার কারণে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।