যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার প্রত্যাশায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এর প্রভাবে বাংলাদেশেও জ্বালানি তেলের দাম কমার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য কমলেও দেশীয় বাজারে সেই সুবিধা কতটা ভোক্তাদের কাছে পৌঁছাবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
বিশ্ববাজারে গত কয়েক দিনের দরপতনে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলারের কাছাকাছি নেমে এসেছে। শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৭৯ দশমিক ৪২ ডলারে নেমে যায়, যা গত মার্চের পর সর্বনিম্ন। শনিবার সামান্য বেড়ে তা ৮০ দশমিক ৫৭ ডলারে দাঁড়ায়। একই সময়ে মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দামও কমে ৭৭ ডলারের ঘরে নেমেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রাথমিক সমঝোতা হওয়ায় বাজারে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা কমেছে। চুক্তির ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করতে পারে। পাশাপাশি ইরানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে সরবরাহ আরও বাড়বে, যা দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম কমলে দেশের বাজারেও তার প্রতিফলন হওয়া উচিত। বিশেষ করে পেট্রল ও অকটেনের ক্ষেত্রে দাম কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। কারণ, দাম বৃদ্ধির সময় ভোক্তারা অতিরিক্ত ব্যয় বহন করেছেন। এখন বাজার নিম্নমুখী হলে সেই সুবিধা তাদের পাওয়া উচিত।
তবে ডিজেলের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, ডিজেলের দাম বাড়লে পরিবহন ভাড়া ও পণ্য পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায়। কিন্তু পরে দাম কমলেও সাধারণত সেই হারে ভাড়া কমানো হয় না। ফলে ডিজেলের মূল্যহ্রাসের সুফল ভোক্তাদের চেয়ে পরিবহন মালিক ও ব্যবসায়ীদের কাছেই বেশি থেকে যায়।
বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণে বর্তমানে স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয় পদ্ধতি চালু রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সংস্কার কর্মসূচির অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের মার্চ থেকে সরকার এই পদ্ধতি কার্যকর করে। নিয়ম অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে আগের মাসের গড় আমদানি মূল্য বিবেচনায় প্রতি মাসে নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়। তবে বাস্তবে দাম বাড়ার ক্ষেত্রে দ্রুত সমন্বয় হলেও কমার ক্ষেত্রে একই গতিতে প্রতিফলন দেখা যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা শুরু হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। এর প্রভাবে দেশে জ্বালানি তেলের দাম একাধিক দফায় বাড়ানো হয়। গত ১৯ এপ্রিল সরকার ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করে। একই সঙ্গে কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দামও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। পরে জুন মাসের জন্য পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম আরও ৫ টাকা বাড়ানো হয়।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতিতেও পড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে দেশের মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে, যা গত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
এদিকে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) বাজারেও অস্থিরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র পাঁচ মাসে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৭৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছিল। যদিও জুন মাসে এলপিজির দাম ৫৫ টাকা কমানো হয়েছে। বর্তমানে ১২ কেজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮৮৫ টাকায়।
বাংলাদেশ এনার্জি কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি আজম জে চৌধুরী মনে করেন, বিশ্বব্যাপী নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ার ফলে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর চাপ কমছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি তেলের দাম আরও কমার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এটি অর্থনৈতিক চাপ কমানোর একটি ইতিবাচক সুযোগ তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম. শামসুল আলম বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে মূল্য সমন্বয়ের কথা বলা হলেও বাস্তবে ভোক্তারা কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পান না। বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে দ্রুত মূল্যবৃদ্ধি করা হয়, কিন্তু কমলে সেই অনুপাতে দাম হ্রাস করা হয় না। ফলে সাধারণ মানুষ প্রকৃত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমার পাশাপাশি বীমা ব্যয় ও জাহাজ ভাড়াও কমতে শুরু করেছে। এতে সামগ্রিক আমদানি ব্যয় হ্রাস পাবে। তিনি বলেন, সৌদি আরামকোর মূল্যসূচক ও ডলারের বিনিময় হার বিবেচনায় জ্বালানির মূল্য নিয়মিত সমন্বয় করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম কমার প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশেও মূল্য সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হবে। তবে সেই সুবিধা কত দ্রুত এবং কতটা সাধারণ ভোক্তাদের কাছে পৌঁছাবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
রিপোর্টারের নাম 

























