ঢাকা ১২:৫৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

এক বছরে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বেড়েছে ৪১ শতাংশ, জমা অর্থ ছাড়াল ১২ হাজার কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক

সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থ এক বছরের ব্যবধানে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের (এসএনবি) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁ, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪১ শতাংশ বেশি।

২০২৪ সালের শেষে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের আমানতের পরিমাণ ছিল ৫৯ কোটি সুইস ফ্রাঁ। এক বছরের ব্যবধানে সেই অঙ্ক বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁতে। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী প্রতি সুইস ফ্রাঁর মূল্য প্রায় ১৫২ টাকা ধরে হিসাব করলে, বাংলাদেশিদের জমাকৃত অর্থের পরিমাণ প্রায় ১২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) প্রকাশিত তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালের পর এবারই সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্থ জমা হয়েছে। একই সঙ্গে গত এক দশকের মধ্যে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আমানতের রেকর্ড।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের নামে থাকা অর্থের সবটাই ব্যক্তিগত আমানত নয়। এর মধ্যে ব্যক্তি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর বৈধভাবে সংরক্ষিত অর্থও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা সরাসরি কিংবা সুইস ব্যাংকের বিদেশি শাখার মাধ্যমে যে অর্থ জমা রাখেন, তাও এই হিসাবের অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, শুধুমাত্র সুইস ব্যাংকে জমা অর্থের পরিমাণ দেখে অর্থ পাচারের সুনির্দিষ্ট চিত্র পাওয়া যায় না। কারণ এই হিসাবের মধ্যে বৈধ ব্যবসায়িক লেনদেন, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, ব্যাংকিং কার্যক্রম এবং প্রবাসী আয় সংশ্লিষ্ট অর্থও অন্তর্ভুক্ত থাকে।

একসময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিত্তশালীদের কাছে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংক ছিল অর্থ গোপন রাখার অন্যতম নিরাপদ গন্তব্য। কঠোর ব্যাংকিং গোপনীয়তা নীতির কারণে বহু বছর ধরে দেশটির ব্যাংকগুলোকে অর্থ পাচারের সম্ভাব্য আশ্রয়স্থল হিসেবে দেখা হতো। তবে আন্তর্জাতিক চাপ এবং বিভিন্ন তথ্য বিনিময় চুক্তির ফলে গত এক দশকে পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক আর্থিক সহযোগিতা কাঠামোর আওতায় প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের সরকারের সঙ্গে ব্যাংকিং তথ্য বিনিময় করে থাকে সুইজারল্যান্ড। ফলে আগের মতো সম্পূর্ণ গোপনীয়ভাবে অর্থ সংরক্ষণের সুযোগ অনেকটাই সীমিত হয়ে এসেছে।

তবুও বৈশ্বিক পর্যায়ে অর্থ পাচার, কর ফাঁকি এবং অবৈধ সম্পদ স্থানান্তরের বিষয়ে সুইস ব্যাংকগুলোর নাম এখনও আলোচনায় আসে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও আর্থিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, বৈধ ও অবৈধ—উভয় ধরনের অর্থই বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের মাধ্যমে বিদেশি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় স্থানান্তরিত হয়, যার প্রকৃত উৎস নির্ধারণে পৃথক তদন্ত প্রয়োজন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশিদের সুইস ব্যাংকে জমা অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধির পেছনে বৈধ বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক ব্যবসা সম্প্রসারণ, প্রবাসীদের সঞ্চয় এবং বৈদেশিক আর্থিক কার্যক্রমের প্রভাব থাকতে পারে। তবে এ অর্থের প্রকৃত উৎস ও প্রকৃতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেতে আরও বিস্তারিত তথ্য বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

সাম্প্রতিক এই পরিসংখ্যান নতুন করে আলোচনায় এনেছে বিদেশে বাংলাদেশিদের আর্থিক সম্পদের পরিমাণ, বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রবণতা এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বাংলাদেশের উপস্থিতির বিষয়টি।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ইন্দোনেশিয়ায় ৫.১ মাত্রার ভূমিকম্প, আতঙ্কিত হয়ে একজনের মৃত্যু

এক বছরে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বেড়েছে ৪১ শতাংশ, জমা অর্থ ছাড়াল ১২ হাজার কোটি টাকা

আপডেট সময় : ১০:২১:০০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক

সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থ এক বছরের ব্যবধানে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের (এসএনবি) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁ, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪১ শতাংশ বেশি।

২০২৪ সালের শেষে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের আমানতের পরিমাণ ছিল ৫৯ কোটি সুইস ফ্রাঁ। এক বছরের ব্যবধানে সেই অঙ্ক বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁতে। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী প্রতি সুইস ফ্রাঁর মূল্য প্রায় ১৫২ টাকা ধরে হিসাব করলে, বাংলাদেশিদের জমাকৃত অর্থের পরিমাণ প্রায় ১২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) প্রকাশিত তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালের পর এবারই সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্থ জমা হয়েছে। একই সঙ্গে গত এক দশকের মধ্যে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আমানতের রেকর্ড।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের নামে থাকা অর্থের সবটাই ব্যক্তিগত আমানত নয়। এর মধ্যে ব্যক্তি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর বৈধভাবে সংরক্ষিত অর্থও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা সরাসরি কিংবা সুইস ব্যাংকের বিদেশি শাখার মাধ্যমে যে অর্থ জমা রাখেন, তাও এই হিসাবের অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, শুধুমাত্র সুইস ব্যাংকে জমা অর্থের পরিমাণ দেখে অর্থ পাচারের সুনির্দিষ্ট চিত্র পাওয়া যায় না। কারণ এই হিসাবের মধ্যে বৈধ ব্যবসায়িক লেনদেন, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, ব্যাংকিং কার্যক্রম এবং প্রবাসী আয় সংশ্লিষ্ট অর্থও অন্তর্ভুক্ত থাকে।

একসময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিত্তশালীদের কাছে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংক ছিল অর্থ গোপন রাখার অন্যতম নিরাপদ গন্তব্য। কঠোর ব্যাংকিং গোপনীয়তা নীতির কারণে বহু বছর ধরে দেশটির ব্যাংকগুলোকে অর্থ পাচারের সম্ভাব্য আশ্রয়স্থল হিসেবে দেখা হতো। তবে আন্তর্জাতিক চাপ এবং বিভিন্ন তথ্য বিনিময় চুক্তির ফলে গত এক দশকে পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক আর্থিক সহযোগিতা কাঠামোর আওতায় প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের সরকারের সঙ্গে ব্যাংকিং তথ্য বিনিময় করে থাকে সুইজারল্যান্ড। ফলে আগের মতো সম্পূর্ণ গোপনীয়ভাবে অর্থ সংরক্ষণের সুযোগ অনেকটাই সীমিত হয়ে এসেছে।

তবুও বৈশ্বিক পর্যায়ে অর্থ পাচার, কর ফাঁকি এবং অবৈধ সম্পদ স্থানান্তরের বিষয়ে সুইস ব্যাংকগুলোর নাম এখনও আলোচনায় আসে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও আর্থিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, বৈধ ও অবৈধ—উভয় ধরনের অর্থই বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের মাধ্যমে বিদেশি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় স্থানান্তরিত হয়, যার প্রকৃত উৎস নির্ধারণে পৃথক তদন্ত প্রয়োজন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশিদের সুইস ব্যাংকে জমা অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধির পেছনে বৈধ বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক ব্যবসা সম্প্রসারণ, প্রবাসীদের সঞ্চয় এবং বৈদেশিক আর্থিক কার্যক্রমের প্রভাব থাকতে পারে। তবে এ অর্থের প্রকৃত উৎস ও প্রকৃতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেতে আরও বিস্তারিত তথ্য বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

সাম্প্রতিক এই পরিসংখ্যান নতুন করে আলোচনায় এনেছে বিদেশে বাংলাদেশিদের আর্থিক সম্পদের পরিমাণ, বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রবণতা এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বাংলাদেশের উপস্থিতির বিষয়টি।