নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীনের বাজার। দীর্ঘদিন ধরে বিশাল বাণিজ্য ঘাটতির মুখে থাকা বাংলাদেশ এবার প্রথমবারের মতো চীনে ১ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি রপ্তানি আয়ের পথে এগোচ্ছে। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, আসন্ন প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর এই সম্ভাবনাকে আরও গতিশীল করবে এবং আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি ৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত ১১ মাসে বাংলাদেশ চীনে ৭৪ কোটি ২৫ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় যা প্রায় ১৬ শতাংশ বেশি। চলতি জুন মাসের রপ্তানি হিসাব যুক্ত হলে প্রথমবারের মতো বার্ষিক রপ্তানি আয় ১ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পুরো বছরে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল ৬৯ কোটি ৪৫ লাখ ডলার। আর সর্বোচ্চ রপ্তানির রেকর্ড ছিল ২০১৬-১৭ অর্থবছরে, যখন রপ্তানি আয় হয়েছিল প্রায় ৯৫ কোটি ডলার।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, চীনের শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা কার্যকর হওয়ার পর বাংলাদেশি পণ্যের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তবে এই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
আগামী ২৩ থেকে ২৬ জুন চীন সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি হবে তার দ্বিতীয় বিদেশ সফর। এর আগে তিনি মালয়েশিয়া সফর করবেন। ব্যবসায়ী মহলের প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রীর সফরে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচিত হবে।
বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিআই) সভাপতি মোহা. খোরশেদ আলম মনে করেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুন মাত্রা পাবে।
তিনি বলেন, চীনের বাজারে বাংলাদেশের শতভাগ শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। এই সুযোগ কাজে লাগানো গেলে আগামী দুই বছরের মধ্যে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি ৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব। তবে এজন্য পণ্যের বৈচিত্র্য, মান নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থা এবং রপ্তানি সহায়ক অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্পর্ক গত এক দশকে দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও তা মূলত আমদানিনির্ভর। বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ প্রতিবছর গড়ে ১৭ থেকে ১৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য চীন থেকে আমদানি করেছে। বিপরীতে রপ্তানি সীমাবদ্ধ থেকেছে ৭০ কোটির আশপাশে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে চীন থেকে বাংলাদেশের আমদানি হয়েছে প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। একই সময়ে রপ্তানি হয়েছে মাত্র ৬৭ কোটি ২৬ লাখ ডলারের পণ্য। ফলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৭ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের বাজারে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রপ্তানি ঝুড়ির সীমাবদ্ধতা। বর্তমানে তৈরি পোশাক, পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, জুতা এবং কিছু কৃষিপণ্যই মূলত রপ্তানি হচ্ছে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, চীন বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বড় বাজার হবে না, কারণ দেশটি নিজেই এ খাতে শক্তিশালী উৎপাদক। তাই চীনের প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী নতুন পণ্য রপ্তানির দিকে নজর দিতে হবে। অপ্রচলিত কিন্তু সম্ভাবনাময় পণ্য চিহ্নিত করে সেগুলোর উৎপাদন ও বিপণন সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
তিনি আরও বলেন, চীনের বিভিন্ন প্রদেশে বাংলাদেশি পণ্যের বিশেষ প্রদর্শনী ও ব্র্যান্ডিং কার্যক্রম বাড়াতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পারলে উৎপাদন ও রপ্তানি উভয়ই বাড়বে।
ব্যবসায়ী নেতারা মনে করেন, তৈরি পোশাকের পাশাপাশি চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত দ্রব্য, প্লাস্টিক পণ্য, সিরামিক, কাঁকড়া, কুঁচে, শুকনা খাদ্যপণ্য, তিল, আম, কাঁঠালসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের রপ্তানিতে বড় সম্ভাবনা রয়েছে।
সম্প্রতি চীনের কুনমিংয়ে অনুষ্ঠিত দশম চায়না-সাউথ এশিয়া এক্সপো এবং ত্রিংশত্তম চায়না কুনমিং আমদানি-রপ্তানি মেলায় বাংলাদেশ ‘থিম কান্ট্রি’ হিসেবে অংশ নেয়। ওই প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের ১০১টি প্রতিষ্ঠানের ১৭৫ জন প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। ব্যবসায়ীদের দাবি, মেলায় বাংলাদেশি পণ্যের প্রতি চীনা ক্রেতাদের আগ্রহ ছিল উল্লেখযোগ্য।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চীনের ১৪০ কোটির বেশি ভোক্তার বাজারে প্রবেশের সুযোগ এখন বাংলাদেশের সামনে উন্মুক্ত। সঠিক পরিকল্পনা, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, নতুন পণ্যের উন্নয়ন এবং কার্যকর বাণিজ্য কূটনীতির মাধ্যমে এই বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা সম্ভব। প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফর সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা।
রিপোর্টারের নাম 

























