বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শুধু দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে বলে মন্তব্য করেছেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান।
তিনি বলেছেন, একটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় নিরাপত্তা অক্ষুণ্ন রাখতে দক্ষ, আধুনিক ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ সেনাবাহিনীর বিকল্প নেই। আর সেই বাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব পালন করেন সেনা কর্মকর্তারা। তাই যোগ্য, দক্ষ এবং আধুনিক নেতৃত্ব গড়ে তুলতে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির (বিএমএ) ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) চট্টগ্রামের ভাটিয়ারিতে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি (বিএমএ) প্যারেড গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত ৯০তম বিএমএ দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের অফিসার ক্যাডেটদের কমিশন প্রদান উপলক্ষে আয়োজিত রাষ্ট্রপতি কুচকাওয়াজে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
দক্ষ নেতৃত্ব গঠনে বিএমএর অবদান
সেনাপ্রধান বলেন, ১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি দেশের জন্য নিবেদিতপ্রাণ, মেধাবী, চৌকস ও আধুনিক নেতৃত্বের উপযোগী সেনা কর্মকর্তা তৈরির লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই একাডেমি থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে আনুগত্য, শৃঙ্খলা, ন্যায়পরায়ণতা ও কর্তব্যবোধে উজ্জীবিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আজ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বহির্বিশ্বেও সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে।”
জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, “‘চির উন্নত মম শির’ মূলমন্ত্রে উদ্বুদ্ধ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে আরও সমৃদ্ধ করতে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। এই অবদানের জন্য আমরা গর্বিত এবং কৃতজ্ঞ।”
আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন উদ্যোগ
বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে সেনাপ্রধান বলেন, পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতি বিবেচনায় সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় ক্যাডেটদের প্রশিক্ষণের মান উন্নয়ন, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতকরণ এবং যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার বিকাশে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘২য় বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন’-এর কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ, চৌকস ও যোগ্য নেতৃত্ব তৈরিতে দ্বিতীয় বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।”
নবীন কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান
নবনিযুক্ত কর্মকর্তাদের উদ্দেশে সেনাপ্রধান বলেন, শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে তাদের ওপর দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পবিত্র দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে।
তিনি তাদের সততা, পেশাদারিত্ব, দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান।
কমিশন পেলেন ১৮৪ জন অফিসার
দীর্ঘ তিন বছরের কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে কুচকাওয়াজের মাধ্যমে ৯০তম বিএমএ দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের মোট ১৮৪ জন অফিসার ক্যাডেট বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন।
এর মধ্যে ১৬৬ জন পুরুষ এবং ১৮ জন নারী অফিসার রয়েছেন।
এ ছাড়া চারজন ফিলিস্তিনি, একজন তানজানিয়ান, একজন জাম্বিয়ান এবং একজন মালদ্বীপের অফিসার ক্যাডেটও বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি থেকে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন। তারা নিজ নিজ দেশের সশস্ত্র বাহিনীতে যোগদান করবেন।
‘সোর্ড অব অনার’ পেলেন খায়রুল ইসলাম
৯০তম বিএমএ দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের ব্যাটালিয়ন সিনিয়র আন্ডার অফিসার খায়রুল ইসলাম সেরা চৌকস ক্যাডেট হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ ‘সোর্ড অব অনার’ অর্জন করেন।
এ ছাড়া সামরিক বিষয়ে শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ‘সেনাবাহিনী প্রধান স্বর্ণপদক’ লাভ করেন।
অন্যদিকে, বিএমএ থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সর্বশ্রেষ্ঠ বিদেশি ক্যাডেট হিসেবে তানজানিয়ার সার্জেন্ট আবু বকর ‘বিএমএ ট্রফি অব এক্সিলেন্স’ অর্জন করেন।
শপথ ও র্যাঙ্ক ব্যাজ পরানোর আবেগঘন আয়োজন
কুচকাওয়াজ শেষে নবীন অফিসাররা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার শপথ গ্রহণ করেন।
এরপর তাদের মা-বাবা ও অভিভাবকরা নবীন কর্মকর্তাদের কাঁধে র্যাঙ্ক ব্যাজ পরিয়ে দেন। আবেগঘন এই মুহূর্তে উপস্থিত অতিথি ও স্বজনদের মধ্যে আনন্দের আবহ তৈরি হয়।
উদ্বোধন করা হলো নতুন অবকাঠামো
অনুষ্ঠান শেষে সেনাপ্রধান বিএমএতে নবগঠিত ‘২য় বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন’-এর উদ্বোধন করেন।
এ ছাড়া তিনি নবনির্মিত সিএমএইচ ভাটিয়ারি, বিএমএ পার্ক, বিএমএ সুইমিং পুল এবং এমইএস অফিস কমপ্লেক্স প্রকল্পেরও উদ্বোধন করেন।
সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, এসব অবকাঠামো প্রশিক্ষণ, চিকিৎসা, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং ক্যাডেটদের সামগ্রিক সক্ষমতা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
উপস্থিত ছিলেন উচ্চপদস্থ সামরিক ও অসামরিক কর্মকর্তারা
অনুষ্ঠানে তিন বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, দেশি-বিদেশি সামরিক প্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া সদ্য কমিশনপ্রাপ্ত অফিসারদের অভিভাবক এবং গণমাধ্যম প্রতিনিধিরাও কুচকাওয়াজ উপভোগ করেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে সেনাপ্রধানকে অভ্যর্থনা জানান আর্মি ট্রেনিং অ্যান্ড ডকট্রিন কমান্ডের ভারপ্রাপ্ত জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি) ও কমান্ড্যান্ট, বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি এবং ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ও এরিয়া কমান্ডার, চট্টগ্রাম এরিয়া।
রিপোর্টারের নাম 

























