বাংলাদেশকে দীর্ঘদিন ধরে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও নদীভাঙনের দেশ হিসেবে দেখা হলেও এখন নতুন এক পরিবেশগত সংকট সামনে আসছে—খরা ও মরুকরণ। জলবায়ু পরিবর্তন, ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার, নদীর প্রবাহ কমে যাওয়া এবং অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবস্থাপনার কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পানিসংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
একসময় খরাকে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা ভারতের সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের বাস্তবতাও বদলেছে। বরেন্দ্র অঞ্চল ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, কম বৃষ্টিপাত এবং পানির ঘাটতি উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে।
জাতিসংঘের তথ্যমতে, খরা, ভূমি অবক্ষয় ও মরুকরণের কারণে প্রতিবছর বিশ্বের বিপুল পরিমাণ উর্বর জমি উৎপাদনক্ষমতা হারাচ্ছে। বাংলাদেশও এই ঝুঁকির বাইরে নয়।
বরেন্দ্রে বাড়ছে পানিসংকট
গত বছরের আগস্টে জাতীয় পানিসম্পদ পরিষদ রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁসহ পাঁচ জেলার ২৫টি উপজেলার ২১৫টি ইউনিয়নকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পানিসংকট এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করে। এর মধ্যে ৪৭টি ইউনিয়নের এক হাজার ৫০৩টি মৌজাকে চিহ্নিত করা হয়েছে ‘অতি উচ্চ পানি সংকটাপন্ন এলাকা’ হিসেবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০০০ সালের পর থেকে বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনক হারে নিচে নেমে গেছে। একই সঙ্গে শুষ্ক মৌসুমে উজান থেকে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় কৃষি ও জনজীবনে এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন হুমকি
আইপিসিসির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে গড় তাপমাত্রা ১ দশমিক ৩ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং দীর্ঘ খরার কারণে ভবিষ্যতে দেশের আরও বিস্তীর্ণ এলাকা পানিসংকটের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিতর্কের কেন্দ্রে ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণি
পরিবেশবিদদের মতে, দেশের পানিসংকট ও ভূমি অবক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ানোর পেছনে কিছু বিদেশি বৃক্ষ প্রজাতিরও ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণি (একাশিয়া) গাছ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক চলছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইউক্যালিপটাসের ‘ক্যামালডালেন্সিস’ প্রজাতি প্রতি ঘন সেন্টিমিটার কাঠ উৎপাদনে প্রায় ৩ হাজার ১৪৫ মিলিলিটার পানি শোষণ করে। অন্যদিকে আকাশমণি শোষণ করে প্রায় ২ হাজার ২২৩ মিলিলিটার পানি। তুলনায় দেশীয় মেহগনি গাছের প্রয়োজন হয় প্রায় অর্ধেক।
দ্রুত বৃদ্ধির কারণে এসব গাছ মাটির গভীর স্তর থেকে বিপুল পরিমাণ পানি টেনে নেয়। পাশাপাশি এদের বিস্তৃত শিকড় ও বীজ বিস্তারের কারণে আশপাশে দেশীয় গাছপালা জন্মানোর সুযোগও কমে যায়।
সরকারি নিষেধাজ্ঞা
পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনায় গত বছর সরকার ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণির চারা উৎপাদন, বিক্রি ও রোপণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তিগত পর্যায়ের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতেও এসব গাছ নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এককভাবে ইউক্যালিপটাসের বন তৈরির পরিবর্তে দেশীয় বৃক্ষের সঙ্গে মিশ্র বনায়ন করলে ক্ষতি কিছুটা কমানো সম্ভব। গবেষণায় দেখা গেছে, মিশ্র বাগানে মাটির পুষ্টিগুণ ও জীববৈচিত্র্য তুলনামূলকভাবে ভালো থাকে।
সামনে কী করণীয়?
পরিবেশবিদদের মতে, খরা ও মরুকরণের ঝুঁকি মোকাবিলায় শুধু গাছ কাটা বা নিষিদ্ধ করাই যথেষ্ট নয়। জলাভূমি সংরক্ষণ, নদীর প্রবাহ পুনরুদ্ধার, ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, দেশীয় প্রজাতির বৃক্ষরোপণ এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষি ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
কারণ বাংলাদেশের জন্য খরা আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়—এটি এখন বাস্তবতা। আর সময়মতো কার্যকর উদ্যোগ না নিলে দেশের আরও বিস্তীর্ণ অঞ্চল পানিসংকট ও ভূমি অবক্ষয়ের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
রিপোর্টারের নাম 
























