ঢাকা ০৩:০৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

ব্যক্তিগত সোনাও এখন করের আওতায়

ব্যক্তিগত মালিকানাধীন সোনা ও স্বর্ণালংকার বিক্রি করে মুনাফা করলে এখন থেকে সেই আয়ের ওপর কর দিতে হবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ব্যক্তিগত সোনাকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, বরং একটি মূলধনি সম্পদ (ক্যাপিটাল অ্যাসেট) হিসেবে বিবেচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে স্বর্ণ বিক্রির মাধ্যমে অর্জিত মুনাফার ওপর ১৫ শতাংশ হারে মূলধনি মুনাফা কর বা ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স আরোপ করা হবে।

রোববার রাজধানীর পল্টনে অর্থনৈতিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত অর্থ বিল-সংক্রান্ত এক সেমিনারে এনবিআরের কর্মকর্তারা এ তথ্য জানান। নতুন কর ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে সেমিনারে বিভিন্ন প্রশ্ন ও আলোচনা হয়।

আলোচনায় কর পরামর্শক স্নেহাশীষ বড়ুয়া ব্যক্তিগত ব্যবহারের স্বর্ণালংকারকে মূলধনি সম্পদ হিসেবে গণ্য করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। জবাবে এনবিআরের আয়কর নীতি বিভাগের প্রথম সচিব জাফর ইমাম বলেন, আন্তর্জাতিক কর ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে ইউরোপের অনেক দেশে সোনা ও স্বর্ণালংকারকে বিনিয়োগযোগ্য সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং সেগুলোর বিক্রয়লব্ধ মুনাফার ওপর কর আরোপের বিধান রয়েছে। বাংলাদেশেও একই ধরনের নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, অনেক করদাতা তাদের আয়কর রিটার্নে স্বর্ণ বা স্বর্ণালংকারের তথ্য উল্লেখ করলেও এর প্রকৃত মূল্য উল্লেখ করেন না। ফলে সম্পদের প্রকৃত হিসাব গোপন করার সুযোগ তৈরি হয় এবং কর ফাঁকির ঝুঁকি বাড়ে। নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে সেই সুযোগ সীমিত করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে রাজস্ব বিভাগ।

সেমিনারে এনবিআরের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান চলতি অর্থবছরের বাজেটের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এবারের বাজেটে কালোটাকা বৈধ করার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। বিভিন্ন খাত, বিশেষ করে আবাসন খাত থেকে এ ধরনের সুবিধা রাখার জন্য চাপ থাকলেও সরকার শুরু থেকেই কালোটাকা সাদা করার সুযোগ না দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে।

রাজস্ব আহরণ প্রসঙ্গে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, অর্থনীতিতে গতি ফিরিয়ে আনতে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর-সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে এবং স্বাভাবিকভাবেই সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাবে।

তিনি জানান, শুধু করের হার বাড়িয়ে নয়, বরং কর ফাঁকি রোধ, প্রযুক্তিনির্ভর তথ্য বিশ্লেষণ এবং ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষা কার্যক্রম জোরদারের মাধ্যমেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব সংগ্রহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

সঞ্চয়পত্রে কর আরোপের বিষয়ে তিনি বলেন, নতুন বাজেটে সঞ্চয়পত্রের ওপর অতিরিক্ত কোনো কর চাপানো হয়নি। বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সমন্বয়ের মাধ্যমে উৎসে কাটা অগ্রিম কর ফেরত পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে, যা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।

সভায় ভ্যাট নীতি বিভাগের কর্মকর্তারাও ব্যবসা সহজীকরণে সরকারের নতুন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। তারা জানান, ভ্যাট নিবন্ধন প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও সহজ করতে অনলাইনে তাৎক্ষণিক নিবন্ধনের ব্যবস্থা চালু করা হবে। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের প্রশাসনিক চাপ কমাতে মাসিক ভ্যাট রিটার্নের পরিবর্তে প্রতি তিন মাস অন্তর রিটার্ন দাখিলের সুযোগ চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

এনবিআরের কর্মকর্তাদের মতে, এসব উদ্যোগ কর ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তুলবে এবং একই সঙ্গে করদাতাদের জন্য প্রক্রিয়াকে সহজ করবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

বাঁশখালীর বন্যায় বিপর্যস্ত এতিম কায়সারের তিনদিন পর জুটলো একবেলা খাবার

ব্যক্তিগত সোনাও এখন করের আওতায়

আপডেট সময় : ১০:৪০:১৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

ব্যক্তিগত মালিকানাধীন সোনা ও স্বর্ণালংকার বিক্রি করে মুনাফা করলে এখন থেকে সেই আয়ের ওপর কর দিতে হবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ব্যক্তিগত সোনাকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, বরং একটি মূলধনি সম্পদ (ক্যাপিটাল অ্যাসেট) হিসেবে বিবেচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে স্বর্ণ বিক্রির মাধ্যমে অর্জিত মুনাফার ওপর ১৫ শতাংশ হারে মূলধনি মুনাফা কর বা ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স আরোপ করা হবে।

রোববার রাজধানীর পল্টনে অর্থনৈতিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত অর্থ বিল-সংক্রান্ত এক সেমিনারে এনবিআরের কর্মকর্তারা এ তথ্য জানান। নতুন কর ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে সেমিনারে বিভিন্ন প্রশ্ন ও আলোচনা হয়।

আলোচনায় কর পরামর্শক স্নেহাশীষ বড়ুয়া ব্যক্তিগত ব্যবহারের স্বর্ণালংকারকে মূলধনি সম্পদ হিসেবে গণ্য করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। জবাবে এনবিআরের আয়কর নীতি বিভাগের প্রথম সচিব জাফর ইমাম বলেন, আন্তর্জাতিক কর ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে ইউরোপের অনেক দেশে সোনা ও স্বর্ণালংকারকে বিনিয়োগযোগ্য সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং সেগুলোর বিক্রয়লব্ধ মুনাফার ওপর কর আরোপের বিধান রয়েছে। বাংলাদেশেও একই ধরনের নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, অনেক করদাতা তাদের আয়কর রিটার্নে স্বর্ণ বা স্বর্ণালংকারের তথ্য উল্লেখ করলেও এর প্রকৃত মূল্য উল্লেখ করেন না। ফলে সম্পদের প্রকৃত হিসাব গোপন করার সুযোগ তৈরি হয় এবং কর ফাঁকির ঝুঁকি বাড়ে। নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে সেই সুযোগ সীমিত করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে রাজস্ব বিভাগ।

সেমিনারে এনবিআরের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান চলতি অর্থবছরের বাজেটের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এবারের বাজেটে কালোটাকা বৈধ করার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। বিভিন্ন খাত, বিশেষ করে আবাসন খাত থেকে এ ধরনের সুবিধা রাখার জন্য চাপ থাকলেও সরকার শুরু থেকেই কালোটাকা সাদা করার সুযোগ না দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে।

রাজস্ব আহরণ প্রসঙ্গে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, অর্থনীতিতে গতি ফিরিয়ে আনতে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর-সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে এবং স্বাভাবিকভাবেই সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাবে।

তিনি জানান, শুধু করের হার বাড়িয়ে নয়, বরং কর ফাঁকি রোধ, প্রযুক্তিনির্ভর তথ্য বিশ্লেষণ এবং ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষা কার্যক্রম জোরদারের মাধ্যমেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব সংগ্রহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

সঞ্চয়পত্রে কর আরোপের বিষয়ে তিনি বলেন, নতুন বাজেটে সঞ্চয়পত্রের ওপর অতিরিক্ত কোনো কর চাপানো হয়নি। বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সমন্বয়ের মাধ্যমে উৎসে কাটা অগ্রিম কর ফেরত পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে, যা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।

সভায় ভ্যাট নীতি বিভাগের কর্মকর্তারাও ব্যবসা সহজীকরণে সরকারের নতুন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। তারা জানান, ভ্যাট নিবন্ধন প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও সহজ করতে অনলাইনে তাৎক্ষণিক নিবন্ধনের ব্যবস্থা চালু করা হবে। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের প্রশাসনিক চাপ কমাতে মাসিক ভ্যাট রিটার্নের পরিবর্তে প্রতি তিন মাস অন্তর রিটার্ন দাখিলের সুযোগ চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

এনবিআরের কর্মকর্তাদের মতে, এসব উদ্যোগ কর ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তুলবে এবং একই সঙ্গে করদাতাদের জন্য প্রক্রিয়াকে সহজ করবে।