ঢাকা ০৬:৩৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে বিনিয়োগ আকর্ষণে রোড শোর উদ্যোগ, ৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিল

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি আনতে এবং বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় সচল করতে একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে শিগগিরই রোড শোর আয়োজন করা হবে। একই সঙ্গে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বৈশ্বিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে দেশের অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখনও পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এ অবস্থায় বন্ধ ও অলাভজনক কারখানাগুলো পুনরায় চালুর মাধ্যমে অর্থনীতিকে চাঙা করতে চায় সরকার।

বিনিয়োগ টানতে রোড শো

গত ৪ জুন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বন্ধ কারখানা চালু এবং অলাভজনক শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে লাভজনক করার বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে রোড শোর আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংশ্লিষ্টদের দ্রুত কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে বন্ধ কারখানাগুলোর সম্ভাবনা মূল্যায়নে বিশেষজ্ঞ মতামত নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিল

অর্থনীতিতে গতি ফিরিয়ে আনতে সম্প্রতি ৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল চালু করা হয়েছে।

এই তহবিলের আওতায় বন্ধ অথবা আংশিকভাবে চালু থাকা শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা পাবে।

একক প্রতিষ্ঠান পাবে সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, একটি প্রতিষ্ঠান বা শিল্পগোষ্ঠী সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবে। ঋণের সুদের হার হবে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ, যা বর্তমান বাজারদরের তুলনায় অনেক কম।

তহবিল থেকে ব্যাংকগুলো ৪ শতাংশ সুদে অর্থ নিয়ে উদ্যোক্তাদের ঋণ বিতরণ করবে। দেশের সব তফসিলি ব্যাংক এই কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারবে।

কারা সুবিধা পাবে

যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান মূলধনের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে বা আংশিক সক্ষমতায় চলছে, তারা এই সুবিধার আওতায় আসবে। এছাড়া বন্ধ কারখানা অধিগ্রহণ বা ইজারা নিয়ে পুনরায় চালু করতে আগ্রহী দক্ষ উদ্যোক্তারাও এ তহবিল থেকে ঋণ নিতে পারবেন।

তবে ঋণখেলাপি, অর্থপাচারের সঙ্গে জড়িত কিংবা ঋণের অর্থ অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে—এমন প্রতিষ্ঠান এ সুবিধা পাবে না।

ঋণের ব্যবহার ও শর্ত

ঋণের অর্থ শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, বিদ্যুৎ-গ্যাস বিল এবং উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ক্রয়ে ব্যবহার করা যাবে। পুরোনো ঋণ পরিশোধে এই অর্থ ব্যবহার করা যাবে না।

ঋণের মেয়াদ সর্বোচ্চ এক বছর এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নবায়নের সুযোগ থাকবে। প্রথম ছয় মাস গ্রেস পিরিয়ড হিসেবে গণ্য হবে।

কঠোর তদারকি

ঋণের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোকে নিয়মিত কারখানা পরিদর্শন করতে হবে। প্রতি তিন মাস অন্তর পরিদর্শন প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকও সরেজমিনে তদারকি করতে পারবে।

অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাবের আশা

অর্থনীতিবিদ ও উদ্যোক্তারা মনে করছেন, স্বচ্ছভাবে তহবিল পরিচালনা করা গেলে বহু বন্ধ ও আংশিক বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান আবার উৎপাদনে ফিরতে পারবে। এতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, রপ্তানি আয় সম্প্রসারণ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

তাদের মতে, প্রকৃত উদ্যোক্তাদের কাছে ঋণ পৌঁছানো এবং সঠিক তদারকি নিশ্চিত করা গেলে দেশের শিল্পখাতে নতুন প্রাণ ফিরে আসবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

বান্দরবানের লামায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ১, আহত ২

অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে বিনিয়োগ আকর্ষণে রোড শোর উদ্যোগ, ৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিল

আপডেট সময় : ০২:০৬:০০ অপরাহ্ন, শনিবার, ৬ জুন ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি আনতে এবং বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় সচল করতে একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে শিগগিরই রোড শোর আয়োজন করা হবে। একই সঙ্গে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বৈশ্বিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে দেশের অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখনও পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এ অবস্থায় বন্ধ ও অলাভজনক কারখানাগুলো পুনরায় চালুর মাধ্যমে অর্থনীতিকে চাঙা করতে চায় সরকার।

বিনিয়োগ টানতে রোড শো

গত ৪ জুন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বন্ধ কারখানা চালু এবং অলাভজনক শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে লাভজনক করার বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে রোড শোর আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংশ্লিষ্টদের দ্রুত কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে বন্ধ কারখানাগুলোর সম্ভাবনা মূল্যায়নে বিশেষজ্ঞ মতামত নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিল

অর্থনীতিতে গতি ফিরিয়ে আনতে সম্প্রতি ৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল চালু করা হয়েছে।

এই তহবিলের আওতায় বন্ধ অথবা আংশিকভাবে চালু থাকা শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা পাবে।

একক প্রতিষ্ঠান পাবে সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, একটি প্রতিষ্ঠান বা শিল্পগোষ্ঠী সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবে। ঋণের সুদের হার হবে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ, যা বর্তমান বাজারদরের তুলনায় অনেক কম।

তহবিল থেকে ব্যাংকগুলো ৪ শতাংশ সুদে অর্থ নিয়ে উদ্যোক্তাদের ঋণ বিতরণ করবে। দেশের সব তফসিলি ব্যাংক এই কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারবে।

কারা সুবিধা পাবে

যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান মূলধনের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে বা আংশিক সক্ষমতায় চলছে, তারা এই সুবিধার আওতায় আসবে। এছাড়া বন্ধ কারখানা অধিগ্রহণ বা ইজারা নিয়ে পুনরায় চালু করতে আগ্রহী দক্ষ উদ্যোক্তারাও এ তহবিল থেকে ঋণ নিতে পারবেন।

তবে ঋণখেলাপি, অর্থপাচারের সঙ্গে জড়িত কিংবা ঋণের অর্থ অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে—এমন প্রতিষ্ঠান এ সুবিধা পাবে না।

ঋণের ব্যবহার ও শর্ত

ঋণের অর্থ শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, বিদ্যুৎ-গ্যাস বিল এবং উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ক্রয়ে ব্যবহার করা যাবে। পুরোনো ঋণ পরিশোধে এই অর্থ ব্যবহার করা যাবে না।

ঋণের মেয়াদ সর্বোচ্চ এক বছর এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নবায়নের সুযোগ থাকবে। প্রথম ছয় মাস গ্রেস পিরিয়ড হিসেবে গণ্য হবে।

কঠোর তদারকি

ঋণের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোকে নিয়মিত কারখানা পরিদর্শন করতে হবে। প্রতি তিন মাস অন্তর পরিদর্শন প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকও সরেজমিনে তদারকি করতে পারবে।

অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাবের আশা

অর্থনীতিবিদ ও উদ্যোক্তারা মনে করছেন, স্বচ্ছভাবে তহবিল পরিচালনা করা গেলে বহু বন্ধ ও আংশিক বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান আবার উৎপাদনে ফিরতে পারবে। এতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, রপ্তানি আয় সম্প্রসারণ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

তাদের মতে, প্রকৃত উদ্যোক্তাদের কাছে ঋণ পৌঁছানো এবং সঠিক তদারকি নিশ্চিত করা গেলে দেশের শিল্পখাতে নতুন প্রাণ ফিরে আসবে।