ঢাকা ০৬:৩৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

তরুণদের জন্য বাজেটে বড় চমক, আসছে সৃজনশীল অর্থনীতি প্যাকেজ

নিজস্ব প্রতিবেদক

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে দেশের তরুণদের জন্য বড় ধরনের সুযোগ-সুবিধা ও কর্মসংস্থানমুখী উদ্যোগ আসতে যাচ্ছে। বিশেষ করে সৃজনশীল অর্থনীতি, ডিজিটাল উদ্যোক্তা, মুক্তপেশাজীবী এবং প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানকে কেন্দ্র করে একাধিক নতুন কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত হতে পারে বলে জানা গেছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধি, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং বৈদেশিক আয় বাড়ানোর লক্ষ্যে বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য আর্থিক সহায়তা, স্বল্পমেয়াদি দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন শহরে ‘সৃজনশীল কেন্দ্র’ স্থাপনের পরিকল্পনা।

৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট

আগামী অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হচ্ছে, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ বেশি।

বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। তবে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক ঋণ, ব্যাংক ঋণ এবং অন্যান্য উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “এটি একটি উচ্চাভিলাষী বাজেট। মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করাই আমাদের লক্ষ্য।”

গুরুত্ব পাচ্ছে সৃজনশীল অর্থনীতি

বিশ্বজুড়ে দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে সৃজনশীল অর্থনীতি। সফটওয়্যার, ডিজিটাল বিষয়বস্তু নির্মাণ, খেলাভিত্তিক প্রযুক্তি, চলমান চিত্র নির্মাণ, নকশা, মুক্তপেশা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কাজ এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির বড় অংশ।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, “বাংলাদেশের ৬৫ শতাংশ মানুষের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। এই জনশক্তিকে কাজে লাগাতে হলে প্রচলিত চাকরির বাইরে নতুন অর্থনৈতিক ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। সৃজনশীল অর্থনীতি সেই সম্ভাবনাই তৈরি করছে।”

তরুণদের জন্য বাজেটে পাঁচ বড় প্রস্তাব

১. কর ছাড় সম্প্রসারণ

তথ্যপ্রযুক্তি খাতের কর অব্যাহতি ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। এর আওতায় ডিজিটাল বিষয়বস্তু নির্মাণ, খেলাভিত্তিক সফটওয়্যার, চলমান চিত্র নির্মাণ, সংগীত প্রযোজনা এবং মুক্তপেশাকেও অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে।

২. নতুন উদ্যোক্তা তহবিল

বাংলাদেশ ব্যাংকের ৫০ কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচিতে সৃজনশীল উদ্যোক্তাদের অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি তহবিলের পরিমাণ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

৩. সৃজনশীল কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা

ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও সিলেটে আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন সৃজনশীল কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রস্তাব রয়েছে। এখানে তরুণরা স্বল্প খরচে কাজের জায়গা, দ্রুতগতির ইন্টারনেট এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা পাবেন।

৪. দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ

গ্রাফিক নকশা, ভিডিও সম্পাদনা, ডিজিটাল বিপণন, ত্রিমাত্রিক চলমান চিত্র নির্মাণ এবং সংগীত প্রযোজনার ওপর ৩ থেকে ৬ মাস মেয়াদি প্রশিক্ষণ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

৫. রপ্তানি প্রণোদনা

সফটওয়্যার, ডিজিটাল বিষয়বস্তু, খেলাভিত্তিক প্রযুক্তি ও চলমান চিত্র রপ্তানিতে ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত নগদ সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে।

সামাজিক সুরক্ষাতেও বাড়তি বরাদ্দ

বাজেটে পরিবার কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচির জন্য ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা বেশি।

অর্থমন্ত্রী বলেন, “কল্যাণভিত্তিক অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করতে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণ করা হবে।”

নতুন সম্ভাবনার দুয়ার

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হতে পারে সৃজনশীল অর্থনীতি। প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ, উন্নত প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এবং উদ্যোক্তাবান্ধব নীতিমালা।

তাদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে আগামী এক দশকের মধ্যে দেশের রপ্তানি আয়ের তালিকায় তৈরি পোশাকশিল্পের পাশাপাশি মুক্তপেশা, খেলাভিত্তিক প্রযুক্তি, সফটওয়্যার ও নকশাসেবাও গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করতে পারে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

বান্দরবানের লামায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ১, আহত ২

তরুণদের জন্য বাজেটে বড় চমক, আসছে সৃজনশীল অর্থনীতি প্যাকেজ

আপডেট সময় : ১১:৪২:০০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৬ জুন ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে দেশের তরুণদের জন্য বড় ধরনের সুযোগ-সুবিধা ও কর্মসংস্থানমুখী উদ্যোগ আসতে যাচ্ছে। বিশেষ করে সৃজনশীল অর্থনীতি, ডিজিটাল উদ্যোক্তা, মুক্তপেশাজীবী এবং প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানকে কেন্দ্র করে একাধিক নতুন কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত হতে পারে বলে জানা গেছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধি, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং বৈদেশিক আয় বাড়ানোর লক্ষ্যে বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য আর্থিক সহায়তা, স্বল্পমেয়াদি দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন শহরে ‘সৃজনশীল কেন্দ্র’ স্থাপনের পরিকল্পনা।

৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট

আগামী অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হচ্ছে, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ বেশি।

বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। তবে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক ঋণ, ব্যাংক ঋণ এবং অন্যান্য উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “এটি একটি উচ্চাভিলাষী বাজেট। মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করাই আমাদের লক্ষ্য।”

গুরুত্ব পাচ্ছে সৃজনশীল অর্থনীতি

বিশ্বজুড়ে দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে সৃজনশীল অর্থনীতি। সফটওয়্যার, ডিজিটাল বিষয়বস্তু নির্মাণ, খেলাভিত্তিক প্রযুক্তি, চলমান চিত্র নির্মাণ, নকশা, মুক্তপেশা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কাজ এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির বড় অংশ।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, “বাংলাদেশের ৬৫ শতাংশ মানুষের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। এই জনশক্তিকে কাজে লাগাতে হলে প্রচলিত চাকরির বাইরে নতুন অর্থনৈতিক ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। সৃজনশীল অর্থনীতি সেই সম্ভাবনাই তৈরি করছে।”

তরুণদের জন্য বাজেটে পাঁচ বড় প্রস্তাব

১. কর ছাড় সম্প্রসারণ

তথ্যপ্রযুক্তি খাতের কর অব্যাহতি ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। এর আওতায় ডিজিটাল বিষয়বস্তু নির্মাণ, খেলাভিত্তিক সফটওয়্যার, চলমান চিত্র নির্মাণ, সংগীত প্রযোজনা এবং মুক্তপেশাকেও অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে।

২. নতুন উদ্যোক্তা তহবিল

বাংলাদেশ ব্যাংকের ৫০ কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচিতে সৃজনশীল উদ্যোক্তাদের অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি তহবিলের পরিমাণ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

৩. সৃজনশীল কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা

ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও সিলেটে আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন সৃজনশীল কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রস্তাব রয়েছে। এখানে তরুণরা স্বল্প খরচে কাজের জায়গা, দ্রুতগতির ইন্টারনেট এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা পাবেন।

৪. দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ

গ্রাফিক নকশা, ভিডিও সম্পাদনা, ডিজিটাল বিপণন, ত্রিমাত্রিক চলমান চিত্র নির্মাণ এবং সংগীত প্রযোজনার ওপর ৩ থেকে ৬ মাস মেয়াদি প্রশিক্ষণ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

৫. রপ্তানি প্রণোদনা

সফটওয়্যার, ডিজিটাল বিষয়বস্তু, খেলাভিত্তিক প্রযুক্তি ও চলমান চিত্র রপ্তানিতে ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত নগদ সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে।

সামাজিক সুরক্ষাতেও বাড়তি বরাদ্দ

বাজেটে পরিবার কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচির জন্য ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা বেশি।

অর্থমন্ত্রী বলেন, “কল্যাণভিত্তিক অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করতে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণ করা হবে।”

নতুন সম্ভাবনার দুয়ার

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হতে পারে সৃজনশীল অর্থনীতি। প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ, উন্নত প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এবং উদ্যোক্তাবান্ধব নীতিমালা।

তাদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে আগামী এক দশকের মধ্যে দেশের রপ্তানি আয়ের তালিকায় তৈরি পোশাকশিল্পের পাশাপাশি মুক্তপেশা, খেলাভিত্তিক প্রযুক্তি, সফটওয়্যার ও নকশাসেবাও গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করতে পারে।