আগামী ডিসেম্বরে শেষ হতে যাওয়া গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ নবায়ন এবং অমীমাংসিত তিস্তা চুক্তি নিয়ে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে ভারত ও বাংলাদেশ। পশ্চিমবঙ্গে সদ্য নির্বাচিত বিজেপি সরকার এবং কেন্দ্র সরকারের যৌথ সিদ্ধান্ত এখন এই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির হতাশাজনক পরিস্থিতির মাঝেই এবার সামনে এসেছে গঙ্গা নদীর পানিবণ্টন চুক্তির ভবিষ্যৎ। আগামী ডিসেম্বরেই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রিশ বছর মেয়াদী গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। বর্তমান রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারত এই চুক্তি আদৌ নবায়ন করবে কি না তা নিয়ে স্বভাবতই গভীর কৌতূহল ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সদ্য নির্বাচিত বিজেপি সরকার এই স্পর্শকাতর চুক্তির বিষয়ে কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে মূলত তার ওপরই গঙ্গা চুক্তির চূড়ান্ত ভাগ্য নির্ভর করছে। উল্লেখ্য যে তিস্তা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে ২০১১ সাল থেকে দুই দেশের মধ্যে একাধিকবার চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হলেও পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তীব্র আপত্তির কারণে তা বারবার আটকে যায়।
রোববার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিতে প্রকাশিত এক বিশেষ বিশ্লেষণে দেশটির প্রখ্যাত কলামিস্ট মহুয়া চ্যাটার্জি মত প্রকাশ করেছেন যে গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির নবায়ন প্রক্রিয়াটি পশ্চিমবঙ্গের নতুন বিজেপি সরকারের জন্য প্রথম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হবে। কারণ ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে সীমান্তের উভয় পাড়েই এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়। ওই বিশ্লেষণে বলা হয়েছে বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার এবং দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এই চুক্তির আলোচনার মধ্য দিয়ে এক বিশাল পরীক্ষার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আর মাত্র কয়েক মাস বাকি থাকলেও ভারত ত্রিশ বছরের দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির বদলে একটি স্বল্পমেয়াদী অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির কথা বিবেচনা করছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ তাদের বর্তমান পরিবেশগত ও পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে নিজেদের জন্য আরও বেশি সুবিধাজনক শর্ত আদায় করে চুক্তিটি নবায়নের জোর প্রস্তুতি গ্রহণ করছে।
অমীমাংসিত তিস্তা চুক্তির প্রসঙ্গ টেনে মহুয়া চ্যাটার্জির ওই লেখায় উল্লেখ করা হয় যে ভারতের মনমোহন সিং সরকারের আমলে তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরের একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালেও পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার তার ঘোর বিরোধিতা করেছিল। সে সময় রাজ্য সরকারের মূল যুক্তি ছিল উত্তরবঙ্গে পর্যাপ্ত পানি নেই এবং তিস্তার পানি বাংলাদেশের সঙ্গে ভাগ করে নিলে উত্তরবঙ্গ পুরোপুরি শুকিয়ে যাবে। কৌতূহলের বিষয় হলো সে সময় রাজ্য বিজেপিও ঠিক একই কারণ দেখিয়ে তিস্তা চুক্তির ওই প্রস্তাবের জোরালো বিরোধিতা করেছিল কারণ রাজ্যের উত্তরবঙ্গ অনেক আগে থেকেই বিজেপির একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ফলশ্রুতিতে তৎকালীন কেন্দ্রীয় এনডিএ সরকারের জন্য তিস্তা চুক্তি নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তা এক বিশাল বাধা তৈরি করেছিল।
এখন দেখার বিষয় হলো পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বাংলাদেশের সঙ্গে গঙ্গার পানি ভাগাভাগির বিষয়ে শেষ পর্যন্ত রাজি হন কি না কারণ এই সিদ্ধান্তটি সরাসরি দক্ষিণবঙ্গের মানুষের জীবনযাত্রার ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। মহুয়া চ্যাটার্জি লিখেছেন পানি বণ্টন চুক্তিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের আগের বিরোধিতা মূলত কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য একটি ঢাল হিসেবে কাজ করেছিল। কিন্তু বর্তমানে রাজ্যে বিজেপি সরকার ক্ষমতাসীন থাকায় এনডিএ জোটকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে তারা গঙ্গা পানি চুক্তির নবায়ন এবং তিস্তা চুক্তির প্রসঙ্গ পুনরায় সামনে আনবে কি না যার জন্য ঢাকা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পরপরই বাংলাদেশের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপি তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তিতে অব্যাহত বাধা দেওয়ার জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের তীব্র সমালোচনা করে। একই সঙ্গে তারা পশ্চিমবঙ্গে ঐতিহাসিক জয়ের জন্য বিজেপিকে অভিনন্দন জানায় এবং এই ফলাফল ভবিষ্যতে রাজ্য ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক শক্তিশালী করতে ব্যাপক সহায়ক হবে বলে দৃঢ় আশা প্রকাশ করে। সম্প্রতি ভারতীয় গণমাধ্যমের সঙ্গে এক আলাপকালে বিএনপির তথ্য সম্পাদক আজিজুল বারী হেলাল পশ্চিমবঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে বিজেপির এই বিশাল সাফল্যের প্রশংসা করে বলেন যে এই সম্পর্ক ইতিবাচকভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তির অগ্রগতি ও পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়কে একসূত্রে গেঁথে তিনি মন্তব্য করেন যে আগের সরকার তিস্তা ব্যারেজ চুক্তির পথে মূল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল কিন্তু এখন পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকার বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত এই চুক্তির বিষয়ে মোদী সরকারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করতে সক্ষম হবে।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয় যে সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করার মতো কিছু কারণে বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কে কিছুটা টানাপোড়েন চলছে কারণ বিজেপি বরাবরই বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশ এবং অবৈধ অভিবাসনকে তাদের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী এজেন্ডা হিসেবে তুলে ধরেছিল। মহুয়া চ্যাটার্জি তার লেখায় সতর্ক করে বলেছেন বিজেপি যদি বাংলাদেশের সঙ্গে নদীর পানি ভাগাভাগির বিষয়ে সামনে এগিয়ে যায় তবে তাদের অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যেন এর ফলে তারা স্থানীয় জনগণের সমর্থন না হারায়। প্রসঙ্গত বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সর্বশেষ পানি বণ্টন চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল ২০২২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর যেখানে কুশিয়ারা নদীর পানি বণ্টনের বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। সে সময় দুই দেশ যৌথভাবে ৫৪টি নদী নিয়ে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিল কিন্তু এত কিছুর পরও গঙ্গা ও তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি এখনও পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হিসেবেই রয়ে গেছে।
রিপোর্টারের নাম 























