ঢাকা ০৩:১২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬

স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের নতুন কর্মপরিকল্পনা

দেশের সিংহভাগ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় আগামী পাঁচ মাসের মধ্যে আইন ও বিধি সংস্কার করে নির্বাচনের সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে চায় নির্বাচন কমিশন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার তিন মাস পেরিয়ে গেলেও দেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। এমনকি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদেও স্থানীয় সরকারের কোনো স্তরে ভোট গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশন, পাঁচ শতাধিক উপজেলা পরিষদ, তিন শতাধিক পৌরসভা, পার্বত্য অঞ্চল বাদে ৬১টি জেলা পরিষদ এবং চার হাজারেরও বেশি ইউনিয়ন পরিষদের বেশিরভাগই মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এমন একটি পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন আইন ও বিধিমালা সংস্কার করে আগামী পাঁচ মাসের মধ্যে ভোটের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি শেষ করার একটি মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সম্প্রতি এই বিষয়ে ইসির আইন ও বিধি সংশোধন সংস্কার কমিটি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে এক দফা গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকও সম্পন্ন করেছে। কমিটির আহ্বায়ক ও নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন যে তারা সংস্কারের কাজ শুরু করেছেন এবং বিভিন্ন স্তরের প্রয়োজনীয় তথ্য পর্যালোচনার পর আগামীতে আরও বৈঠকে বসবেন।

নতুন এই সংস্কার ভাবনায় স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনে প্রার্থীদের জামানতের অংকে বড় ধরনের পরিবর্তন ও সমতা আনার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা ভেদে মেয়র পদের জামানত ২০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা এবং পৌরসভায় ১৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা নির্ধারিত আছে। অন্যদিকে জেলা পরিষদে ২০ হাজার, ইউনিয়ন পরিষদে ৫ হাজার এবং ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে আইন সংশোধন করে উপজেলা পরিষদে জামানত ১০ হাজার থেকে বাড়িয়ে এক লাখ টাকা করা হয়েছিল। নির্বাচন কমিশন এখন সিটি করপোরেশনের জামানতের পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি উপজেলার এক লাখ টাকা জামানত রাখা যুক্তিযুক্ত কি না বা তা কিছুটা কমানো যায় কি না, তা নিয়ে গুরুত্বের সাথে বিচার-বিশ্লেষণ করছে। এছাড়া অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার বিদ্যমান বিধানটি পুরোপুরি বাতিল করার একটি প্রাথমিক চিন্তাভাবনাও কমিশনের রয়েছে।

নতুন সংস্কারের আরেকটি বড় দিক হলো সংসদ নির্বাচনের সাথে মিল রেখে স্থানীয় সরকারের সব স্তরের নির্বাচনেও পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। যেহেতু স্থানীয় সরকারে আবারও নির্দলীয় নির্বাচন ব্যবস্থা ফিরে আসছে, তাই স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ভোটারদের সমর্থনসূচক স্বাক্ষরের জটিল বিধানটি পুরোপুরি বাদ দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছে কমিশন। এ বছরের শেষ নাগাদ স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে বলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও ইতিপূর্বে আভাস দিয়েছেন। সাধারণত সরকারের কাছ থেকে সবুজ সংকেত পাওয়ার পরেই ইসি ভোট আয়োজনের মূল প্রক্রিয়া শুরু করে, তবে কমিশন আগামী অক্টোবর মাসের মধ্যেই সংস্কার ও যাবতীয় আইনি প্রস্তুতি শেষ করে ভোটের মাঠে নামতে চায়।

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ আরও জানিয়েছেন যে জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বর্ষা মৌসুমের কারণে বৃষ্টি থাকে, তাই কমিশন সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে। তবে অক্টোবর নাগাদ সব ধরনের প্রস্তুতি গুছিয়ে রাখা হবে এবং বছরের শেষের দিকেই পর্যায়ক্রমে ভোট গ্রহণ শুরু হয়ে যাবে। মেয়াদোত্তীর্ণ সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যেটির নির্বাচন করা এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি জরুরি বা প্রয়োজন বেশি, সেই স্তরের ভোটটিই সবার আগে করার পরিকল্পনা করছে কমিশন। কোন স্তরের নির্বাচন দিয়ে এই ভোট উৎসবের সূচনা হবে তা এখনো চূড়ান্ত না হলেও বছরের শেষভাগে দেশের স্থানীয় সরকারের রূপরেখা অনেকটাই বদলে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

নেত্রকোনায় তরুণীকে সাইবার হয়রানি: সাবেক সেনাসদস্য গ্রেপ্তার, কারাগারে

স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের নতুন কর্মপরিকল্পনা

আপডেট সময় : ০৫:০২:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬

দেশের সিংহভাগ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় আগামী পাঁচ মাসের মধ্যে আইন ও বিধি সংস্কার করে নির্বাচনের সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে চায় নির্বাচন কমিশন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার তিন মাস পেরিয়ে গেলেও দেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। এমনকি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদেও স্থানীয় সরকারের কোনো স্তরে ভোট গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশন, পাঁচ শতাধিক উপজেলা পরিষদ, তিন শতাধিক পৌরসভা, পার্বত্য অঞ্চল বাদে ৬১টি জেলা পরিষদ এবং চার হাজারেরও বেশি ইউনিয়ন পরিষদের বেশিরভাগই মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এমন একটি পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন আইন ও বিধিমালা সংস্কার করে আগামী পাঁচ মাসের মধ্যে ভোটের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি শেষ করার একটি মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সম্প্রতি এই বিষয়ে ইসির আইন ও বিধি সংশোধন সংস্কার কমিটি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে এক দফা গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকও সম্পন্ন করেছে। কমিটির আহ্বায়ক ও নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন যে তারা সংস্কারের কাজ শুরু করেছেন এবং বিভিন্ন স্তরের প্রয়োজনীয় তথ্য পর্যালোচনার পর আগামীতে আরও বৈঠকে বসবেন।

নতুন এই সংস্কার ভাবনায় স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনে প্রার্থীদের জামানতের অংকে বড় ধরনের পরিবর্তন ও সমতা আনার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা ভেদে মেয়র পদের জামানত ২০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা এবং পৌরসভায় ১৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা নির্ধারিত আছে। অন্যদিকে জেলা পরিষদে ২০ হাজার, ইউনিয়ন পরিষদে ৫ হাজার এবং ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে আইন সংশোধন করে উপজেলা পরিষদে জামানত ১০ হাজার থেকে বাড়িয়ে এক লাখ টাকা করা হয়েছিল। নির্বাচন কমিশন এখন সিটি করপোরেশনের জামানতের পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি উপজেলার এক লাখ টাকা জামানত রাখা যুক্তিযুক্ত কি না বা তা কিছুটা কমানো যায় কি না, তা নিয়ে গুরুত্বের সাথে বিচার-বিশ্লেষণ করছে। এছাড়া অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার বিদ্যমান বিধানটি পুরোপুরি বাতিল করার একটি প্রাথমিক চিন্তাভাবনাও কমিশনের রয়েছে।

নতুন সংস্কারের আরেকটি বড় দিক হলো সংসদ নির্বাচনের সাথে মিল রেখে স্থানীয় সরকারের সব স্তরের নির্বাচনেও পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। যেহেতু স্থানীয় সরকারে আবারও নির্দলীয় নির্বাচন ব্যবস্থা ফিরে আসছে, তাই স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ভোটারদের সমর্থনসূচক স্বাক্ষরের জটিল বিধানটি পুরোপুরি বাদ দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছে কমিশন। এ বছরের শেষ নাগাদ স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে বলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও ইতিপূর্বে আভাস দিয়েছেন। সাধারণত সরকারের কাছ থেকে সবুজ সংকেত পাওয়ার পরেই ইসি ভোট আয়োজনের মূল প্রক্রিয়া শুরু করে, তবে কমিশন আগামী অক্টোবর মাসের মধ্যেই সংস্কার ও যাবতীয় আইনি প্রস্তুতি শেষ করে ভোটের মাঠে নামতে চায়।

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ আরও জানিয়েছেন যে জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বর্ষা মৌসুমের কারণে বৃষ্টি থাকে, তাই কমিশন সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে। তবে অক্টোবর নাগাদ সব ধরনের প্রস্তুতি গুছিয়ে রাখা হবে এবং বছরের শেষের দিকেই পর্যায়ক্রমে ভোট গ্রহণ শুরু হয়ে যাবে। মেয়াদোত্তীর্ণ সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যেটির নির্বাচন করা এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি জরুরি বা প্রয়োজন বেশি, সেই স্তরের ভোটটিই সবার আগে করার পরিকল্পনা করছে কমিশন। কোন স্তরের নির্বাচন দিয়ে এই ভোট উৎসবের সূচনা হবে তা এখনো চূড়ান্ত না হলেও বছরের শেষভাগে দেশের স্থানীয় সরকারের রূপরেখা অনেকটাই বদলে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।