ঢাকা ০৫:০৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

কূটনৈতিক দোলাচল আর যুদ্ধের যাঁতাকলে ‘বাংলার জয়যাত্রা’: মাঝ দরিয়ায় ৩১ নাবিকের রুদ্ধশ্বাস দিনকাল

ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুরু হওয়া যুদ্ধের আড়াই মাস পেরিয়ে গেলেও মুক্তি মেলেনি বাংলাদেশি জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’র। পারস্য উপসাগরে আটকা পড়া প্রায় দেড় হাজার জাহাজের হাজার বিশেক নাবিকের মধ্যে এখন সবচেয়ে বেশি দুর্ভাগা মনে করা হচ্ছে এই জাহাজের ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিককে। একদিকে যুদ্ধের ময়দান থেকে ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্রের আতঙ্ক, অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ‘রিলিফ ক্রু’ বা বদলি নাবিক না পাঠানোর সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে এক গভীর মানবিক ও কূটনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত এই জয়যাত্রা।

এক সুযোগ হাতছাড়া ও নিষেধাজ্ঞার আতঙ্ক

ঘটনাপ্রবাহ থেকে জানা যায়, ইরান সম্প্রতি ৫ লাখ ৭৮ হাজার ডলার টোলের বিনিময়ে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার একটি বিশেষ ছাড় দিয়েছিল। এই অর্থটি ছিল বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর তুলনায় পাঁচগুণ কম। কিন্তু বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি) এই সুযোগটি গ্রহণ করেনি। বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেকের মতে, মুসলিম দেশ হিসেবে ছাড় মিললেও ইরানকে এই টোল দিলে মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় পড়ার প্রবল ঝুঁকি ছিল। এই ‘নিষেধাজ্ঞা আতঙ্ক’ আর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষায় ‘অতি সতর্ক’ অবস্থানে থাকতে গিয়েই আজ মাঝ সমুদ্রে বন্দি জাহাজটি।

চুক্তি শেষ, তবু মিলছে না মুক্তি

জাহাজে থাকা ৩১ জন নাবিকের মধ্যে অন্তত এক ডজন ক্রুর চুক্তির মেয়াদ ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। অনেকে টানা ৯ মাস ধরে সমুদ্রে আছেন। যুদ্ধ ভাতা হিসেবে প্রতিদিন অতিরিক্ত ৫ ডলার দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও নাবিকরা তা প্রত্যাখ্যান করেছেন; তারা এখন শুধু পরিবারের কাছে ফিরতে চান। কিন্তু বিএসসি সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা কোনো বিকল্প ক্রু পাঠানোর কথা ভাবছে না। এর মানে হলো, জাহাজটি যতদিন সেখানে আটকে থাকবে, এই নাবিকদেরই সেখানে অবস্থান করতে হবে।

শারীরিক ও মানসিক বিপর্যয়

দীর্ঘদিন আবদ্ধ পরিবেশে থাকা এবং প্রতিনিয়ত আকাশপথে ড্রোন ও মিসাইল হামলার দৃশ্য দেখা নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর চরম প্রভাব ফেলছে। জাহাজে পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এখন কেবল রান্নার জন্য পানি শোধন করা সম্ভব হচ্ছে, ফলে গোসল ও অন্যান্য কাজের জন্য প্রতিদিন মাত্র আধা ঘণ্টা সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে নাবিকদের বড় ধরনের শারীরিক অসুস্থতা ও পুষ্টিহীনতায় পড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

কূটনীতিতে ‘ভুল পদক্ষেপ’ ও জাতীয় স্বার্থ

পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ এই সংকটে ভারসাম্য বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে শিশু হত্যার ঘটনায় নিন্দা না জানানো এবং সরাসরি ইরানবিরোধী বিবৃতি দেওয়া তেহরানকে ক্ষুব্ধ করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সন্তুষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকাই যথেষ্ট নয়; বিশেষ করে যখন জ্বালানি আমদানির জন্য হরমুজ প্রণালি বাংলাদেশের একমাত্র সাশ্রয়ী পথ। কূটনৈতিক পেশাদারিত্বের অভাবে ইরান এখন আর বাংলাদেশকে বিশেষ কোনো ছাড় দিতে আগ্রহী নয়।

নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে

বর্তমানে জাহাজটি দুবাই ও শারজাহ থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে নোঙর করে আছে। জিপিএস জ্যামিং এবং মার্কিন সামরিক তৎপরতার কারণে জাহাজটিকে বারবার অবস্থান পরিবর্তন করতে হচ্ছে। জাহাজের ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, তাদের সামনে এখন আর কোনো পথ খোলা নেই; বিশেষ কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতে নামার অনুমতিও মিলছে না।

বাংলার জয়যাত্রার এই করুণ দশা আমাদের সমুদ্র কূটনীতির এক বড় দূর্বলতাকে উন্মোচিত করেছে। যখন ভারত বা পাকিস্তান তাদের নাবিকদের উদ্ধারে বিকল্প পথ বের করছে, তখন বাংলাদেশ সরকার এখনো কোনো কার্যকর দিশা দিতে পারেনি। এখন প্রশ্ন উঠেছে, কার ভুলের মাশুল দিতে গিয়ে অনিশ্চিত এক ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছে বাংলার এই জয়যাত্রা?

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় ৮ ফুটের অজগর উদ্ধার, বন বিভাগে হস্তান্তর

কূটনৈতিক দোলাচল আর যুদ্ধের যাঁতাকলে ‘বাংলার জয়যাত্রা’: মাঝ দরিয়ায় ৩১ নাবিকের রুদ্ধশ্বাস দিনকাল

আপডেট সময় : ১০:২৭:৫৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৩ মে ২০২৬

ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুরু হওয়া যুদ্ধের আড়াই মাস পেরিয়ে গেলেও মুক্তি মেলেনি বাংলাদেশি জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’র। পারস্য উপসাগরে আটকা পড়া প্রায় দেড় হাজার জাহাজের হাজার বিশেক নাবিকের মধ্যে এখন সবচেয়ে বেশি দুর্ভাগা মনে করা হচ্ছে এই জাহাজের ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিককে। একদিকে যুদ্ধের ময়দান থেকে ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্রের আতঙ্ক, অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ‘রিলিফ ক্রু’ বা বদলি নাবিক না পাঠানোর সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে এক গভীর মানবিক ও কূটনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত এই জয়যাত্রা।

এক সুযোগ হাতছাড়া ও নিষেধাজ্ঞার আতঙ্ক

ঘটনাপ্রবাহ থেকে জানা যায়, ইরান সম্প্রতি ৫ লাখ ৭৮ হাজার ডলার টোলের বিনিময়ে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার একটি বিশেষ ছাড় দিয়েছিল। এই অর্থটি ছিল বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর তুলনায় পাঁচগুণ কম। কিন্তু বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি) এই সুযোগটি গ্রহণ করেনি। বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেকের মতে, মুসলিম দেশ হিসেবে ছাড় মিললেও ইরানকে এই টোল দিলে মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় পড়ার প্রবল ঝুঁকি ছিল। এই ‘নিষেধাজ্ঞা আতঙ্ক’ আর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষায় ‘অতি সতর্ক’ অবস্থানে থাকতে গিয়েই আজ মাঝ সমুদ্রে বন্দি জাহাজটি।

চুক্তি শেষ, তবু মিলছে না মুক্তি

জাহাজে থাকা ৩১ জন নাবিকের মধ্যে অন্তত এক ডজন ক্রুর চুক্তির মেয়াদ ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। অনেকে টানা ৯ মাস ধরে সমুদ্রে আছেন। যুদ্ধ ভাতা হিসেবে প্রতিদিন অতিরিক্ত ৫ ডলার দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও নাবিকরা তা প্রত্যাখ্যান করেছেন; তারা এখন শুধু পরিবারের কাছে ফিরতে চান। কিন্তু বিএসসি সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা কোনো বিকল্প ক্রু পাঠানোর কথা ভাবছে না। এর মানে হলো, জাহাজটি যতদিন সেখানে আটকে থাকবে, এই নাবিকদেরই সেখানে অবস্থান করতে হবে।

শারীরিক ও মানসিক বিপর্যয়

দীর্ঘদিন আবদ্ধ পরিবেশে থাকা এবং প্রতিনিয়ত আকাশপথে ড্রোন ও মিসাইল হামলার দৃশ্য দেখা নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর চরম প্রভাব ফেলছে। জাহাজে পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এখন কেবল রান্নার জন্য পানি শোধন করা সম্ভব হচ্ছে, ফলে গোসল ও অন্যান্য কাজের জন্য প্রতিদিন মাত্র আধা ঘণ্টা সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে নাবিকদের বড় ধরনের শারীরিক অসুস্থতা ও পুষ্টিহীনতায় পড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

কূটনীতিতে ‘ভুল পদক্ষেপ’ ও জাতীয় স্বার্থ

পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ এই সংকটে ভারসাম্য বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে শিশু হত্যার ঘটনায় নিন্দা না জানানো এবং সরাসরি ইরানবিরোধী বিবৃতি দেওয়া তেহরানকে ক্ষুব্ধ করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সন্তুষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকাই যথেষ্ট নয়; বিশেষ করে যখন জ্বালানি আমদানির জন্য হরমুজ প্রণালি বাংলাদেশের একমাত্র সাশ্রয়ী পথ। কূটনৈতিক পেশাদারিত্বের অভাবে ইরান এখন আর বাংলাদেশকে বিশেষ কোনো ছাড় দিতে আগ্রহী নয়।

নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে

বর্তমানে জাহাজটি দুবাই ও শারজাহ থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে নোঙর করে আছে। জিপিএস জ্যামিং এবং মার্কিন সামরিক তৎপরতার কারণে জাহাজটিকে বারবার অবস্থান পরিবর্তন করতে হচ্ছে। জাহাজের ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, তাদের সামনে এখন আর কোনো পথ খোলা নেই; বিশেষ কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতে নামার অনুমতিও মিলছে না।

বাংলার জয়যাত্রার এই করুণ দশা আমাদের সমুদ্র কূটনীতির এক বড় দূর্বলতাকে উন্মোচিত করেছে। যখন ভারত বা পাকিস্তান তাদের নাবিকদের উদ্ধারে বিকল্প পথ বের করছে, তখন বাংলাদেশ সরকার এখনো কোনো কার্যকর দিশা দিতে পারেনি। এখন প্রশ্ন উঠেছে, কার ভুলের মাশুল দিতে গিয়ে অনিশ্চিত এক ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছে বাংলার এই জয়যাত্রা?