দেশের হাওরাঞ্চলে বোরো চাষিদের চোখে এখন কেবলই হতাশার জল। একদিকে অকাল বন্যা ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় চোখের সামনে পচে নষ্ট হচ্ছে কষ্টার্জিত সোনার ফসল, অন্যদিকে কোনোমতে টিকে থাকা ধান বাজারে তুলেও মিলছে না সরকার নির্ধারিত ন্যায্যমূল্য। সব মিলিয়ে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন হাওর পাড়ের লাখ লাখ কৃষক।
চার জেলায় ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জের হাওরগুলোতে ধানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত তিন জেলাতেই ১ লাখ ২৮ হাজার ৮১৩ জন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা তৈরি করা হয়েছে।
- সুনামগঞ্জ: জেলায় প্রায় ২০ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে, যার মধ্যে ১৬ হাজার ৩৯৫ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। যদিও কৃষি বিভাগ বলছে প্রায় ৮০ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছে, তবুও ১২টি উপজেলায় প্রায় ৫০ হাজার ৯১৩টি পরিবার চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলা প্রশাসন থেকে এসব কৃষকদের তিন ক্যাটাগরিতে সরকারি প্রণোদনা দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
- মৌলভীবাজার: এখানে প্রায় সাড় ৫ হাজার হেক্টর জমির মধ্যে ৪ হাজার হেক্টরের বেশি বোরো ধান পুরোপুরি পচে গেছে। ২৫ হাজার ৪০০ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক এখন দিশেহারা। অনেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছিলেন, যা এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
- হবিগঞ্জ: ৫টি উপজেলার ১৩ হাজার হেক্টর জমির ধান তলিয়ে যাওয়ায় ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৪০ কোটি টাকা। কৃষকরা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন অবশিষ্ট ধানটুকু মাড়াই ও শুকাতে, কিন্তু ধানের বর্তমান বাজারদর ও শ্রমিকের উচ্চ মজুরি তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
- কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণা: কিশোরগঞ্জে নতুন করে আরও সাড়ে তিনশ হেক্টর জমি তলিয়ে যাওয়ায় মোট ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৪৭৯ হেক্টর। নেত্রকোণার কৃষকরাও একই দুর্দশার শিকার; তারা ক্ষয়ক্ষতির চাপা কষ্ট নিয়েই ধান কাটার চেষ্টা করছেন।
ন্যায্যমূল্যের অভাব ও ঋণের বোঝা
কৃষকদের সবচেয়ে বড় সংকটের নাম এখন ‘ধানের দাম’। সরকার নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় বাজারে প্রায় অর্ধেক দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। মিল মালিকদের সিন্ডিকেট আর দালালের দৌরাত্ম্যে কৃষকরা তাদের শ্রমের উপযুক্ত প্রতিদান পাচ্ছেন না।
হবিগঞ্জের একজন ভুক্তভোগী কৃষক আক্ষেপ করে জানান, বর্তমানে শ্রমিকের মজুরি এতই বেশি যে, তিন মণ ধান বিক্রি করেও একজন শ্রমিকের একদিনের বেতন মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে, যারা এনজিও বা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছিলেন, ফসল হারিয়ে এখন তাদের পথে বসার উপক্রম হয়েছে। নিজেদের খাবারের পাশাপাশি গৃহপালিত পশুখাদ্য জোগাড় করাও এখন তাঁদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকারি পদক্ষেপ ও প্রত্যাশা
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সমর কুমার পাল জানিয়েছেন, অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় সরকার ইতিমধ্যেই প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। তবে কৃষকদের দাবি, কেবল নামমাত্র প্রণোদনা নয়, বরং বাজারে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে এবং ঋণের কিস্তি স্থগিত করে দীর্ঘমেয়াদী সহায়তা প্রদান করতে হবে।
প্রকৃতির বৈরিতা আর বাজারের অব্যবস্থাপনা—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হাওরের কৃষকরা এখন শুধু সরকারি সাহায্যের দিকেই তাকিয়ে আছেন।
রিপোর্টারের নাম 























