ঢাকা ০৪:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

নতুন বাজেট ২০২৬-২৭: করের বোঝা ও জীবনযাত্রায় সম্ভাব্য প্রভাব

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১১:৩০:০০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
  • ১০ বার পড়া হয়েছে

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে দেশের কর কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। মূলত রাজস্ব ঘাটতি মেটানো, আন্তর্জাতিক ঋণের শর্ত পূরণ এবং উন্নয়ন ব্যয় নির্বাহের লক্ষ্যে সরকার কর আহরণের পরিধি ব্যাপকভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। তবে এই নতুন কর কাঠামো সরাসরি আয়ের চেয়ে ভোগ বা পণ্য ব্যবহারের ওপর অর্থাৎ পরোক্ষ করের ওপর বেশি নির্ভরশীল হওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

উত্তরাধিকার কর: সর্বজনীন করের দিকে যাত্রা

প্রস্তাবিত বাজেটের অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদের ওপর কর আরোপ। খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, এক টাকার বেশি মূল্যের যেকোনো সম্পদ উত্তরাধিকার হিসেবে পেলেই কর দিতে হবে। এতে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে প্রায় সবাই করের আওতায় চলে আসবেন।

  • নিকটাত্মীয়: মা, বাবা বা ভাই-বোনের কাছ থেকে প্রাপ্ত সম্পদের ক্ষেত্রে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ১ শতাংশ এবং পরবর্তী ধাপে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ পর্যন্ত কর দিতে হতে পারে।
  • দূরসম্পর্কের আত্মীয়: এক্ষেত্রে করের হার বেশি, যা ৩ শতাংশ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
  • ঝুঁকি: সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্যের ভিত্তিতে কর নির্ধারণ করা হবে। এতে কর কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়বে, যা সাধারণ মানুষের জন্য হয়রানি বা দুর্নীতির পথ তৈরি করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

পরোক্ষ করের বিস্তার ও সাধারণ মানুষের ওপর চাপ

বাজেটে প্রত্যক্ষ করের চেয়ে পরোক্ষ কর বা ভ্যাটের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। পরোক্ষ কর মূলত ভোগভিত্তিক হওয়ায় এটি ধনী ও দরিদ্র সবার ওপর একই হারে প্রযুক্ত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের বর্তমান পরোক্ষ কর কাঠামো ‘রিগ্রেসিভ’ বা প্রত্যাবর্তনশীল। অর্থাৎ, একজন উচ্চবিত্তের তুলনায় একজন নিম্ন আয়ের মানুষের আয়ের বড় অংশ ভ্যাট দিতে গিয়ে খরচ হয়ে যায়। এর ফলে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়বে, যা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেবে।

সঞ্চয়ে নিরুৎসাহ ও ব্যাংকিং খাতে প্রভাব

নতুন বাজেটে ব্যাংক আমানত বা এফডিআর-এর মুনাফার ওপর আবগারি শুল্ক বর্তমানের ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ সঞ্চয়ে আগ্রহ হারাতে পারে। মুনাফার বড় অংশ কর হিসেবে কেটে নেওয়ায় ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের পর্যবেক্ষণ ও সরকারের অবস্থান

বিশেষজ্ঞদের মতে, কর আহরণ বাড়ানো জরুরি হলেও তা হতে হবে ভারসাম্যপূর্ণ। কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং সরাসরি আয়কর দাতার সংখ্যা না বাড়িয়ে পরোক্ষ করের ওপর চাপ সৃষ্টি করলে সামাজিক বৈষম্য আরও প্রকট হবে। এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ কর নির্ধারণে স্বচ্ছতা ও সহজ প্রক্রিয়ার ওপর জোর দিয়েছেন। অন্যদিকে, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন যে, উন্নয়ন নিশ্চিত করতে কর বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই, তবে ব্যবসায়িক পরিবেশ সহজ করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

সামগ্রিকভাবে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট সাধারণ মানুষের পকেটে বড় ধরনের টান দিতে যাচ্ছে। উত্তরাধিকার কর, বর্ধিত পরোক্ষ কর এবং সঞ্চয়ে উচ্চ করের সমন্বয় জীবনযাত্রার মানকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। এই কর রূপান্তর কতটা জনবান্ধব হবে, তা নির্ভর করবে এর সফল ও ন্যায়সংগত বাস্তবায়নের ওপর।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতারণার ফাঁদ: ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি আর্থিক ক্ষতির মুখে ব্যবহারকারীরা

নতুন বাজেট ২০২৬-২৭: করের বোঝা ও জীবনযাত্রায় সম্ভাব্য প্রভাব

আপডেট সময় : ১১:৩০:০০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে দেশের কর কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। মূলত রাজস্ব ঘাটতি মেটানো, আন্তর্জাতিক ঋণের শর্ত পূরণ এবং উন্নয়ন ব্যয় নির্বাহের লক্ষ্যে সরকার কর আহরণের পরিধি ব্যাপকভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। তবে এই নতুন কর কাঠামো সরাসরি আয়ের চেয়ে ভোগ বা পণ্য ব্যবহারের ওপর অর্থাৎ পরোক্ষ করের ওপর বেশি নির্ভরশীল হওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

উত্তরাধিকার কর: সর্বজনীন করের দিকে যাত্রা

প্রস্তাবিত বাজেটের অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদের ওপর কর আরোপ। খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, এক টাকার বেশি মূল্যের যেকোনো সম্পদ উত্তরাধিকার হিসেবে পেলেই কর দিতে হবে। এতে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে প্রায় সবাই করের আওতায় চলে আসবেন।

  • নিকটাত্মীয়: মা, বাবা বা ভাই-বোনের কাছ থেকে প্রাপ্ত সম্পদের ক্ষেত্রে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ১ শতাংশ এবং পরবর্তী ধাপে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ পর্যন্ত কর দিতে হতে পারে।
  • দূরসম্পর্কের আত্মীয়: এক্ষেত্রে করের হার বেশি, যা ৩ শতাংশ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
  • ঝুঁকি: সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্যের ভিত্তিতে কর নির্ধারণ করা হবে। এতে কর কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়বে, যা সাধারণ মানুষের জন্য হয়রানি বা দুর্নীতির পথ তৈরি করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

পরোক্ষ করের বিস্তার ও সাধারণ মানুষের ওপর চাপ

বাজেটে প্রত্যক্ষ করের চেয়ে পরোক্ষ কর বা ভ্যাটের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। পরোক্ষ কর মূলত ভোগভিত্তিক হওয়ায় এটি ধনী ও দরিদ্র সবার ওপর একই হারে প্রযুক্ত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের বর্তমান পরোক্ষ কর কাঠামো ‘রিগ্রেসিভ’ বা প্রত্যাবর্তনশীল। অর্থাৎ, একজন উচ্চবিত্তের তুলনায় একজন নিম্ন আয়ের মানুষের আয়ের বড় অংশ ভ্যাট দিতে গিয়ে খরচ হয়ে যায়। এর ফলে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়বে, যা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেবে।

সঞ্চয়ে নিরুৎসাহ ও ব্যাংকিং খাতে প্রভাব

নতুন বাজেটে ব্যাংক আমানত বা এফডিআর-এর মুনাফার ওপর আবগারি শুল্ক বর্তমানের ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ সঞ্চয়ে আগ্রহ হারাতে পারে। মুনাফার বড় অংশ কর হিসেবে কেটে নেওয়ায় ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের পর্যবেক্ষণ ও সরকারের অবস্থান

বিশেষজ্ঞদের মতে, কর আহরণ বাড়ানো জরুরি হলেও তা হতে হবে ভারসাম্যপূর্ণ। কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং সরাসরি আয়কর দাতার সংখ্যা না বাড়িয়ে পরোক্ষ করের ওপর চাপ সৃষ্টি করলে সামাজিক বৈষম্য আরও প্রকট হবে। এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ কর নির্ধারণে স্বচ্ছতা ও সহজ প্রক্রিয়ার ওপর জোর দিয়েছেন। অন্যদিকে, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন যে, উন্নয়ন নিশ্চিত করতে কর বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই, তবে ব্যবসায়িক পরিবেশ সহজ করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

সামগ্রিকভাবে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট সাধারণ মানুষের পকেটে বড় ধরনের টান দিতে যাচ্ছে। উত্তরাধিকার কর, বর্ধিত পরোক্ষ কর এবং সঞ্চয়ে উচ্চ করের সমন্বয় জীবনযাত্রার মানকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। এই কর রূপান্তর কতটা জনবান্ধব হবে, তা নির্ভর করবে এর সফল ও ন্যায়সংগত বাস্তবায়নের ওপর।