ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান যুদ্ধাবস্থাকে কেন্দ্র করে ভারতের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি এখন দেশটির ভেতরে ও বাইরে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর সমালোচকরা প্রশ্ন তুলছেন যে, ভারত তার বিশাল অর্থনৈতিক শক্তি, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক পুঁজি এবং প্রবাসীদের প্রভাব থাকা সত্ত্বেও কেন এই সংকটে সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে না। যেখানে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকা বিশ্বজুড়ে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে এবং পাকিস্তান প্রশংসায় ভাসছে, সেখানে ভারতের এই নীরবতাকে অনেকেই ‘কৌশলগত সতর্কতা’ অথবা ‘অতিরিক্ত দ্বিধা’ হিসেবে দেখছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক আলোচনায় মূলত জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখার বিষয়টিই প্রাধান্য পেয়েছে। একইভাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরটিও ছিল কেবল আশ্বাস ও সমন্বয়কেন্দ্রিক। ভারতের এই অবস্থানকে বিশ্লেষকরা কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন হিসেবে বর্ণনা করছেন।
মূলত ভারত বর্তমানে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ বজায় রাখার এক কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নয়াদিল্লি এমন এক সম্পর্কের জালে আটকে রয়েছে, যেখানে একদিকে প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষার জন্য তারা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নিবিড়ভাবে নির্ভরশীল, আবার অন্যদিকে জ্বালানি নিরাপত্তা এবং চাবাহার বন্দরের কানেক্টিভিটির জন্য ইরানের ওপর তাদের নির্ভরতা অনস্বীকার্য। এর পাশাপাশি ইসরায়েলের সাথে গভীর প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত লাখ লাখ ভারতীয় শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষা করাও ভারতের জন্য অপরিহার্য। ফলে কোনো একটি পক্ষ বেছে নেওয়া ভারতের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। ইরানকে সমর্থন করলে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক নষ্ট হবে, আবার যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন করলে ইরানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে আসা ভারতের জ্বালানি আমদানির প্রধান পথটি হুমকির মুখে পড়বে। ভারতের এই নীরবতা আসলে তাদের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ রক্ষার এক চড়া মূল্য, কারণ মধ্যস্থতায় ব্যর্থ হলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভারতের বিশ্বাসযোগ্যতা বড়সড় ধাক্কা খেতে পারে।
অন্যদিকে পাকিস্তানের সক্রিয়তা মূলত তাদের ভৌগোলিক অবস্থান এবং ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর সাথে বিশেষ সম্পর্ক থেকে উদ্ভূত। তবে বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের এই ভূমিকা তাদের নিজস্ব শক্তির চেয়ে বরং চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বাহ্যিক শক্তিগুলোর পৃষ্ঠপোষকতার ওপর বেশি নির্ভরশীল। পাকিস্তান এখানে একজন ‘সহায়তাকারী’ মাত্র, কিন্তু ভারত সবসময় চেয়েছে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান বজায় রাখতে। তবে ভারতের এই নিরপেক্ষ থাকাটা দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। যদি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায় এবং তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়, তবে তা সরাসরি ভারতের অর্থনীতিতে আঘাত হানবে। এছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা ভারতীয় প্রবাসীরা কোনো বড় সংকটে পড়লে ভারতকে অবশ্যই সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অসংলগ্ন নীতির কারণেও ভারত কোনো ঝুঁকিপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপে যেতে চাইছে না। আপাতত ভারত দৃশ্যমান স্পটলাইটের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদী নমনীয়তা এবং স্থিতিশীলতাকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে, যা কেবল সংকটের চূড়ান্ত মীমাংসার সময়ই পরিষ্কার হবে যে এটি সঠিক বিজ্ঞতা ছিল নাকি একটি হারানো সুযোগ।
রিপোর্টারের নাম 

























