ঢাকা ০১:৫৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬

দেশীয় টেলিকম খাত ধ্বংসের ব্লুপ্রিন্ট: নতুন লাইসেন্সিং নীতিমালার ব্যবচ্ছেদ

বাংলাদেশের গত এক দশকের ডিজিটাল বিপ্লব এবং ক্রমবর্ধমান ইন্টারনেট সংযোগের মূলে ছিল এনটিটিএন (NTTN), আইআইজি (IIG), এবং আইএসপি (ISP)-এর মতো একটি শক্তিশালী স্তরীভূত কাঠামো। তবে ২০২৫ সালের নতুন ‘টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক ও লাইসেন্সিং নীতিমালা’ এই স্থিতিশীল ইকোসিস্টেমকে ধ্বংস করে বিদেশি মোবাইল অপারেটরদের একচেটিয়া আধিপত্য তৈরির পথ প্রশস্ত করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দেশীয় উদ্যোক্তাদের মতে, “মূল্য-সংযোজনহীন মধ্যস্থতকারী” নির্মূলের দোহাই দিয়ে আসলে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের বাজার থেকে বিতাড়িত করার একটি নীল নকশা তৈরি করা হয়েছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও সফলতার পরিসংখ্যান
টেলিকম খাতের এই আধুনিকায়নের ফলে ২০০৭ সালে যেখানে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ছিল মাত্র ০.৪ মিলিয়ন, ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩৪ মিলিয়নে। ডাটা ব্যবহারের পরিমাণ ২০০৮ সালের ১০ জিবিপিএস থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭,৬০০ জিবিপিএসে। ২০১২ সালে যেখানে ফাইবার নেটওয়ার্ক ছিল মাত্র ৮,১০০ কিলোমিটার, ২০২৪ সালে তা ১ লাখ ৭২ হাজার কিলোমিটারে উন্নীত হয়েছে। এই বিশাল অবকাঠামোর কল্যাণে একসময় ঢাকা-চট্টগ্রামের মধ্যে প্রতি এমবিপিএস ট্রান্সমিশন খরচ যেখানে ১৫ হাজার টাকা ছিল, বর্তমানে তা কমে মাত্র ২০ টাকায় নেমে এসেছে। এই প্রতিযোগিতামূলক মডেলের কারণেই আজ গ্রাহকরা অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন এবং বিটিআরসির বার্ষিক রাজস্ব আয় ২০০৭ সালের ৫৬৫ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে প্রায় ৪,৫০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

নীতিমালার বৈষম্য ও দেশীয় বিনিয়োগের সংকট
নতুন নীতিমালার বিভিন্ন ধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এটি সুকৌশলে দেশীয় কোম্পানিগুলোকে বাধার মুখে ফেলেছে এবং বিদেশি অপারেটরদের বিশেষ সুবিধা দিয়েছে।

  • ক্রস-ওনারশিপ বৈষম্য: নীতিমালার ৭.২.১ এবং ৭.২.২ ধারা অনুযায়ী দেশীয় কোনো কোম্পানি বা শেয়ারহোল্ডার একাধিক স্তরে লাইসেন্স নিতে পারবে না। কিন্তু ৭.২.৩ ধারায় বিদেশি নতুন আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে এই বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়েছে। এর অর্থ হলো, বিদেশি মোবাইল অপারেটররা চাইলেই তাদের সহযোগী কোম্পানির মাধ্যমে অবকাঠামো (এনটিটিএন বা টাওয়ার) লাইসেন্স নিতে পারবে, যা দেশীয়দের জন্য নিষিদ্ধ।
  • লাস্ট-মাইল কানেক্টিভিটি: নীতিমালার ৭.৭.১১ নং ধারায় মোবাইল অপারেটরদের নিজস্ব ফাইবার অবকাঠামোর মাধ্যমে ‘লাস্ট-মাইল’ সংযোগ দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে গত ১৫ বছরে এনটিটিএন এবং স্থানীয় আইএসপিগুলো যে বিশাল বিনিয়োগ করেছে, তা সরাসরি হুমকির মুখে পড়বে এবং মোবাইল অপারেটরদের একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি হবে।

মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার বৈষম্য
নীতিমালা অনুযায়ী, মোবাইল অপারেটর লাইসেন্সে বিদেশি বিনিয়োগ ৮৫% পর্যন্ত হতে পারে এবং তারা ক্রস-ওনারশিপের সুবিধা পাচ্ছে। অন্যদিকে, এনআইসিএসপি (NICSP) বা অবকাঠামো লাইসেন্সে বিদেশি মালিকানার সীমা মাত্র ৬৫%। এর মাধ্যমে একটি অদ্ভূত বার্তা দেওয়া হচ্ছে যে—যেখানে দেশীয় মূলধনের অংশগ্রহণ বেশি (৩৫% বা তার বেশি), সেখানে বিধিনিষেধ বেশি; আর যেখানে বিদেশি নিয়ন্ত্রণ বেশি, সেখানে সুযোগ ও ক্ষমতা বেশি। এটি সরাসরি জাতীয় অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

কর্মসংস্থান ও জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি
টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির ও আইএসপিএবি-র সভাপতি এম এ হাকিম উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, টেলিযোগাযোগ খাতের সঙ্গে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও ডাটার সার্বভৌমত্ব জড়িত। শতভাগ বা অতি-নির্ভরশীল বিদেশি বিনিয়োগ জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে। এছাড়া এই নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে আইসিএক্স (ICX), আইআইজি (IIG) ও আইজিডব্লিউ (IGW)-এর মতো দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যাবে এবং কয়েক হাজার দক্ষ প্রযুক্তি কর্মী তাদের কর্মসংস্থান হারাবে।

বিশেষজ্ঞদের আহ্বান ও উপসংহার
সামিট কমিউনিকেশন্স ও ফাইবার অ্যাট হোমের মতো বড় দেশীয় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা মনে করেন, এই নীতিমালা আসলে একটি “শুভঙ্করের ফাঁকি”। এর ফলে একদিকে সরকারের রাজস্ব কমে গিয়ে বিদেশি কোম্পানির পকেটে যাবে, অন্যদিকে গ্রাহকরা দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতামূলক বাজারের অভাব এবং উচ্চমূল্যের শিকার হবেন। সংশ্লিষ্টরা সরকারকে এই নীতিমালা সংস্কারে তাড়াহুড়ো না করে স্থানীয় উদ্যোক্তা, শ্রমিক এবং ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় পুনরায় পর্যালোচনার জোর দাবি জানিয়েছেন। দেশীয় সক্ষমতা ধ্বংস করে বিদেশি নির্ভরতা বাড়ালে ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা স্থবির হয়ে পড়ার আশঙ্কাও করছেন তারা।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

শ্রীলঙ্কা থেকে দেশে ফিরলেন আটকে পড়া ২৩৮ ইরানি নাবিক

দেশীয় টেলিকম খাত ধ্বংসের ব্লুপ্রিন্ট: নতুন লাইসেন্সিং নীতিমালার ব্যবচ্ছেদ

আপডেট সময় : ১২:২৩:০৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬

বাংলাদেশের গত এক দশকের ডিজিটাল বিপ্লব এবং ক্রমবর্ধমান ইন্টারনেট সংযোগের মূলে ছিল এনটিটিএন (NTTN), আইআইজি (IIG), এবং আইএসপি (ISP)-এর মতো একটি শক্তিশালী স্তরীভূত কাঠামো। তবে ২০২৫ সালের নতুন ‘টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক ও লাইসেন্সিং নীতিমালা’ এই স্থিতিশীল ইকোসিস্টেমকে ধ্বংস করে বিদেশি মোবাইল অপারেটরদের একচেটিয়া আধিপত্য তৈরির পথ প্রশস্ত করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দেশীয় উদ্যোক্তাদের মতে, “মূল্য-সংযোজনহীন মধ্যস্থতকারী” নির্মূলের দোহাই দিয়ে আসলে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের বাজার থেকে বিতাড়িত করার একটি নীল নকশা তৈরি করা হয়েছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও সফলতার পরিসংখ্যান
টেলিকম খাতের এই আধুনিকায়নের ফলে ২০০৭ সালে যেখানে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ছিল মাত্র ০.৪ মিলিয়ন, ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩৪ মিলিয়নে। ডাটা ব্যবহারের পরিমাণ ২০০৮ সালের ১০ জিবিপিএস থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭,৬০০ জিবিপিএসে। ২০১২ সালে যেখানে ফাইবার নেটওয়ার্ক ছিল মাত্র ৮,১০০ কিলোমিটার, ২০২৪ সালে তা ১ লাখ ৭২ হাজার কিলোমিটারে উন্নীত হয়েছে। এই বিশাল অবকাঠামোর কল্যাণে একসময় ঢাকা-চট্টগ্রামের মধ্যে প্রতি এমবিপিএস ট্রান্সমিশন খরচ যেখানে ১৫ হাজার টাকা ছিল, বর্তমানে তা কমে মাত্র ২০ টাকায় নেমে এসেছে। এই প্রতিযোগিতামূলক মডেলের কারণেই আজ গ্রাহকরা অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন এবং বিটিআরসির বার্ষিক রাজস্ব আয় ২০০৭ সালের ৫৬৫ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে প্রায় ৪,৫০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

নীতিমালার বৈষম্য ও দেশীয় বিনিয়োগের সংকট
নতুন নীতিমালার বিভিন্ন ধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এটি সুকৌশলে দেশীয় কোম্পানিগুলোকে বাধার মুখে ফেলেছে এবং বিদেশি অপারেটরদের বিশেষ সুবিধা দিয়েছে।

  • ক্রস-ওনারশিপ বৈষম্য: নীতিমালার ৭.২.১ এবং ৭.২.২ ধারা অনুযায়ী দেশীয় কোনো কোম্পানি বা শেয়ারহোল্ডার একাধিক স্তরে লাইসেন্স নিতে পারবে না। কিন্তু ৭.২.৩ ধারায় বিদেশি নতুন আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে এই বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়েছে। এর অর্থ হলো, বিদেশি মোবাইল অপারেটররা চাইলেই তাদের সহযোগী কোম্পানির মাধ্যমে অবকাঠামো (এনটিটিএন বা টাওয়ার) লাইসেন্স নিতে পারবে, যা দেশীয়দের জন্য নিষিদ্ধ।
  • লাস্ট-মাইল কানেক্টিভিটি: নীতিমালার ৭.৭.১১ নং ধারায় মোবাইল অপারেটরদের নিজস্ব ফাইবার অবকাঠামোর মাধ্যমে ‘লাস্ট-মাইল’ সংযোগ দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে গত ১৫ বছরে এনটিটিএন এবং স্থানীয় আইএসপিগুলো যে বিশাল বিনিয়োগ করেছে, তা সরাসরি হুমকির মুখে পড়বে এবং মোবাইল অপারেটরদের একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি হবে।

মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার বৈষম্য
নীতিমালা অনুযায়ী, মোবাইল অপারেটর লাইসেন্সে বিদেশি বিনিয়োগ ৮৫% পর্যন্ত হতে পারে এবং তারা ক্রস-ওনারশিপের সুবিধা পাচ্ছে। অন্যদিকে, এনআইসিএসপি (NICSP) বা অবকাঠামো লাইসেন্সে বিদেশি মালিকানার সীমা মাত্র ৬৫%। এর মাধ্যমে একটি অদ্ভূত বার্তা দেওয়া হচ্ছে যে—যেখানে দেশীয় মূলধনের অংশগ্রহণ বেশি (৩৫% বা তার বেশি), সেখানে বিধিনিষেধ বেশি; আর যেখানে বিদেশি নিয়ন্ত্রণ বেশি, সেখানে সুযোগ ও ক্ষমতা বেশি। এটি সরাসরি জাতীয় অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

কর্মসংস্থান ও জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি
টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির ও আইএসপিএবি-র সভাপতি এম এ হাকিম উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, টেলিযোগাযোগ খাতের সঙ্গে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও ডাটার সার্বভৌমত্ব জড়িত। শতভাগ বা অতি-নির্ভরশীল বিদেশি বিনিয়োগ জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে। এছাড়া এই নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে আইসিএক্স (ICX), আইআইজি (IIG) ও আইজিডব্লিউ (IGW)-এর মতো দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যাবে এবং কয়েক হাজার দক্ষ প্রযুক্তি কর্মী তাদের কর্মসংস্থান হারাবে।

বিশেষজ্ঞদের আহ্বান ও উপসংহার
সামিট কমিউনিকেশন্স ও ফাইবার অ্যাট হোমের মতো বড় দেশীয় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা মনে করেন, এই নীতিমালা আসলে একটি “শুভঙ্করের ফাঁকি”। এর ফলে একদিকে সরকারের রাজস্ব কমে গিয়ে বিদেশি কোম্পানির পকেটে যাবে, অন্যদিকে গ্রাহকরা দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতামূলক বাজারের অভাব এবং উচ্চমূল্যের শিকার হবেন। সংশ্লিষ্টরা সরকারকে এই নীতিমালা সংস্কারে তাড়াহুড়ো না করে স্থানীয় উদ্যোক্তা, শ্রমিক এবং ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় পুনরায় পর্যালোচনার জোর দাবি জানিয়েছেন। দেশীয় সক্ষমতা ধ্বংস করে বিদেশি নির্ভরতা বাড়ালে ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা স্থবির হয়ে পড়ার আশঙ্কাও করছেন তারা।