প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বড় ধরনের যুদ্ধাবস্থা কিংবা শত্রুভাবাপন্ন দেশের সমন্বিত সাইবার হামলায় হঠাৎ করেই যদি বিদ্যুৎ, সুপেয় পানি, ইন্টারনেট ও ব্যাংকিং লেনদেনের মতো নাগরিক পরিষেবা সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যায়—তবে কীভাবে চলবে পরিবার? এমন চরম বিপর্যয়কর মুহূর্তে যেন অন্তত তিন দিন বা ৭২ ঘণ্টা নিজেদের বেঁচে থাকার মৌলিক চাহিদা নিজেরাই মেটাতে পারেন, সে লক্ষ্যে সাধারণ নাগরিকদের আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার আনুষ্ঠানিক পরামর্শ দিচ্ছে ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সরকার।
গত ২২ অক্টোবর যুক্তরাজ্য ‘বি রেডি’ (Be Ready) শিরোনামে তিন বছর মেয়াদি একটি বিশেষ জনসচেতনতামূলক জাতীয় অভিযান শুরু করেছে। ফ্রান্স ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রকাশ করেছে ২০ পৃষ্ঠার জরুরি নির্দেশিকা। একইভাবে জাপান ও কানাডা তিন দিন, সুইডেন ও নরওয়ে এক সপ্তাহ এবং জার্মানি নাগরিকদের জন্য অন্তত ১০ দিনের খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী মজুত রাখার পরামর্শ দিয়েছে। এছাড়া খোদ ইউরোপীয় কমিশনও জোটের নাগরিকদের জন্য ন্যূনতম ৭২ ঘণ্টার জরুরি রসদ ঘরে রাখার সুস্পষ্ট তাগিদ দিয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক শহুরে নাগরিক জীবনে বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ, যোগাযোগব্যবস্থা, এটিএম ও ব্যাংকিং এবং সুপারশপগুলো পরস্পরের ওপর চরমভাবে নির্ভরশীল। একটি বড় দুর্যোগ বা সাইবার নাশকতায় বিদ্যুৎ চলে গেলে অচল হয়ে পড়ে এটিএম ও কার্ড পেমেন্ট, বন্ধ হয়ে যায় পাম্পের পানি ও নিত্যপণ্যের সরবরাহ। যুক্তরাষ্ট্রের নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও দুর্যোগ মোকাবিলা বিশেষজ্ঞ ড্যানিয়েল অলড্রিচ সতর্ক করে জানান, কোনো বড় বিপর্যয়ের প্রথম ৭২ ঘণ্টায় সরকারের উদ্ধারকারী দল বা জরুরি সাহায্য প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানো বাস্তবে অসম্ভব। ১৯৯৫ সালের কোবে ভূমিকম্প কিংবা ২০১১ সালের সুনামির উদাহরণ টেনে তিনি জানান, বিপর্যয় শুরুর প্রথম তিন দিনে পরিবার ও প্রতিবেশীদের নিজস্ব প্রস্তুতি ও পারস্পরিক সহযোগিতাই জীবন বাঁচানোর প্রধান হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়।
সরকারি এই নির্দেশিকাগুলোতে মূলত ঘরে দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য শুকনা খাবার, পর্যাপ্ত বোতলজাত বিশুদ্ধ পানি, নিয়মিত ওষুধ, ফার্স্ট এইড কিট, টর্চলাইট, অতিরিক্ত ব্যাটারি, রেডিও, পাওয়ার ব্যাংক এবং ব্যাংকিং অচল হয়ে পড়ার আশঙ্কায় কিছু নগদ অর্থ মজুত রাখার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি শিশু ও বয়োজ্যেষ্ঠদের বিশেষ চাহিদার সামগ্রীও সংগ্রহে রাখতে বলা হচ্ছে। যুক্তরাজ্যে সরকারের এই প্রচারণার পর জনমনে কেনাকাটার হিড়িক পড়েছে; সুপারমার্কেটগুলোতে টিনজাত খাবারের বিক্রি বেড়েছে ৪০ শতাংশ এবং এক লাফে টর্চলাইটের বিক্রি ২৮৪ শতাংশ ও রেডিওর বিক্রি ১৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা আশ্বস্ত করছেন, এসব পদক্ষেপ মানেই নিশ্চিত কোনো যুদ্ধ বা প্রলয়ংকরী মহাদুর্যোগ ঘনিয়ে আসার সংকেত নয়। বরং আধুনিক জটিল ও ভঙ্গুর কাঠামোর সমাজে কোনো আকস্মিক ব্ল্যাকআউট বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেন নাগরিক জীবনকে মুহূর্তেই দিশেহারা করে না দেয়, সে জন্য প্যানিক বাইয়িং বা আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত পণ্য কেনার বদলে ঘরে ধীরে ধীরে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করাই এই বৈশ্বিক আহ্বানের মূল উদ্দেশ্য।

























