প্রকৃতির নিয়মে ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা ও বাতাসের আর্দ্রতায় দ্রুত হেরফের ঘটছে। আর আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের প্রভাবে প্রতিবছরের মতো এবারও বাড়ছে বিভিন্ন ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের প্রকোপ। বিশেষ করে ঋতু পরিবর্তনের এই সন্ধিক্ষণে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা আসে শ্বাসতন্ত্রের ওপর। নাক বন্ধ হওয়া, সর্দি ঝরা, গলাব্যথা, শুকনো কাশি ও জ্বরের মতো উপসর্গ নিয়ে ঘরে ঘরে অসুস্থ হচ্ছেন মানুষ। এ ধরনের মৌসুমি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল অবস্থায় থাকেন শিশু, প্রবীণ এবং ডায়াবেটিস বা সিওপিডিতে ভোগা দীর্ঘমেয়াদি রোগীরা।
চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ মূলত নাক, গলা, শ্বাসনালি ও ফুসফুসকে আক্রান্ত করে। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি বা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া ড্রপলেট ও অ্যারোসোলের মাধ্যমে এটি দ্রুত একজন থেকে অন্যজনে ছড়ায়। শ্বাসতন্ত্রের উপরিভাগে সংক্রমণ হলে ফ্যারিঞ্জাইটিসের কারণে তীব্র গলাব্যথা এবং ল্যারিঞ্জাইটিসের ফলে স্বরযন্ত্রের প্রদাহে কণ্ঠস্বর বসে যেতে পারে। তবে সংক্রমণ শ্বাসনালির নিচের দিকে নামলে ব্রঙ্কাইটিস এবং ফুসফুসের বায়ুথলিতে পৌঁছালে তা মারাত্মক নিউমোনিয়ায় রূপ নিতে পারে।
মৌসুমি সর্দি-কাশির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার। চিকিৎসকরা স্পষ্টভাবে সতর্ক করছেন, ঋতু পরিবর্তনের বেশিরভাগ সংক্রমণই ভাইরাসজনিত। এগুলো লক্ষণভিত্তিক সাধারণ পরিচর্যাতেই সেরে যায়, এতে অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো কার্যকারিতা নেই। তবে ‘স্ট্রেপটোকক্কাস’ ব্যাকটেরিয়াজনিত কারণে গলার ইনফেকশন বা চিকিৎসকের পরীক্ষায় ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত হলে কেবল তখনই সুনির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করা উচিত।
সংক্রমণ ফুসফুসে ছড়িয়ে নিউমোনিয়ায় রূপ নিলে কোনোভাবেই অবহেলা করা যাবে না। কাশি যদি বুকের গভীর থেকে ওঠে, এর সঙ্গে তীব্র কফ, বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, রক্তের অক্সিজেনের মাত্রা হ্রাস বা দীর্ঘস্থায়ী জ্বর থাকে, তবে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী বুকের এক্স-রে, রক্ত পরীক্ষা কিংবা বায়োফায়ার প্যানেলের মতো আধুনিক মলিকিউলার টেস্টের মাধ্যমে জীবাণু শনাক্ত করে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তির পদক্ষেপ নেওয়া জীবনরক্ষায় অত্যন্ত জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললেই এই সংক্রমণ থেকে নিরাপদে থাকা সম্ভব। নিয়মিত সাবান-পানি দিয়ে হাত ধোয়া, জনসমাগম বা বদ্ধ জায়গায় মাস্ক ব্যবহার, হাঁচি-কাশির সময় নাক-মুখ ঢেকে রাখা এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। পাশাপাশি ধূমপান সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলা এবং শিশু, প্রবীণ ও দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সময়মতো ফ্লু ভ্যাকসিন নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।


























