ঢাকা ০৩:২০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

৫০ বছর আগের চুক্তিতে ট্রানজিট চায় নেপাল, বিদ্যুৎ চায় বাংলাদেশ

বাংলাদেশের সড়ক, রেল ও নৌপথ ব্যবহার করে আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ১৯৭৬ সালের একটি পুরনো দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আওতায় ট্রানজিট সুবিধা চাইছে পার্শ্ববর্তী দেশ নেপাল। অন্যদিকে, দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নেপাল থেকে আরও ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দুই দেশের এই দেওয়া-নেওয়া ও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো চূড়ান্ত করতে আগামীকাল থেকে ঢাকায় শুরু হচ্ছে দুই দিনব্যাপী বাণিজ্য সচিব পর্যায়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক বৈঠক।

বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান এবং নেপালের পক্ষে শিল্প, বাণিজ্য ও সরবরাহ মন্ত্রণালয়ের সচিব রাম প্রসাদ ঘিমিরে নিজ নিজ দেশের নেতৃত্ব দেবেন। এই দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় আঞ্চলিক যোগাযোগ ছাড়াও অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি বা পিটিএ, পর্যটন খাতের উন্নয়ন এবং সরাসরি আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থা বা পেমেন্ট সিস্টেম চালুর বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে বলে জানা গেছে।

বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি বাড়াতে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানকে নিয়ে বিবিআইএন চুক্তি কার্যকর রয়েছে। যদিও এই চুক্তির আওতায় ট্রানজিট দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের মন্ত্রিসভার পূর্ব অনুমোদন রয়েছে, তবে নেপাল তাদের ১৯৭৬ সালের দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ভিত্তিতেই ট্রানজিট সুবিধা নিতে বেশি আগ্রহী। বর্তমানে নেপাল ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশের রোহনপুর-সিঙ্গাবাদ এবং বিরল-রাধিকাপুর রেলপথের মাধ্যমে সীমিত পরিসরে পণ্য পরিবহন করছে। এখন তারা এই রুটের পাশাপাশি জলপথেও কার্যকর ট্রানজিট সুবিধা দাবি করছে।

বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বর্তমানে নেপাল থেকে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাচ্ছে, যা গত বছরের ত্রিপক্ষীয় চুক্তির অধীনে শুরু হয়েছে। ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে এই সরবরাহের পরিমাণ আরও ২০ মেগাওয়াট বাড়ানোর জন্য ঢাকা এই বৈঠকে নতুন প্রস্তাব উত্থাপন করবে। একইসঙ্গে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধিতে ২০১৫ সাল থেকে ঝুলে থাকা অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি বা পিটিএ চূড়ান্ত করার বিষয়টিও আলোচনায় প্রাধান্য পাবে। ভুটানের পর নেপালের সঙ্গেই এই চুক্তিটি কার্যকর করতে চায় বাংলাদেশ।

পর্যটন শিল্পের বিকাশে নেপাল তাদের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন শহর পোখরার সাথে বাংলাদেশের কক্সবাজারের সরাসরি বিমান সংযোগ স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছে। তবে এটি বাস্তবায়নে কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মর্যাদায় উন্নীত করার কারিগরি প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হবে। বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বর্তমানে ভারতের ব্যাংকিং সিস্টেম ব্যবহার করতে হয় বলে লেনদেনে কিছুটা জটিলতা রয়েছে। তাই বাংলাদেশ নেপালের সাথে একটি দ্বিপাক্ষিক পেমেন্ট সিস্টেম কার্যকর করতে চায় যাতে সরাসরি ও দ্রুত লেনদেন সম্ভব হয়।

উল্লেখ্য যে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ ও নেপাল একই সঙ্গে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ করবে। এই উত্তরণ পরবর্তী বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবিলায় উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর রূপরেখা এই বৈঠকে নির্ধারিত হওয়ার কথা রয়েছে। এ ছাড়াও বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের জন্য নেপালের ভিসা পদ্ধতি সহজ করা এবং নেপালি পণ্যের ওপর আরোপিত অতিরিক্ত শুল্ক কমানোর মতো বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে স্থান পাবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই বৈঠকের সফল সমাপ্তি দুই দেশের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

জামায়াত আমিরের সঙ্গে ইইউ প্রতিনিধিদলের সাক্ষাৎ: সুষ্ঠু নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণে গুরুত্বারোপ

৫০ বছর আগের চুক্তিতে ট্রানজিট চায় নেপাল, বিদ্যুৎ চায় বাংলাদেশ

আপডেট সময় : ০১:৪৫:৫৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের সড়ক, রেল ও নৌপথ ব্যবহার করে আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ১৯৭৬ সালের একটি পুরনো দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আওতায় ট্রানজিট সুবিধা চাইছে পার্শ্ববর্তী দেশ নেপাল। অন্যদিকে, দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নেপাল থেকে আরও ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দুই দেশের এই দেওয়া-নেওয়া ও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো চূড়ান্ত করতে আগামীকাল থেকে ঢাকায় শুরু হচ্ছে দুই দিনব্যাপী বাণিজ্য সচিব পর্যায়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক বৈঠক।

বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান এবং নেপালের পক্ষে শিল্প, বাণিজ্য ও সরবরাহ মন্ত্রণালয়ের সচিব রাম প্রসাদ ঘিমিরে নিজ নিজ দেশের নেতৃত্ব দেবেন। এই দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় আঞ্চলিক যোগাযোগ ছাড়াও অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি বা পিটিএ, পর্যটন খাতের উন্নয়ন এবং সরাসরি আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থা বা পেমেন্ট সিস্টেম চালুর বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে বলে জানা গেছে।

বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি বাড়াতে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানকে নিয়ে বিবিআইএন চুক্তি কার্যকর রয়েছে। যদিও এই চুক্তির আওতায় ট্রানজিট দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের মন্ত্রিসভার পূর্ব অনুমোদন রয়েছে, তবে নেপাল তাদের ১৯৭৬ সালের দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ভিত্তিতেই ট্রানজিট সুবিধা নিতে বেশি আগ্রহী। বর্তমানে নেপাল ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশের রোহনপুর-সিঙ্গাবাদ এবং বিরল-রাধিকাপুর রেলপথের মাধ্যমে সীমিত পরিসরে পণ্য পরিবহন করছে। এখন তারা এই রুটের পাশাপাশি জলপথেও কার্যকর ট্রানজিট সুবিধা দাবি করছে।

বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বর্তমানে নেপাল থেকে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাচ্ছে, যা গত বছরের ত্রিপক্ষীয় চুক্তির অধীনে শুরু হয়েছে। ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে এই সরবরাহের পরিমাণ আরও ২০ মেগাওয়াট বাড়ানোর জন্য ঢাকা এই বৈঠকে নতুন প্রস্তাব উত্থাপন করবে। একইসঙ্গে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধিতে ২০১৫ সাল থেকে ঝুলে থাকা অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি বা পিটিএ চূড়ান্ত করার বিষয়টিও আলোচনায় প্রাধান্য পাবে। ভুটানের পর নেপালের সঙ্গেই এই চুক্তিটি কার্যকর করতে চায় বাংলাদেশ।

পর্যটন শিল্পের বিকাশে নেপাল তাদের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন শহর পোখরার সাথে বাংলাদেশের কক্সবাজারের সরাসরি বিমান সংযোগ স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছে। তবে এটি বাস্তবায়নে কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মর্যাদায় উন্নীত করার কারিগরি প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হবে। বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বর্তমানে ভারতের ব্যাংকিং সিস্টেম ব্যবহার করতে হয় বলে লেনদেনে কিছুটা জটিলতা রয়েছে। তাই বাংলাদেশ নেপালের সাথে একটি দ্বিপাক্ষিক পেমেন্ট সিস্টেম কার্যকর করতে চায় যাতে সরাসরি ও দ্রুত লেনদেন সম্ভব হয়।

উল্লেখ্য যে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ ও নেপাল একই সঙ্গে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ করবে। এই উত্তরণ পরবর্তী বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবিলায় উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর রূপরেখা এই বৈঠকে নির্ধারিত হওয়ার কথা রয়েছে। এ ছাড়াও বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের জন্য নেপালের ভিসা পদ্ধতি সহজ করা এবং নেপালি পণ্যের ওপর আরোপিত অতিরিক্ত শুল্ক কমানোর মতো বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে স্থান পাবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই বৈঠকের সফল সমাপ্তি দুই দেশের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।