বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নে ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ পরিকল্পনার অধীনে পাকিস্তান থেকে অত্যাধুনিক জেএফ-১৭ থান্ডার (JF-17 Thunder) যুদ্ধবিমান কেনার প্রক্রিয়া চূড়ান্তকরণের পথে রয়েছে। চীন ও পাকিস্তানের যৌথ প্রযুক্তিতে তৈরি এই মাল্টিরোল ফাইটার জেটটি কেনা হলে বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সামরিক বিশেষজ্ঞরা।
সম্প্রতি ইসলামাবাদে বাংলাদেশের বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল শেখ আবদুল হান্নান এবং পাকিস্তানের এয়ার চিফ মার্শাল জাহিদ মাহমুদের মধ্যে এ বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশ সম্ভাব্য ৪৮টি জেএফ-১৭ ব্লক-৩ বিমান কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে ৪৪টি যুদ্ধবিমান থাকলেও সেগুলোর অধিকাংশ বেশ পুরনো, বিশেষ করে চীনা এফ-৭ এবং রাশিয়ার মিগ-২৯ বিমানগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও খুচরা যন্ত্রাংশের সংকটে কার্যকারিতা কমেছে। ফায়ারপাওয়ার ইনডেক্সে বর্তমানে বাংলাদেশ ৫৭তম অবস্থানে থাকলেও এই নতুন বিমানগুলো যুক্ত হলে র্যাঙ্কিংয়ে বড় ধরনের উন্নতির সম্ভাবনা রয়েছে।
কেন জেএফ-১৭ বাংলাদেশের জন্য সেরা পছন্দ?
- সাশ্রয়ী মূল্য ও রক্ষণাবেক্ষণ: প্রতিটি জেএফ-১৭ বিমানের দাম মাত্র ২৫-৩২ মিলিয়ন ডলার, যা ইউরোপীয় রাফায়েল বা টাইফুনের তুলনায় প্রায় চার গুণ কম। এমনকি প্রতি ঘণ্টা ফ্লাইটে এর রক্ষণাবেক্ষণ খরচও মাত্র ৬০০০ ডলার, যা উন্নয়নশীল দেশের বাজেটের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
- অত্যাধুনিক প্রযুক্তি: এর ব্লক-৩ মডেলে রয়েছে এএসইএ (AESA) রাডার এবং পিএল-১৫-এর মতো দূরপাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য মিসাইল। এটি শত্রুর ইলেকট্রনিক সিগন্যাল জ্যাম করতে সক্ষম এবং মিয়ানমারের কাছে থাকা জেএফ-১৭-এর তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী।
- ভৌগোলিক নৈকট্য ও লজিস্টিকস: পাকিস্তান থেকে সমুদ্রপথে দূরত্ব মাত্র ২০০০ কিলোমিটার হওয়ায় খুচরা যন্ত্রাংশ এক-দুই সপ্তাহের মধ্যেই সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। এছাড়া পাকিস্তানের কামরা অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেক্সে এই বিমানের ৮০ শতাংশ যন্ত্রাংশ তৈরি হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদী কারিগরি সহায়তা পাওয়া সহজ হবে।
- সহজ প্রশিক্ষণ: পাকিস্তান বিমানবাহিনী এই বিমানের প্রধান ব্যবহারকারী হওয়ায় তারা বাংলাদেশি পাইলটদের উন্নত সিমুলেটর ও বাস্তবধর্মী প্রশিক্ষণ দিতে সক্ষম। ভাষা ও সাংস্কৃতিক মিল থাকায় এই প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়া চীনের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ভারতের উদ্বেগ ও কৌশলগত ভারসাম্য বাংলাদেশের এই সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা চুক্তি ভারতকে কিছুটা উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। ভারতের চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ (সিডিএস) জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী জেএফ-১৭-কে একটি ‘প্রমাণিত যুদ্ধ প্ল্যাটফর্ম’ হিসেবে উল্লেখ করে এই চুক্তিকে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য পর্যবেক্ষণাধীন বিষয় বলে মন্তব্য করেছেন। ভারতের মূল উদ্বেগের কারণ হলো, এই চুক্তির ফলে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতা বাড়বে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের কৌশলগত একাধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বিমানবাহিনীর এই আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি। ১৯৭১ সালের শহীদের রক্তে অর্জিত স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখতে প্রতিবেশীদের অযাচিত উদ্বেগকে কূটনৈতিকভাবে মোকাবিলা করে নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করাই হবে সঠিক কৌশল।
রিপোর্টারের নাম 
























