বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। ভৌগোলিক অবস্থান ও ঘনবসতির কারণে প্রতিবছরই এ দেশের মানুষকে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং অগ্নিকাণ্ডের মতো প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হয়। এমন সংকটকালীন মুহূর্তে জনগণের জানমাল রক্ষা এবং দ্রুত স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দীর্ঘকাল ধরে এক নির্ভরযোগ্য ও অপরিহার্য শক্তি হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।
মূলত সার্বভৌমত্ব রক্ষা সেনাবাহিনীর প্রধান ব্রত হলেও দেশের যেকোনো বড় দুর্যোগে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা এবং মানবিক কার্যক্রমে অংশ নিয়ে তারা আজ জনগণের হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। যেকোনো জাতীয় সংকটে সাধারণ মানুষের প্রথম প্রত্যাশাই থাকে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি, যা এই বাহিনীর প্রতি দেশবাসীর গভীর আস্থা ও ভালোবাসার প্রতিফলন ঘটায়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বন্যা একটি নিয়মিত আপদ হলেও এই সময়ে সেনাবাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। দুর্গম পানিবন্দী এলাকা থেকে মানুষদের উদ্ধার, অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনা এবং হেলিকপ্টারের মাধ্যমে ত্রাণ ও বিশুদ্ধ পানি পৌঁছে দেওয়ার কাজে তারা সর্বদা অগ্রভাগে থাকে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের প্রলয়ঙ্কারী বন্যায় দিন-রাত নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে সেনাসদস্যরা অসংখ্য প্রাণ রক্ষা করেছেন। শুধু উদ্ধার নয়, বন্যা-পরবর্তী সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত, সড়ক যোগাযোগ সচল করা এবং মোবাইল মেডিক্যাল ইউনিটের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা প্রদান করে তারা এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। পাহাড়ের ধস কিংবা উপকূলের জলোচ্ছ্বাসেও সেনাবাহিনীর দ্রুত ও সাহসী পদক্ষেপ বহু মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায়। সিডর বা আইলার মতো বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়ে তাদের পুনর্গঠন কাজ আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সমাদৃত হয়েছে।
মানবসৃষ্ট দুর্যোগ কিংবা ভয়াবহ দুর্ঘটনায় সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। ২০১৩ সালের রানা প্লাজা ধসের সময় দীর্ঘমেয়াদি উদ্ধার অভিযানের নেতৃত্ব দিয়ে তারা যে মানবিকতা ও শৃঙ্খলা প্রদর্শন করেছে, তা আধুনিক উদ্ধারকাজের ইতিহাসে বিরল। সাম্প্রতিক সময়ে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় সেনাবাহিনীর সদস্যরা যেভাবে আহত শিশুদের উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে পাঠিয়েছেন, তা বড় ধরনের প্রাণহানি রুখতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া কোভিড-১৯ মহামারির চরম সংকটে যখন সাধারণ মানুষ গৃহবন্দী ছিল, তখন সেনাবাহিনী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঘরে ঘরে খাদ্য সহায়তা ও চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিয়েছে। পাহাড়ি ও দুর্গম জনপদে তাদের এই নিঃস্বার্থ সেবা জাতির স্মৃতিতে অম্লান হয়ে থাকবে।
‘সমরে আমরা, শান্তিতে আমরা, সর্বত্র আমরা দেশের তরে’—এই মূলমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রতিটি দুর্যোগে নির্ভরতার প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়। আধুনিক সরঞ্জাম ও নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তারা নিজেদের সক্ষমতাকে প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি করছে। উদ্ধারকাজ থেকে শুরু করে পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সেনাবাহিনীর এই নিষ্ঠা কেবল মানবিক সেবাই নয়, বরং একটি নিরাপদ ও স্থিতিস্থাপক রাষ্ট্র গঠনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। ভবিষ্যতেও যেকোনো সংকটে সেনাবাহিনী এভাবেই দেশ ও মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশকে আরও শক্তিশালী করে তুলবে, এটাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।
রিপোর্টারের নাম 
























