আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘ডিপফেক’ ও ‘চিপফেক’ ভিডিওর মাধ্যমে অপপ্রচারের নতুন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে তৈরি এসব নিখুঁত ভুয়া ভিডিও ও অডিও সাধারণ ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাবকে পুঁজি করে এক শ্রেণির অসাধু চক্র এই প্রযুক্তির অপপ্রয়োগ ঘটাচ্ছে।
২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রার্থীর নাম প্রত্যাহারের ভুয়া ভিডিও থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক নেতাদের নামে ছড়ানো অসংলগ্ন বক্তব্য—সবই আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে জনমতকে প্রভাবিত করার অপচেষ্টা মাত্র।
জার্মান সংস্থা কনরাড অ্যাডেনয়ার ফাউন্ডেশনের (কেএএস) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু বাংলাদেশ নয়, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, তুরস্ক ও স্লোভাকিয়ার মতো দেশগুলোতেও নির্বাচনে ডিপফেক ভিডিওর মাধ্যমে ভোটারদের বিভ্রান্ত করার নজির রয়েছে। বাংলাদেশে গত বছরের শেষ তিন মাসেই ১ হাজার ৪৪১টি ভুল তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে ৯৫৬টিই ছিল রাজনৈতিক অপতথ্য। উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব অপতথ্যের ৬৬ শতাংশই ভিডিওভিত্তিক, যা সাধারণ মানুষের কাছে সত্য বলে দ্রুত বিশ্বাসযোগ্যতা পায়।
ডিপফেক বনাম চিপফেক: কী ঘটছে বাস্তবে?
- ডিপফেক: এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি এমন এক প্রযুক্তি, যা দিয়ে কোনো ব্যক্তির চেহারা বা কণ্ঠস্বর হুবহু নকল করে যে কোনো বক্তব্য বা কাজ করিয়ে দেখানো যায়। এটি এতটাই নিখুঁত যে সাধারণ মানুষের পক্ষে সত্য-মিথ্যা ধরা অসম্ভব।
- চিপফেক: এটি তুলনামূলক সস্তা ও সহজ সফটওয়্যার দিয়ে তৈরি। এতে মূলত সংবাদমাধ্যমের ফটোকার্ড নকল করে ভুয়া উদ্ধৃতি প্রচার বা ভিডিওর অংশবিশেষ কেটে ভিন্ন অর্থ তৈরি করা হয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে বর্তমানে অপতথ্য ছড়াতে অন্তত ১০টি কৌশল ব্যবহৃত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে পুরোনো ভিডিওকে সাম্প্রতিক বলে চালানো, ফটোকার্ড জালিয়াতি এবং তথাকথিত ‘বটবাহিনী’র মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একযোগে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশে অবস্থানরত কিছু ব্যক্তি এবং নির্বাচনে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে আগ্রহী গোষ্ঠীগুলো এসব ভুয়া কনটেন্ট তৈরির নেপথ্যে কাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতে, নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের অনলাইন গ্রুপগুলো এবং টেলিগ্রাম চ্যানেলগুলো অপতথ্য ছড়ানোর বড় উৎস হিসেবে কাজ করছে।
অপতথ্য ছড়ানোর প্রভাব এতটাই ভয়াবহ যে, অনেক সময় মূলধারার গণমাধ্যম এবং রাজনৈতিক নেতারাও যাচাই না করে এসব গুজবকে ভিত্তি করে বক্তব্য দিচ্ছেন। এআই দিয়ে তৈরি তারেক রহমানের দেশে ফেরার ভুয়া ছবি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার ঘটনাটি এর বড় প্রমাণ।
নির্বাচন কমিশন ও জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি (এনসিএসএ) ইতিমধ্যে গুজব প্রতিরোধে বিশেষ সেল গঠন করেছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ২৪ ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরদারি চালাচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু নজরদারি দিয়ে এটি ঠেকানো সম্ভব নয়; বরং জনগণের সচেতনতা ও দ্রুত ফ্যাক্টচেকিং বা তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে। অন্যথায়, প্রযুক্তির এই অদৃশ্য লড়াইয়ে ভোটারদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
রিপোর্টারের নাম 

























