অস্ট্রেলিয়ার সরকার কিশোরদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে যে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল, তার এক মাস পূর্ণ হয়েছে। এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল অনলাইন বুলিং, ক্ষতিকর কনটেন্ট এবং শিশুদের যৌন হয়রানি থেকে তাদের রক্ষা করা। তবে এক মাসের পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, এই নিষেধাজ্ঞার ফলাফল মিশ্র – যেখানে কিছু কিশোরের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, সেখানে অনেকেই বিকল্প পথে অনলাইন আসক্তি টিকিয়ে রেখেছে।
সিডনির ১৪ বছর বয়সী অ্যামি এই নিষেধাজ্ঞার ইতিবাচক প্রভাবের অন্যতম উদাহরণ। তার দৈনন্দিন রুটিনে এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। নিষেধাজ্ঞার প্রথম কয়েক দিন সে অনলাইনে ঢোকার তীব্র টান অনুভব করলেও, দ্রুতই এর থেকে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করে। তার ডায়েরিতে সে লিখেছিল, “স্ন্যাপচ্যাটে ঢুকতে পারব না জেনেও অভ্যাসবশত সকালে অ্যাপটি খুলতে হাত চলে যাচ্ছিল।” তবে স্ন্যাপচ্যাটের ‘স্ট্রিক’ ধরে রাখার চাপ না থাকায় সে নিজেকে ‘মুক্ত’ অনুভব করছে। এক মাস পর অ্যামি জানিয়েছে, “আগে স্ন্যাপচ্যাট খোলা ছিল দৈনন্দিন রুটিনের অংশ। সেখান থেকে ইনস্টাগ্রাম, তারপর টিকটক— এভাবে সময়ের হিসাব থাকত না। এখন আমি সত্যিই প্রয়োজন হলে তবেই ফোন ধরি।” স্কুলের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটানোর বদলে এখন সে দৌড়াতে বের হয়।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজের জন্য অ্যামির অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক। গত ১০ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া এই আইনে ১৬ বছরের নিচের ব্যবহারকারীদের প্ল্যাটফর্ম থেকে সরাতে ব্যর্থ হলে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সর্বোচ্চ ৪৯.৫ মিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলার জরিমানা গুনতে হতে পারে।
তবে সবার অভিজ্ঞতা অ্যামির মতো নয়। ১৩ বছর বয়সী আহিল জানায়, সে আগের মতোই দিনে প্রায় আড়াই ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছে। ইউটিউব ও স্ন্যাপচ্যাটে ভুয়া জন্মতারিখ দিয়ে সে এখনও সক্রিয়। তার বেশিরভাগ সময় কাটে রোবলক্স ও ডিসকর্ডে, যা নিষেধাজ্ঞার আওতায় নেই। আহিলের মা অবশ্য ভিন্ন পরিবর্তন লক্ষ্য করছেন। তিনি বলেন, “ও এখন বেশি মুডি, আর আগের চেয়ে বেশি ভিডিও গেম খেলছে।”
ভোক্তা মনোবিজ্ঞানী ক্রিস্টিনা অ্যান্থনির মতে, এটি স্বল্পমেয়াদি মানসিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, “অনেক কিশোরের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শুধু বিনোদন নয়, বরং মানসিক চাপ ও একাকিত্ব সামলানোর মাধ্যম। হঠাৎ তা বন্ধ হলে বিরক্তি বা বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি তৈরি হতে পারে।”
নিষেধাজ্ঞার পর অ্যামি, আহিল ও ১৫ বছর বয়সী লুলু—তিনজনই হোয়াটসঅ্যাপ ও ফেসবুক মেসেঞ্জারের মতো অননুমোদিত অ্যাপগুলোতে বেশি সময় দিচ্ছে। লুলু টিকটক ও ইনস্টাগ্রামে ভুয়া বয়স দিয়ে নতুন অ্যাকাউন্ট খুলেছে, তবে সে এখন কিছু বইও পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মূল আকর্ষণই হলো সামাজিক সংযোগ। অ্যান্থনি বলেন, “বন্ধুরা না থাকলে সেই আনন্দ ও মানসিক তৃপ্তি দ্রুত কমে যায়।”
নিষেধাজ্ঞার আগে লেমন৮, ইয়োপে ও কভারস্টারের মতো কিছু কম পরিচিত অ্যাপের জনপ্রিয়তা হঠাৎ বেড়ে গিয়েছিল, যা বিশেষজ্ঞদের মতে ‘ক্ষতিপূরণমূলক আচরণ’-এর উদাহরণ। তবে অ্যাপটপিয়ার তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক উল্লম্ফনের পর এসব অ্যাপের ডাউনলোড এখন কমে এসেছে।
ডিজিটাল সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞ মার্ক জনসনের মতে, গেমিং প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তুলনায় কঠিন, কারণ সবার কাছে প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যার বা দক্ষতা থাকে না।
অ্যামির মা ইউকো অবশ্য মনে করেন, এই পরিবর্তন নিষেধাজ্ঞার ফল নাকি ছুটির শান্ত সময়ের প্রভাব—তা এখনই বলা কঠিন। তিনি বলেন, “এই সিদ্ধান্ত ভালো না খারাপ—সময়ই বলে দেবে।” তবে অ্যামি নিজে বন্ডি বিচে হামলার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কম সময় কাটানোয় স্বস্তি পেয়েছিল। তার মতে, টিকটকে থাকলে হয়তো ভয়ংকর ও নেতিবাচক কনটেন্টে ডুবে যেত।
অস্ট্রেলিয়ার এই পদক্ষেপ বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল আসক্তি নিয়ন্ত্রণের নতুন চ্যালেঞ্জগুলো সামনে আনছে, যেখানে প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ এবং কিশোরদের সামাজিক ও মানসিক চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
রিপোর্টারের নাম 

























