ঢাকা ০২:১৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

সিনেমা ‘মুজিব ভাই’ ঘিরে ৪ হাজার কোটি টাকার বিভ্রান্তি: শ্বেতপত্রের প্রকৃত তথ্য কী?

জাতীয় নির্বাচন আর রাজনৈতিক অস্থিরতার ডামাডোলে সম্প্রতি নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে ‘মুজিব ভাই’ নামের একটি অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র। দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়ে যে, এই সিনেমার পেছনে ৪ হাজার ২ শত ১১ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় অর্থের এক অবিশ্বাস্য লুটপাট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই তথ্য দেশের আপামর জনসাধারণকে বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ করেছে।

এই ব্যাপক সমালোচনার সূত্রপাত হয় সরকার প্রকাশিত একটি ‘শ্বেতপত্র’ থেকে। গত ৫ জানুয়ারি ডাক ও টেলিযোগাযোগ খাতে গত ১৫ বছরের অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে ৩ হাজার ২৭২ পৃষ্ঠার এই শ্বেতপত্রটি প্রকাশ করে সরকার। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং নাগরিককেন্দ্রিক টেলিযোগাযোগ সেবা নিশ্চিত করতে এই দলিল নীতিগত দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে।

তবে, শ্বেতপত্রটি সেই কাজ করার চেয়ে গণমাধ্যমের সূত্র ধরে বিতর্ক আর বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। কারণ, এই শ্বেতপত্রের যে বিষয়টি নিয়ে তুমুল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে সেটি হলো ‘মুজিব ভাই’ নামের একটি সিনেমার অবিশ্বাস্য নির্মাণ ব্যয়। কিন্তু আমাদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, শ্বেতপত্রে ৪ হাজার ২ শত ১১ কোটি টাকার কোনো উল্লেখই নেই। বরং, এতে ৪২ শত ১১.২২ লাখ টাকার একটি হিসাব রয়েছে। গণমাধ্যমগুলো সম্ভবত ‘লাখ’ এবং ‘কোটি’র মধ্যে পার্থক্য করতে গিয়েই এই বিশাল অঙ্কের ভুল করেছে। অর্থনীতিবিদ ও সংখ্যাতত্ত্ববিদদের মতে, ৪২ শত ১১.২২ লাখ টাকা মানে হলো ৪২ কোটি ১১ লাখ ২২ হাজার টাকা প্রায়। এটি কোনোভাবেই ৪ হাজার কোটি টাকা হতে পারে না। অথচ দেশের অসংখ্য গণমাধ্যম ‘শ্বেতপত্রে’র সূত্র দিয়ে সেই ভুল খবরটিই প্রকাশ করছে গত কয়েকদিন ধরে।

এবার চোখ ফেরানো যাক পুরো গল্পে। অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক অনুসন্ধান করে প্রকাশিত এই দীর্ঘ শ্বেতপত্রে ‘মুজিব ভাই’ কিংবা ৪২ শত ১১.২২ লাখ টাকা ব্যয়ের হিসাবকে ঠিক কিভাবে উল্লেখ করেছে? শ্বেতপত্রের ফ্যাক্ট ১২ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে, আইসিটি ডিভিশন করদাতাদের অর্থ ব্যবহার করে অনুৎপাদনশীল ও দলীয় কার্যক্রমে অর্থ ব্যয় করেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট আইসিটি ডিভিশনের সঙ্গে একাধিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে, যার মাধ্যমে ‘খোকা’ নামের অ্যানিমেটেড সিরিজ এবং ‘মুজিব ভাই’ শীর্ষক অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র নির্মাণসহ দলীয় উদ্দেশ্যসম্পন্ন কর্মকাণ্ডে অর্থ ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

শ্বেতপত্র অনুযায়ী, আইসিটি ডিভিশনের তহবিল থেকে মোট ৪২ শত ১১.২২ লাখ টাকা (৪২ কোটি ১১ লাখ ২২ হাজার টাকা) ‘রাজনৈতিক প্রচারণামূলক কার্যক্রমে’ ব্যয় করা হয়েছে। এখানে লক্ষ্যণীয় যে, এই অর্থ কেবল ‘মুজিব ভাই’ সিনেমার নির্মাণ ব্যয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি, বরং এটি সামগ্রিক ‘রাজনৈতিক প্রচারণামূলক কার্যক্রমে’র অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

একই প্রসঙ্গে শ্বেতপত্রে আরও বলা হয়েছে, বিভিন্ন প্রকল্পের উপাদানে স্পষ্টভাবে দলীয় পক্ষপাতের ছাপ দেখা গেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ (২০১৭), ‘মুজিব ভাই’ (২০২৩), ‘খোকা’ এবং ‘সমৃদ্ধ আগামীর প্রতিচ্ছবি’ (২০২৩)—এই উদ্যোগগুলো সরাসরি আইসিটি ডিভিশনের অর্থায়নে বাস্তবায়িত হয়েছে। ‘মুজিব ভাই’কে মূলত ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিংয়ের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক ব্র্যান্ডিং প্রকল্প এবং ‘খোকা’কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মহিমান্বিত করে দলীয় বয়ানকে আরও জোরদার করার মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে, সরকারি অর্থায়নে আয়োজিত ‘শেখ রাসেল দিবস’-এর মতো অনুষ্ঠানগুলোও উন্নয়নমূলক লক্ষ্য নয়, বরং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের মাধ্যম হিসেবে সমালোচিত হয়েছে।

এবার ফেরা যাক হঠাৎ আলোচিত হয়ে ওঠা ‘মুজিব ভাই’ অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রটি সম্পর্কে। ২০২৩ সালের ২৩ জুন রাজধানীর সীমান্ত সম্ভারের স্টার সিনেপ্লেক্সে এর প্রিমিয়ার শো অনুষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ অবলম্বনে আইসিটি বিভাগের মোবাইল গেম ও অ্যাপ্লিকেশনের দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে এটি তৈরি করা হয়। উক্ত প্রিমিয়ার শোতে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্‌মেদ পলক, চলচ্চিত্রটির দুই পরিচালক চন্দন কুমার বর্মন ও সোহেল মোহাম্মদ, চিত্রনাট্যকার আদনান আদিব খানসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সিনেমাটি প্রসঙ্গে জুনাইদ আহমেদ পলক সেদিন (২৩ জুন, ২০২৩) বলেন, ‘দেশের অ্যানিমেশন শিল্পকে, অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রে তুলে ধরতে এবং দেশের তরুণদের অ্যানিমেশন শিল্পে উদ্বুদ্ধ করতে এই সিনেমা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’ তিনি আরও জানান, চলচ্চিত্রটি বিভিন্ন সিনেপ্লেক্সে, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম এবং টিভি চ্যানেলে প্রচার করা হবে, যাতে শিশু ও তরুণরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অত্যন্ত সাহসী নেতৃত্বের ভূমিকা সম্পর্কে জানতে পারে। অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রটিতে মা-বাবার আদরের খোকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কীভাবে বাংলার মানুষের কাছে ‘মুজিব ভাই’ হয়ে উঠলেন, তা জানানোর পাশাপাশি তাঁর জীবনসংগ্রাম সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে। চলচ্চিত্রটির অ্যানিমেশন তৈরি করেছে টেকনোম্যাজিক প্রাইভেট লিমিটেড ও হাইপার ট্যাগ লিমিটেড।

এই সিনেমা ও সাম্প্রতিক সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে তরুণ নির্মাতা আনন্দ কুটুম এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমি যতটুকু জানি, সিআরআই-এর উদ্যোগে এই সিনেমাটি বানানো হয়েছিল। আমি তখন যেটুকু শুনেছি, এটার পেছনে মাত্র ৪ কোটির মতো বাজেট ছিল। অ্যানিমেটেড সিনেমার জন্য এটা আসলে সে অর্থে বাজেটই না। সেই টাকাটিও বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান স্পন্সর করেছিল বলে আমি জেনেছিলাম। এই তথ্যগুলো আসলে আমি তখন নিয়েছিলাম একজন নির্মাতা হিসেবে, নিজের আগ্রহ থেকেই। আজ দেখি সেটি ৪ হাজার কোটি টাকার ঘটনায় রূপ নিল। এটা অবিশ্বাস্য।’

কথিত ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের ‘মুজিব ভাই’ সিনেমার দৈর্ঘ্য মাত্র ৪৫ মিনিট! ছবিটি সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র পায় একই বছরের ২৬ জুন। এটি ইউটিউব ও বিভিন্ন ওটিটি প্ল্যাটফর্মে যে কেউ দেখতে পারবেন।

শ্বেতপত্রের তথ্যের ভুল ব্যাখ্যা এবং গণমাধ্যমের অসতর্ক প্রচারণার ফলেই ‘মুজিব ভাই’ সিনেমার ৪২ কোটি টাকার বাজেট ৪ হাজার কোটি টাকায় রূপান্তরিত হয়েছে। এই ঘটনা কেবল জনমনে বিভ্রান্তিই সৃষ্টি করেনি, বরং রাষ্ট্রীয় তথ্যের সঠিক উপস্থাপনার গুরুত্বকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ভারতের ওয়ানডে জয়ে বাংলাদেশের সৈকত, আইসিসি চুক্তিতে নেই বিসিবির বাধা

সিনেমা ‘মুজিব ভাই’ ঘিরে ৪ হাজার কোটি টাকার বিভ্রান্তি: শ্বেতপত্রের প্রকৃত তথ্য কী?

আপডেট সময় : ০৯:২৯:৩৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৬

জাতীয় নির্বাচন আর রাজনৈতিক অস্থিরতার ডামাডোলে সম্প্রতি নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে ‘মুজিব ভাই’ নামের একটি অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র। দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়ে যে, এই সিনেমার পেছনে ৪ হাজার ২ শত ১১ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় অর্থের এক অবিশ্বাস্য লুটপাট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই তথ্য দেশের আপামর জনসাধারণকে বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ করেছে।

এই ব্যাপক সমালোচনার সূত্রপাত হয় সরকার প্রকাশিত একটি ‘শ্বেতপত্র’ থেকে। গত ৫ জানুয়ারি ডাক ও টেলিযোগাযোগ খাতে গত ১৫ বছরের অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে ৩ হাজার ২৭২ পৃষ্ঠার এই শ্বেতপত্রটি প্রকাশ করে সরকার। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং নাগরিককেন্দ্রিক টেলিযোগাযোগ সেবা নিশ্চিত করতে এই দলিল নীতিগত দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে।

তবে, শ্বেতপত্রটি সেই কাজ করার চেয়ে গণমাধ্যমের সূত্র ধরে বিতর্ক আর বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। কারণ, এই শ্বেতপত্রের যে বিষয়টি নিয়ে তুমুল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে সেটি হলো ‘মুজিব ভাই’ নামের একটি সিনেমার অবিশ্বাস্য নির্মাণ ব্যয়। কিন্তু আমাদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, শ্বেতপত্রে ৪ হাজার ২ শত ১১ কোটি টাকার কোনো উল্লেখই নেই। বরং, এতে ৪২ শত ১১.২২ লাখ টাকার একটি হিসাব রয়েছে। গণমাধ্যমগুলো সম্ভবত ‘লাখ’ এবং ‘কোটি’র মধ্যে পার্থক্য করতে গিয়েই এই বিশাল অঙ্কের ভুল করেছে। অর্থনীতিবিদ ও সংখ্যাতত্ত্ববিদদের মতে, ৪২ শত ১১.২২ লাখ টাকা মানে হলো ৪২ কোটি ১১ লাখ ২২ হাজার টাকা প্রায়। এটি কোনোভাবেই ৪ হাজার কোটি টাকা হতে পারে না। অথচ দেশের অসংখ্য গণমাধ্যম ‘শ্বেতপত্রে’র সূত্র দিয়ে সেই ভুল খবরটিই প্রকাশ করছে গত কয়েকদিন ধরে।

এবার চোখ ফেরানো যাক পুরো গল্পে। অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক অনুসন্ধান করে প্রকাশিত এই দীর্ঘ শ্বেতপত্রে ‘মুজিব ভাই’ কিংবা ৪২ শত ১১.২২ লাখ টাকা ব্যয়ের হিসাবকে ঠিক কিভাবে উল্লেখ করেছে? শ্বেতপত্রের ফ্যাক্ট ১২ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে, আইসিটি ডিভিশন করদাতাদের অর্থ ব্যবহার করে অনুৎপাদনশীল ও দলীয় কার্যক্রমে অর্থ ব্যয় করেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট আইসিটি ডিভিশনের সঙ্গে একাধিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে, যার মাধ্যমে ‘খোকা’ নামের অ্যানিমেটেড সিরিজ এবং ‘মুজিব ভাই’ শীর্ষক অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র নির্মাণসহ দলীয় উদ্দেশ্যসম্পন্ন কর্মকাণ্ডে অর্থ ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

শ্বেতপত্র অনুযায়ী, আইসিটি ডিভিশনের তহবিল থেকে মোট ৪২ শত ১১.২২ লাখ টাকা (৪২ কোটি ১১ লাখ ২২ হাজার টাকা) ‘রাজনৈতিক প্রচারণামূলক কার্যক্রমে’ ব্যয় করা হয়েছে। এখানে লক্ষ্যণীয় যে, এই অর্থ কেবল ‘মুজিব ভাই’ সিনেমার নির্মাণ ব্যয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি, বরং এটি সামগ্রিক ‘রাজনৈতিক প্রচারণামূলক কার্যক্রমে’র অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

একই প্রসঙ্গে শ্বেতপত্রে আরও বলা হয়েছে, বিভিন্ন প্রকল্পের উপাদানে স্পষ্টভাবে দলীয় পক্ষপাতের ছাপ দেখা গেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ (২০১৭), ‘মুজিব ভাই’ (২০২৩), ‘খোকা’ এবং ‘সমৃদ্ধ আগামীর প্রতিচ্ছবি’ (২০২৩)—এই উদ্যোগগুলো সরাসরি আইসিটি ডিভিশনের অর্থায়নে বাস্তবায়িত হয়েছে। ‘মুজিব ভাই’কে মূলত ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিংয়ের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক ব্র্যান্ডিং প্রকল্প এবং ‘খোকা’কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মহিমান্বিত করে দলীয় বয়ানকে আরও জোরদার করার মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে, সরকারি অর্থায়নে আয়োজিত ‘শেখ রাসেল দিবস’-এর মতো অনুষ্ঠানগুলোও উন্নয়নমূলক লক্ষ্য নয়, বরং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের মাধ্যম হিসেবে সমালোচিত হয়েছে।

এবার ফেরা যাক হঠাৎ আলোচিত হয়ে ওঠা ‘মুজিব ভাই’ অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রটি সম্পর্কে। ২০২৩ সালের ২৩ জুন রাজধানীর সীমান্ত সম্ভারের স্টার সিনেপ্লেক্সে এর প্রিমিয়ার শো অনুষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ অবলম্বনে আইসিটি বিভাগের মোবাইল গেম ও অ্যাপ্লিকেশনের দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে এটি তৈরি করা হয়। উক্ত প্রিমিয়ার শোতে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্‌মেদ পলক, চলচ্চিত্রটির দুই পরিচালক চন্দন কুমার বর্মন ও সোহেল মোহাম্মদ, চিত্রনাট্যকার আদনান আদিব খানসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সিনেমাটি প্রসঙ্গে জুনাইদ আহমেদ পলক সেদিন (২৩ জুন, ২০২৩) বলেন, ‘দেশের অ্যানিমেশন শিল্পকে, অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রে তুলে ধরতে এবং দেশের তরুণদের অ্যানিমেশন শিল্পে উদ্বুদ্ধ করতে এই সিনেমা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’ তিনি আরও জানান, চলচ্চিত্রটি বিভিন্ন সিনেপ্লেক্সে, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম এবং টিভি চ্যানেলে প্রচার করা হবে, যাতে শিশু ও তরুণরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অত্যন্ত সাহসী নেতৃত্বের ভূমিকা সম্পর্কে জানতে পারে। অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রটিতে মা-বাবার আদরের খোকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কীভাবে বাংলার মানুষের কাছে ‘মুজিব ভাই’ হয়ে উঠলেন, তা জানানোর পাশাপাশি তাঁর জীবনসংগ্রাম সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে। চলচ্চিত্রটির অ্যানিমেশন তৈরি করেছে টেকনোম্যাজিক প্রাইভেট লিমিটেড ও হাইপার ট্যাগ লিমিটেড।

এই সিনেমা ও সাম্প্রতিক সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে তরুণ নির্মাতা আনন্দ কুটুম এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমি যতটুকু জানি, সিআরআই-এর উদ্যোগে এই সিনেমাটি বানানো হয়েছিল। আমি তখন যেটুকু শুনেছি, এটার পেছনে মাত্র ৪ কোটির মতো বাজেট ছিল। অ্যানিমেটেড সিনেমার জন্য এটা আসলে সে অর্থে বাজেটই না। সেই টাকাটিও বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান স্পন্সর করেছিল বলে আমি জেনেছিলাম। এই তথ্যগুলো আসলে আমি তখন নিয়েছিলাম একজন নির্মাতা হিসেবে, নিজের আগ্রহ থেকেই। আজ দেখি সেটি ৪ হাজার কোটি টাকার ঘটনায় রূপ নিল। এটা অবিশ্বাস্য।’

কথিত ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের ‘মুজিব ভাই’ সিনেমার দৈর্ঘ্য মাত্র ৪৫ মিনিট! ছবিটি সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র পায় একই বছরের ২৬ জুন। এটি ইউটিউব ও বিভিন্ন ওটিটি প্ল্যাটফর্মে যে কেউ দেখতে পারবেন।

শ্বেতপত্রের তথ্যের ভুল ব্যাখ্যা এবং গণমাধ্যমের অসতর্ক প্রচারণার ফলেই ‘মুজিব ভাই’ সিনেমার ৪২ কোটি টাকার বাজেট ৪ হাজার কোটি টাকায় রূপান্তরিত হয়েছে। এই ঘটনা কেবল জনমনে বিভ্রান্তিই সৃষ্টি করেনি, বরং রাষ্ট্রীয় তথ্যের সঠিক উপস্থাপনার গুরুত্বকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।