ঢাকা ০২:০৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

নতুন পাঠ্যবইয়ে স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান

২০২৬ শিক্ষাবর্ষের নতুন পাঠ্যবইয়ের অনলাইন সংস্করণ আপলোড করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। এতে ষষ্ঠ শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ পাঠ্যবইয়ে লেখা হয়েছে— ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। একইসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে আবারও জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। বইটিতে বাংলাদেশ সৃষ্টিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান যেমন অনুপস্থিত, তেমনি শেখ মুজিবুর রহমান নামের আগে বঙ্গবন্ধু শব্দটি বাদ দেওয়া হয়েছে। এবারের পাঠ্যবইয়ে ছয়দফা আছে, নেই বঙ্গবন্ধুর নাম। আগরতলা মামলাটি ঐতিহাসিক পেক্ষাপট রাখা হলেও বাদ দেওয়া হয়েছে বঙ্গবন্ধুর নামও।

এই পাঠ্যবইয়ে মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কিংবা নেতৃত্বদানকারী দল হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম স্থগিত) কোনও ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়নি। বাংলাদেশ সৃষ্টির পটভূমিতে এককভাবে জিয়াউর রহমানের ভূমিকাই তুলে ধরা হয়েছে।

রবিবার (২৮ ডিসেম্বর) এনসিটিবির ওয়েবসাইটে আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠ্যবই আপলোড শুরু হয়। এ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধানরঞ্জন রায় পোদ্দার পাঠ্যবইয়ের অনলাইন সংস্করণ ওয়েবসাইটে অবমুক্ত করেন।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, আগামী ১ জানুয়ারি থেকে শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়া হবে।

ওয়েবসাইটে আপলোড করা সংস্করণে ষষ্ট শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ের ‘বাংলাদেশ সৃষ্টির পটভূমি ও স্বাধীন বাংলাদেশ’ অধ্যায়ে ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কোনও অবদান আছে কি-না তা লেখা নেই।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং পরদিন শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে ২৭শে মার্চ আবার জিয়াউর রহমান ঘোষণা দেন লেখা হয়েছে। এই একটি বার বঙ্গবন্ধুর নাম লেখা হলেও বাংলাদেশের অভ্যুদয় অংশে তার নাম নেই। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হলেও দলটির নাম নেই।

বইটির পাঠ-৯ এর বাংলাদেশ সৃষ্টির পটভূমি ও স্বাধীন বাংলাদেশ অধ্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়। পাকিস্তান ছিল দুটি ভিন্ন অঞ্চল নিয়ে গঠিত। ভৌগোলিকভাবে দূর অবস্থিত ভূখণ্ডের পশ্চিম অংশটিকে বলা হতো, পশ্চিম পাকিস্তান আর পূর্ব অংশটিকে বলা হতো পূর্ব পাকিস্তান। তৎকালীন দুই অংশে বিভক্ত পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতা ছিল, পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে। তারাও নানাভাবে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে শোষণ করতো। একটা পর্যায়ে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে একত্র হয় পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা বুঝতে পারে পূর্ব পাকিস্তানের ওপর তাদের আধিপত্য আর ধরে রাখা সম্ভব নয়। ১৯৯১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আক্রমণ চালিয়ে গণহত্যা শুরু করে। তাদের বিরুদ্ধে বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ। ২৬ মার্চ তারিখে মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এরপর তিনি ২৭শে মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে আবারও স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ জন্ম নেয় একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র, বাংলাদেশ।’

ষষ্ঠ শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ের পাঠ-১০ এর স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুত্থান অধ্যায়ে লেখা হয়েছে, ‘১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা চালু হয়। কিন্তু ১৯৭৫ সালে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে শুরু হয় বাকশাল নামক একদলীয় শাসন। ১৯৭৯ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আবার বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করেন। ১৯৮২ সালে তৎকালীন সেনাবাহিনী-প্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে দেশে স্বৈরশাসন শুরু করেন। এতে জনগণের মধ্যে ক্ষোভ বৃদ্ধি পেতে থাকে। ছাত্রসমাজ, রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষ একজোট হয়ে গণতন্ত্র ফিরে পেতে আন্দোলন শুরু করে। টানা আন্দোলন ও সংগ্রামের পর ১৯৯০ সালে এক গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পতন হয়। বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র আবার যাত্রা শুরু করে।’

সপ্তম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় পাঠ্যবইয়ে ১০৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ছবি রয়েছে ওই অংশে। 

পাঠ্যবইটিতে বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া অংশে স্বাধীনতার পটভূমিতে বর্ণনায় একইভাবে বাদ দিয়ে শুধু জিয়াউর রহমানের অবদান তুলে ধরা হয়েছে। ছয় দফা, আগরতলা মামলার কথা উল্লেখ থাকলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম উল্লেখ করা হয়নি। পাঠ্যবইটির এই অংশে মুক্তিযুদ্ধকে জনযুদ্ধ বলা হলেও মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে বঙ্গবন্ধুকে রাখা হয়নি।

অষ্টম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় পাঠ্যবইয়ে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি অধ্যায়ে আওয়ামী লীগ অসহযোগ আন্দোলন গড়ে তোলে উল্লেখ করা হলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম উল্লেখ নেই।

বইটিতে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি শেষ অংশে লেখা হয়, এই পরিস্থিতিতে ভীত হয়ে ইয়াহিয়া খান ৬ মার্চ এক বেতার ভাষণে ২৫ মার্চ ঢাকায় পুনরায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন। শেখ মুজিবুর রহমান সে ঘোষণায় সন্তুষ্ট হতে পারেননি। এই পরিস্থিতিতে ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বৃহত্তর আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণার জন্য একটি জনসভার আয়োজন করা হয়।

পাঠ্যবইটিতে ৭ মার্চের ভাষণের বিষয়টি তুলে ধরা হয়। পাঠ-২ এর ‘৭ মার্চের ভাষণ’ অধ্যায়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের কিছু অংশ তুলে ধরে বর্ণনা করা হয়েছে। পুরো ভাষণটি পাঠ্যবইয়ে রাখা হয়নি। এই অধ্যায়ের একাংশে বলা হয়েছে, বক্তৃতার এক জায়গায় তিনি বলেছিলেন, ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গোড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো।’ 

বক্তৃতার শেষ অংশের উল্লেখ করে পাঠ্যই বইয়ে লেখা হয়, ‘‘শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে বাঙালিকে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত রাখা। বক্তৃতার শেষ অংশে ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ ঘোষণা দিয়ে তিনি স্পষ্টভাবেই স্বাধীনতার ডাক দেন।”

নবম ও দশম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় পাঠ্যবইয়ের ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা’ অংশে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের উল্লেখ করা হয়েছে। এতে লেখা হয়, ‘শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১০৯৭০ সালের তৎকালীন পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনের আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে।’ এরপর স্বাধীনতার পটভূমিতে ষষ্ঠ, সপ্তম, ও অষ্টম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ের মতোই মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণার বিষয়টি তুলে ধরা হয়।

জনতার দেওয়ার বঙ্গবন্ধু পদবীটিও বাদ 

ঐতিহাসিক পেক্ষাপটে বাঙলার জনগণের দেওয়ার বঙ্গবন্ধু পদবীটিও বাদ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাস তুলে ধরতে গিয়ে দু-এক জায়গায় বঙ্গবন্ধুর নাম উল্লেখ করার প্রয়োজন হলেও পাঠ্যবইয়ে শেখ মুজিবুর রহমান নামের আগে বঙ্গবন্ধু শব্দটি নেই ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের কোনও বইয়ে। অথচ ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে পরিমার্জিত পাঠ্যবইয়ে জাতির পিতা বাদ দেওয়া হলেও রাখা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু পদবীটি।

২০২৫ শিক্ষাবর্ষের নবম-দশম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে ‘১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান’

অধ্যায়ের একাংশে লেখা ছিল— অবশেষে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আইয়ুব খান শেখ মুজিবুর রহমানকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। অন্য নেতাদেরও মুক্তি দেওয়া হয়। আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সেখান থেকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তবে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের কোনও বইয়ে এই ইতিহাস রাখা হয়নি এবং কোনও বইয়ে বঙ্গবন্ধু পদবীটিও রাখা হয়নি।

ছয় দফা আছে, বঙ্গবন্ধু নেই

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের পরিবর্তিত ও পরিমার্জিত পাঠ্যবইয়ে ছয় দফার প্রবক্তা হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম থাকলেও ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই ছয় দফার উল্লেখ রয়েছে। শুধু বাদ গেছে বঙ্গবন্ধুর নাম। 

২০২৫ শিক্ষাবর্ষের নবম ও দশম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ের ‘৬ দফা’ অধ্যায়ে শুরু হয় এভাবে— ‘ঐতিহাসিক ছয় দফার প্রবক্তা শেখ মুজিবুর রহমান।’

আগরতলা মামলায় ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের এই বইতে বঙ্গবন্ধুর কথা উল্লেখ থাকলেও ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের বইয়ে আগরতলা মামলা রয়েছে, বঙ্গবন্ধুর নাম নেই।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

তৈরি পোশাক রপ্তানিতে মন্দা: ঝুঁকির মুখে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান

নতুন পাঠ্যবইয়ে স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান

আপডেট সময় : ১১:০৫:৫৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ জানুয়ারী ২০২৬

২০২৬ শিক্ষাবর্ষের নতুন পাঠ্যবইয়ের অনলাইন সংস্করণ আপলোড করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। এতে ষষ্ঠ শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ পাঠ্যবইয়ে লেখা হয়েছে— ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। একইসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে আবারও জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। বইটিতে বাংলাদেশ সৃষ্টিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান যেমন অনুপস্থিত, তেমনি শেখ মুজিবুর রহমান নামের আগে বঙ্গবন্ধু শব্দটি বাদ দেওয়া হয়েছে। এবারের পাঠ্যবইয়ে ছয়দফা আছে, নেই বঙ্গবন্ধুর নাম। আগরতলা মামলাটি ঐতিহাসিক পেক্ষাপট রাখা হলেও বাদ দেওয়া হয়েছে বঙ্গবন্ধুর নামও।

এই পাঠ্যবইয়ে মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কিংবা নেতৃত্বদানকারী দল হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম স্থগিত) কোনও ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়নি। বাংলাদেশ সৃষ্টির পটভূমিতে এককভাবে জিয়াউর রহমানের ভূমিকাই তুলে ধরা হয়েছে।

রবিবার (২৮ ডিসেম্বর) এনসিটিবির ওয়েবসাইটে আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠ্যবই আপলোড শুরু হয়। এ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধানরঞ্জন রায় পোদ্দার পাঠ্যবইয়ের অনলাইন সংস্করণ ওয়েবসাইটে অবমুক্ত করেন।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, আগামী ১ জানুয়ারি থেকে শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়া হবে।

ওয়েবসাইটে আপলোড করা সংস্করণে ষষ্ট শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ের ‘বাংলাদেশ সৃষ্টির পটভূমি ও স্বাধীন বাংলাদেশ’ অধ্যায়ে ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কোনও অবদান আছে কি-না তা লেখা নেই।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং পরদিন শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে ২৭শে মার্চ আবার জিয়াউর রহমান ঘোষণা দেন লেখা হয়েছে। এই একটি বার বঙ্গবন্ধুর নাম লেখা হলেও বাংলাদেশের অভ্যুদয় অংশে তার নাম নেই। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হলেও দলটির নাম নেই।

বইটির পাঠ-৯ এর বাংলাদেশ সৃষ্টির পটভূমি ও স্বাধীন বাংলাদেশ অধ্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়। পাকিস্তান ছিল দুটি ভিন্ন অঞ্চল নিয়ে গঠিত। ভৌগোলিকভাবে দূর অবস্থিত ভূখণ্ডের পশ্চিম অংশটিকে বলা হতো, পশ্চিম পাকিস্তান আর পূর্ব অংশটিকে বলা হতো পূর্ব পাকিস্তান। তৎকালীন দুই অংশে বিভক্ত পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতা ছিল, পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে। তারাও নানাভাবে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে শোষণ করতো। একটা পর্যায়ে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে একত্র হয় পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা বুঝতে পারে পূর্ব পাকিস্তানের ওপর তাদের আধিপত্য আর ধরে রাখা সম্ভব নয়। ১৯৯১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আক্রমণ চালিয়ে গণহত্যা শুরু করে। তাদের বিরুদ্ধে বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ। ২৬ মার্চ তারিখে মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এরপর তিনি ২৭শে মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে আবারও স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ জন্ম নেয় একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র, বাংলাদেশ।’

ষষ্ঠ শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ের পাঠ-১০ এর স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুত্থান অধ্যায়ে লেখা হয়েছে, ‘১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা চালু হয়। কিন্তু ১৯৭৫ সালে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে শুরু হয় বাকশাল নামক একদলীয় শাসন। ১৯৭৯ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আবার বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করেন। ১৯৮২ সালে তৎকালীন সেনাবাহিনী-প্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে দেশে স্বৈরশাসন শুরু করেন। এতে জনগণের মধ্যে ক্ষোভ বৃদ্ধি পেতে থাকে। ছাত্রসমাজ, রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষ একজোট হয়ে গণতন্ত্র ফিরে পেতে আন্দোলন শুরু করে। টানা আন্দোলন ও সংগ্রামের পর ১৯৯০ সালে এক গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পতন হয়। বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র আবার যাত্রা শুরু করে।’

সপ্তম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় পাঠ্যবইয়ে ১০৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ছবি রয়েছে ওই অংশে। 

পাঠ্যবইটিতে বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া অংশে স্বাধীনতার পটভূমিতে বর্ণনায় একইভাবে বাদ দিয়ে শুধু জিয়াউর রহমানের অবদান তুলে ধরা হয়েছে। ছয় দফা, আগরতলা মামলার কথা উল্লেখ থাকলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম উল্লেখ করা হয়নি। পাঠ্যবইটির এই অংশে মুক্তিযুদ্ধকে জনযুদ্ধ বলা হলেও মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে বঙ্গবন্ধুকে রাখা হয়নি।

অষ্টম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় পাঠ্যবইয়ে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি অধ্যায়ে আওয়ামী লীগ অসহযোগ আন্দোলন গড়ে তোলে উল্লেখ করা হলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম উল্লেখ নেই।

বইটিতে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি শেষ অংশে লেখা হয়, এই পরিস্থিতিতে ভীত হয়ে ইয়াহিয়া খান ৬ মার্চ এক বেতার ভাষণে ২৫ মার্চ ঢাকায় পুনরায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন। শেখ মুজিবুর রহমান সে ঘোষণায় সন্তুষ্ট হতে পারেননি। এই পরিস্থিতিতে ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বৃহত্তর আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণার জন্য একটি জনসভার আয়োজন করা হয়।

পাঠ্যবইটিতে ৭ মার্চের ভাষণের বিষয়টি তুলে ধরা হয়। পাঠ-২ এর ‘৭ মার্চের ভাষণ’ অধ্যায়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের কিছু অংশ তুলে ধরে বর্ণনা করা হয়েছে। পুরো ভাষণটি পাঠ্যবইয়ে রাখা হয়নি। এই অধ্যায়ের একাংশে বলা হয়েছে, বক্তৃতার এক জায়গায় তিনি বলেছিলেন, ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গোড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো।’ 

বক্তৃতার শেষ অংশের উল্লেখ করে পাঠ্যই বইয়ে লেখা হয়, ‘‘শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে বাঙালিকে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত রাখা। বক্তৃতার শেষ অংশে ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ ঘোষণা দিয়ে তিনি স্পষ্টভাবেই স্বাধীনতার ডাক দেন।”

নবম ও দশম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় পাঠ্যবইয়ের ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা’ অংশে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের উল্লেখ করা হয়েছে। এতে লেখা হয়, ‘শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১০৯৭০ সালের তৎকালীন পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনের আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে।’ এরপর স্বাধীনতার পটভূমিতে ষষ্ঠ, সপ্তম, ও অষ্টম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ের মতোই মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণার বিষয়টি তুলে ধরা হয়।

জনতার দেওয়ার বঙ্গবন্ধু পদবীটিও বাদ 

ঐতিহাসিক পেক্ষাপটে বাঙলার জনগণের দেওয়ার বঙ্গবন্ধু পদবীটিও বাদ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাস তুলে ধরতে গিয়ে দু-এক জায়গায় বঙ্গবন্ধুর নাম উল্লেখ করার প্রয়োজন হলেও পাঠ্যবইয়ে শেখ মুজিবুর রহমান নামের আগে বঙ্গবন্ধু শব্দটি নেই ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের কোনও বইয়ে। অথচ ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে পরিমার্জিত পাঠ্যবইয়ে জাতির পিতা বাদ দেওয়া হলেও রাখা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু পদবীটি।

২০২৫ শিক্ষাবর্ষের নবম-দশম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে ‘১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান’

অধ্যায়ের একাংশে লেখা ছিল— অবশেষে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আইয়ুব খান শেখ মুজিবুর রহমানকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। অন্য নেতাদেরও মুক্তি দেওয়া হয়। আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সেখান থেকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তবে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের কোনও বইয়ে এই ইতিহাস রাখা হয়নি এবং কোনও বইয়ে বঙ্গবন্ধু পদবীটিও রাখা হয়নি।

ছয় দফা আছে, বঙ্গবন্ধু নেই

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের পরিবর্তিত ও পরিমার্জিত পাঠ্যবইয়ে ছয় দফার প্রবক্তা হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম থাকলেও ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই ছয় দফার উল্লেখ রয়েছে। শুধু বাদ গেছে বঙ্গবন্ধুর নাম। 

২০২৫ শিক্ষাবর্ষের নবম ও দশম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ের ‘৬ দফা’ অধ্যায়ে শুরু হয় এভাবে— ‘ঐতিহাসিক ছয় দফার প্রবক্তা শেখ মুজিবুর রহমান।’

আগরতলা মামলায় ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের এই বইতে বঙ্গবন্ধুর কথা উল্লেখ থাকলেও ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের বইয়ে আগরতলা মামলা রয়েছে, বঙ্গবন্ধুর নাম নেই।