ঢাকা ০১:১২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

নবীজির (সা.) জীবদ্দশায় ধর্মদ্রোহ ও ফিতনা: ইতিহাসের দর্পণে বিতর্কিত কিছু চরিত্র

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১১:০৭:২৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

ইসলামি ইতিহাসের প্রাথমিক যুগে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবদ্দশায় ধর্মদ্রোহ বা ইসলাম ত্যাগ করার ঘটনা খুব ব্যাপক আকারে দেখা না দিলেও, তিনি উম্মতকে এ ধরনের ফিতনা সম্পর্কে বারবার সতর্ক করে গেছেন। বিভিন্ন হাদিসে তিনি ধর্মত্যাগের ভয়াবহতা ও এর পরিণতির কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর সময়েই নবুয়তের মিথ্যা দাবিদার মুসাইলামা কাজ্জাব ও আসওয়াদ আনসীর মতো ব্যক্তিদের আবির্ভাব ঘটেছিল। মূলত যারা ধর্মত্যাগের পাশাপাশি ইসলামি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, যুদ্ধ বা নবীজি (সা.)-কে নিয়ে কটূক্তি করত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতো। তবে তাঁর ইন্তেকালের পর প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.)-এর শাসনামলে জাকাত অস্বীকারকারী ও মিথ্যা নবুয়ত দাবিদারদের বিরুদ্ধে যে ‘রিদ্দার যুদ্ধ’ সংঘটিত হয়েছিল, তার প্রেক্ষাপট ছিল আরও বিস্তৃত।

নবীজির (সা.) সময়ে ইসলাম গ্রহণ করার পর পুনরায় ধর্মত্যাগের পথে পা বাড়ানো কয়েকজন ব্যক্তির ঘটনা ইতিহাসে বিশেষভাবে আলোচিত। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশ। তিনি ছিলেন কুরাইশ বংশের বনু আসাদ গোত্রের সন্তান এবং নবীজির (সা.) ফুফাতো ভাই। মক্কায় কুরাইশদের অসহনীয় নির্যাতনের মুখে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশে সাহাবিরা যখন আবিসিনিয়ায় (বর্তমান ইথিওপিয়া) হিজরত করেন, তখন উবাইদুল্লাহও তাঁর স্ত্রী উম্মে হাবিবা (রা.)-কে নিয়ে সেখানে যান। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর তিনি জাগতিক মোহ ও মদ্যপানে আসক্ত হয়ে ইসলাম ত্যাগ করে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেন এবং সেই অবস্থাতেই তাঁর মৃত্যু হয়। ঐতিহাসিক ইবনুল জাওজি (রহ.)-সহ প্রায় সব মুসলিম ইতিহাসবিদ এই বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন।

ধর্মদ্রোহের আরেকটি নিষ্ঠুর ও আলোচিত ঘটনা ঘটেছিল উরাইনা গোত্রের একদল লোকের মাধ্যমে। হিজরি ষষ্ঠ সনে আরবের উকল ও উরাইনা গোত্রের আটজন ব্যক্তি মদিনায় এসে ইসলাম গ্রহণ করেন। মদিনার আবহাওয়া তাদের স্বাস্থ্যের অনুকূলে না হওয়ায় তারা অসুস্থ হয়ে পড়েন। রাসুলুল্লাহ (সা.) দয়াপরবশ হয়ে তাদের মদিনার উপকণ্ঠে জাকাতের উট চরে বেড়ানোর স্থানে যাওয়ার পরামর্শ দেন এবং চিকিৎসার জন্য উটের দুধ ও পেশাব পানের নির্দেশ দেন। সুস্থ হয়ে ওঠার পরই তারা চরম অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দেয়। তারা নবীজির (সা.) রাখাল ইয়াসার (রা.)-কে অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করে এবং জাকাতের উটগুলো লুট করে পালিয়ে যায়। একইসঙ্গে তারা ইসলাম ত্যাগ করে পুনরায় কুফরিতে লিপ্ত হয়। খবর পেয়ে নবীজি (সা.) তাদের পাকড়াও করতে ২০ জন সাহাবির একটি দল পাঠান। অপরাধীদের ধরে মদিনায় আনা হলে তাদের কৃতকর্মের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা হয়।

তবে ধর্মত্যাগের ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী নাম আব্দুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবি সারাহ। তিনি ছিলেন তৃতীয় খলিফা উসমান (রা.)-এর দুধ ভাই এবং ইসলামের প্রাথমিক যুগে মক্কায় ওহি লেখকের দায়িত্বও পালন করেছিলেন। শয়তানের প্ররোচনায় একপর্যায়ে তিনি মুরতাদ হয়ে মক্কায় পালিয়ে যান। মক্কা বিজয়ের দিন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় তাঁকে ক্ষমার অযোগ্য ঘোষণা করেছিলেন। তবে উসমান (রা.)-এর বিশেষ সুপারিশ ও নিরাপত্তার আবেদনে নবীজি (সা.) তাঁকে ক্ষমা করে দেন। পরবর্তীতে তিনি পুনরায় ইসলাম গ্রহণ করেন এবং অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে দ্বীনের খিদমতে আত্মনিয়োগ করেন। ইসলামের ইতিহাসে তিনি একজন সফল নৌ-সেনাপতি এবং মিসর বিজয়ের অন্যতম নায়ক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। আমৃত্যু তিনি ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে অবিচল ছিলেন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

জুলাই গণহত্যা: সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন, বিচার শুরু

নবীজির (সা.) জীবদ্দশায় ধর্মদ্রোহ ও ফিতনা: ইতিহাসের দর্পণে বিতর্কিত কিছু চরিত্র

আপডেট সময় : ১১:০৭:২৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

ইসলামি ইতিহাসের প্রাথমিক যুগে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবদ্দশায় ধর্মদ্রোহ বা ইসলাম ত্যাগ করার ঘটনা খুব ব্যাপক আকারে দেখা না দিলেও, তিনি উম্মতকে এ ধরনের ফিতনা সম্পর্কে বারবার সতর্ক করে গেছেন। বিভিন্ন হাদিসে তিনি ধর্মত্যাগের ভয়াবহতা ও এর পরিণতির কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর সময়েই নবুয়তের মিথ্যা দাবিদার মুসাইলামা কাজ্জাব ও আসওয়াদ আনসীর মতো ব্যক্তিদের আবির্ভাব ঘটেছিল। মূলত যারা ধর্মত্যাগের পাশাপাশি ইসলামি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, যুদ্ধ বা নবীজি (সা.)-কে নিয়ে কটূক্তি করত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতো। তবে তাঁর ইন্তেকালের পর প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.)-এর শাসনামলে জাকাত অস্বীকারকারী ও মিথ্যা নবুয়ত দাবিদারদের বিরুদ্ধে যে ‘রিদ্দার যুদ্ধ’ সংঘটিত হয়েছিল, তার প্রেক্ষাপট ছিল আরও বিস্তৃত।

নবীজির (সা.) সময়ে ইসলাম গ্রহণ করার পর পুনরায় ধর্মত্যাগের পথে পা বাড়ানো কয়েকজন ব্যক্তির ঘটনা ইতিহাসে বিশেষভাবে আলোচিত। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশ। তিনি ছিলেন কুরাইশ বংশের বনু আসাদ গোত্রের সন্তান এবং নবীজির (সা.) ফুফাতো ভাই। মক্কায় কুরাইশদের অসহনীয় নির্যাতনের মুখে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশে সাহাবিরা যখন আবিসিনিয়ায় (বর্তমান ইথিওপিয়া) হিজরত করেন, তখন উবাইদুল্লাহও তাঁর স্ত্রী উম্মে হাবিবা (রা.)-কে নিয়ে সেখানে যান। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর তিনি জাগতিক মোহ ও মদ্যপানে আসক্ত হয়ে ইসলাম ত্যাগ করে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেন এবং সেই অবস্থাতেই তাঁর মৃত্যু হয়। ঐতিহাসিক ইবনুল জাওজি (রহ.)-সহ প্রায় সব মুসলিম ইতিহাসবিদ এই বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন।

ধর্মদ্রোহের আরেকটি নিষ্ঠুর ও আলোচিত ঘটনা ঘটেছিল উরাইনা গোত্রের একদল লোকের মাধ্যমে। হিজরি ষষ্ঠ সনে আরবের উকল ও উরাইনা গোত্রের আটজন ব্যক্তি মদিনায় এসে ইসলাম গ্রহণ করেন। মদিনার আবহাওয়া তাদের স্বাস্থ্যের অনুকূলে না হওয়ায় তারা অসুস্থ হয়ে পড়েন। রাসুলুল্লাহ (সা.) দয়াপরবশ হয়ে তাদের মদিনার উপকণ্ঠে জাকাতের উট চরে বেড়ানোর স্থানে যাওয়ার পরামর্শ দেন এবং চিকিৎসার জন্য উটের দুধ ও পেশাব পানের নির্দেশ দেন। সুস্থ হয়ে ওঠার পরই তারা চরম অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দেয়। তারা নবীজির (সা.) রাখাল ইয়াসার (রা.)-কে অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করে এবং জাকাতের উটগুলো লুট করে পালিয়ে যায়। একইসঙ্গে তারা ইসলাম ত্যাগ করে পুনরায় কুফরিতে লিপ্ত হয়। খবর পেয়ে নবীজি (সা.) তাদের পাকড়াও করতে ২০ জন সাহাবির একটি দল পাঠান। অপরাধীদের ধরে মদিনায় আনা হলে তাদের কৃতকর্মের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা হয়।

তবে ধর্মত্যাগের ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী নাম আব্দুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবি সারাহ। তিনি ছিলেন তৃতীয় খলিফা উসমান (রা.)-এর দুধ ভাই এবং ইসলামের প্রাথমিক যুগে মক্কায় ওহি লেখকের দায়িত্বও পালন করেছিলেন। শয়তানের প্ররোচনায় একপর্যায়ে তিনি মুরতাদ হয়ে মক্কায় পালিয়ে যান। মক্কা বিজয়ের দিন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় তাঁকে ক্ষমার অযোগ্য ঘোষণা করেছিলেন। তবে উসমান (রা.)-এর বিশেষ সুপারিশ ও নিরাপত্তার আবেদনে নবীজি (সা.) তাঁকে ক্ষমা করে দেন। পরবর্তীতে তিনি পুনরায় ইসলাম গ্রহণ করেন এবং অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে দ্বীনের খিদমতে আত্মনিয়োগ করেন। ইসলামের ইতিহাসে তিনি একজন সফল নৌ-সেনাপতি এবং মিসর বিজয়ের অন্যতম নায়ক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। আমৃত্যু তিনি ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে অবিচল ছিলেন।