ঢাকা ০৩:৪১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও আগামীর গণতন্ত্র: ইতিহাসের শিক্ষা ও বর্তমান বাস্তবতা

বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং নাগরিকের মত প্রকাশের অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের এক কাঠামোগত সংকট বিদ্যমান। ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লেখক অরুন্ধতী রায়ের অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যম কার্যালয়ে হামলা ও সাংবাদিকদের হেনস্তার ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, ক্ষমতার পালাবদল হলেও মুক্ত সাংবাদিকতার পরিবেশ এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা সবসময়ই সরকারের জন্য হিতে বিপরীত বা ‘বুমেরাং’ হয়ে দাঁড়ায়।

বিশিষ্ট কলামিস্ট ও সাংবাদিক আমীন আল রশীদ তার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন, অরুন্ধতী রায়ের মতো লেখককে কথা বলতে না দিয়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি যতটা ক্ষুণ্ণ করেছিল, তাকে কথা বলতে দিলে তার সিকিভাগ ক্ষতিও হতো না। বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও ‘মব ভায়োলেন্স’ বা বিশৃঙ্খল জনতা কর্তৃক গণমাধ্যমে হামলা ও সাংবাদিকদের হেনস্তা হওয়ার ঘটনাগুলো স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

২০১৯ সালের মার্চ মাসে ঢাকায় প্রখ্যাত লেখিকা অরুন্ধতী রায়ের একটি আলোচনা অনুষ্ঠান পুলিশ শেষ মুহূর্তে বাতিল করে দেয়। কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা ছাড়াই নেওয়া সেই সিদ্ধান্তের ফলে বিষয়টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক নেতিবাচক প্রচার পায়। এই ঘটনার সাত বছর পর এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পরেও দেশের সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা। সম্প্রতি সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) এক সংলাপে বক্তারা স্পষ্ট করেছেন যে, গণমাধ্যমের ওপর সহিংসতা বেড়ে যাওয়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুরুতর ব্যর্থতারই প্রতিফলন। সেখানে প্রশ্ন তোলা হয়, মত প্রকাশের স্বাধীনতা কি এখন নাগরিকদের হাতে নাকি আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া উচ্ছৃঙ্খল জনতা বা ‘মব’-এর হাতে?

একই সময়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় দেশের শীর্ষস্থানীয় সম্পাদকরা গণমাধ্যমের সুরক্ষা নিয়ে তাদের আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম এবং নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেছেন যে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ছাড়া প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীও উল্লেখ করেছেন যে, ৫ আগস্টের পর গণমাধ্যম স্বাধীন হলেও মব ভায়োলেন্সের কারণে সাংবাদিকরা অনেক সময় সাহসের সঙ্গে কাজ করতে পারছেন না। বিশেষ করে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলা এবং নূরুল কবীরের মতো সম্পাদককে হেনস্তা করার ঘটনাগুলো একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অশনিসংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী মহল মনে করেন, অতীতে যারা গণমাধ্যমের গলা টিপে ধরেছিল, আজ তারা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। আগামী জাতীয় নির্বাচনে যদি বিএনপি ক্ষমতায় আসে, তবে তারা যেন অতীতের সেই ভুল থেকে শিক্ষা নেয়—এটাই এখন সংবাদকর্মীদের প্রধান প্রত্যাশা। তারেক রহমানকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, কথা বলতে দিলে সরকারের যে সামান্য সমালোচনা হওয়ার ঝুঁকি থাকে, কথা বলতে না দিলে বা কণ্ঠরোধ করলে তার কয়েক গুণ বেশি ক্ষতি ও বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। নদীকে স্বাভাবিকভাবে চলতে না দিলে যেমন তা রুদ্ররূপ ধারণ করে, জনমতের ক্ষেত্রেও এই ধ্রুব সত্যটি প্রযোজ্য। শান্তি ও অগ্রগতির জন্য তাই গণমাধ্যমের স্বাধীন ও নিরাপদ বিচরণ নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

এলপিজি আমদানিতে বিশেষ ঋণসুবিধা: ২৭০ দিন পর্যন্ত বাকিতে আনার সুযোগ

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও আগামীর গণতন্ত্র: ইতিহাসের শিক্ষা ও বর্তমান বাস্তবতা

আপডেট সময় : ০২:০০:৩১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং নাগরিকের মত প্রকাশের অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের এক কাঠামোগত সংকট বিদ্যমান। ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লেখক অরুন্ধতী রায়ের অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যম কার্যালয়ে হামলা ও সাংবাদিকদের হেনস্তার ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, ক্ষমতার পালাবদল হলেও মুক্ত সাংবাদিকতার পরিবেশ এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা সবসময়ই সরকারের জন্য হিতে বিপরীত বা ‘বুমেরাং’ হয়ে দাঁড়ায়।

বিশিষ্ট কলামিস্ট ও সাংবাদিক আমীন আল রশীদ তার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন, অরুন্ধতী রায়ের মতো লেখককে কথা বলতে না দিয়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি যতটা ক্ষুণ্ণ করেছিল, তাকে কথা বলতে দিলে তার সিকিভাগ ক্ষতিও হতো না। বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও ‘মব ভায়োলেন্স’ বা বিশৃঙ্খল জনতা কর্তৃক গণমাধ্যমে হামলা ও সাংবাদিকদের হেনস্তা হওয়ার ঘটনাগুলো স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

২০১৯ সালের মার্চ মাসে ঢাকায় প্রখ্যাত লেখিকা অরুন্ধতী রায়ের একটি আলোচনা অনুষ্ঠান পুলিশ শেষ মুহূর্তে বাতিল করে দেয়। কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা ছাড়াই নেওয়া সেই সিদ্ধান্তের ফলে বিষয়টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক নেতিবাচক প্রচার পায়। এই ঘটনার সাত বছর পর এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পরেও দেশের সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা। সম্প্রতি সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) এক সংলাপে বক্তারা স্পষ্ট করেছেন যে, গণমাধ্যমের ওপর সহিংসতা বেড়ে যাওয়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুরুতর ব্যর্থতারই প্রতিফলন। সেখানে প্রশ্ন তোলা হয়, মত প্রকাশের স্বাধীনতা কি এখন নাগরিকদের হাতে নাকি আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া উচ্ছৃঙ্খল জনতা বা ‘মব’-এর হাতে?

একই সময়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় দেশের শীর্ষস্থানীয় সম্পাদকরা গণমাধ্যমের সুরক্ষা নিয়ে তাদের আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম এবং নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেছেন যে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ছাড়া প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীও উল্লেখ করেছেন যে, ৫ আগস্টের পর গণমাধ্যম স্বাধীন হলেও মব ভায়োলেন্সের কারণে সাংবাদিকরা অনেক সময় সাহসের সঙ্গে কাজ করতে পারছেন না। বিশেষ করে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলা এবং নূরুল কবীরের মতো সম্পাদককে হেনস্তা করার ঘটনাগুলো একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অশনিসংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী মহল মনে করেন, অতীতে যারা গণমাধ্যমের গলা টিপে ধরেছিল, আজ তারা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। আগামী জাতীয় নির্বাচনে যদি বিএনপি ক্ষমতায় আসে, তবে তারা যেন অতীতের সেই ভুল থেকে শিক্ষা নেয়—এটাই এখন সংবাদকর্মীদের প্রধান প্রত্যাশা। তারেক রহমানকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, কথা বলতে দিলে সরকারের যে সামান্য সমালোচনা হওয়ার ঝুঁকি থাকে, কথা বলতে না দিলে বা কণ্ঠরোধ করলে তার কয়েক গুণ বেশি ক্ষতি ও বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। নদীকে স্বাভাবিকভাবে চলতে না দিলে যেমন তা রুদ্ররূপ ধারণ করে, জনমতের ক্ষেত্রেও এই ধ্রুব সত্যটি প্রযোজ্য। শান্তি ও অগ্রগতির জন্য তাই গণমাধ্যমের স্বাধীন ও নিরাপদ বিচরণ নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।