ঢাকা ০১:৪৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

পাসপোর্ট অধিদফতরে রোহিঙ্গা সিন্ডিকেট; ধরাছোঁয়ার বাইরে মূল হোতারা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৩:৪৪:৪৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ১২ বার পড়া হয়েছে
ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদফতরের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে কয়েক লাখ টাকার ‘প্যাকেজ ডিলে’ বাংলাদেশের পাসপোর্ট হাতিয়ে নিচ্ছে রোহিঙ্গারা, যা বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি ও পাসপোর্টের মানকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

দেশের সাধারণ নাগরিকরা যখন একটি পাসপোর্ট পেতে মাসের পর মাস ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন, তখন কক্সবাজারের ক্যাম্প থেকে আসা রোহিঙ্গারা অতি সহজেই বাংলাদেশি পাসপোর্ট পেয়ে যাচ্ছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর উত্তরা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসসহ বিভিন্ন কার্যালয়ে একটি শক্তিশালী দালাল চক্র ও অসাধু কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে এই ‘রোহিঙ্গা পাসপোর্ট সিন্ডিকেট’ গড়ে উঠেছে। প্রতিটি পাসপোর্টের বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি উত্তরা অফিস থেকে ১১৮ জন রোহিঙ্গাকে পাসপোর্ট দেওয়ার একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এলেও মূল দায়ীদের কঠোর শাস্তির বদলে ‘লঘুদণ্ড’ দিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

তদন্ত ও নামমাত্র শাস্তি: পাসপোর্ট অধিদফতরের নিজস্ব তদন্তে ১১৮ জন রোহিঙ্গার পাসপোর্ট পাওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, উত্তরার ঠিকানা ব্যবহারকারী এই ব্যক্তিরা মূলত রোহিঙ্গা। এই অপরাধে উপ-সহকারী পরিচালক নিগার সুলতানাকে মাত্র এক বছরের জন্য বার্ষিক বর্ধিত বেতন স্থগিত এবং সুপারিনটেনডেন্ট মো. আবুল হোসেনকে কেবল ‘তিরস্কার’ করা হয়েছে। অথচ আবুল হোসেন এর আগে কুয়েত দূতাবাসে থাকাকালীনও একই ধরনের অপরাধে অভিযুক্ত হয়েছিলেন। বার বার একই গুরুতর অপরাধ করা সত্ত্বেও কোনো ফৌজদারি ব্যবস্থা না নিয়ে তাঁকে কেবল বিভাগীয় শাস্তির আড়ালে দায়মুক্তি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

যেভাবে চলে ‘প্যাকেজ ডিল’: অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট ইস্যু করার ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট চেইন মেইনটেইন করা হয়:

  • আবেদন গ্রহণ: আবেদনকারীর ভাষা বা নথিপত্র সন্দেহজনক হলেও মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তা গ্রহণ করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।
  • ভেরিফিকেশন জালিয়াতি: পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) নেতিবাচক রিপোর্ট আসা সত্ত্বেও ‘ম্যানুয়াল রিভিউ’ এর মাধ্যমে আবেদনগুলো অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়।
  • সার্ভার সিন্ডিকেট: দিয়াবাড়িতে অবস্থিত মূল সার্ভারে তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা ৩০ জন কর্মকর্তার একটি অংশ এই সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত। ফলে সার্ভারে ভুয়া নথি শনাক্ত হলেও আবেদনগুলো আটকানো হয় না।

প্রভাবশালীদের ছত্রছায়া: অভিযোগ রয়েছে, এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা অধিদফতরের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। পরিচালক মো. সাইদুর রহমান, পরিচালক নাদিরা আক্তার এবং অতিরিক্ত মহাপরিচালক এ টি এম আবু আসাদের মতো প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের নাম এই সিন্ডিকেটের আশ্রয়দাতা হিসেবে আলোচনায় এসেছে। রাজনৈতিক পালাবদলের সাথে সাথে এসব কর্মকর্তা নিজেদের পরিচয় পরিবর্তন করে প্রভাব খাটিয়ে চলেছেন। ফরেনসিক তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত পাসপোর্ট ইস্যু হওয়া ফাইলগুলো যাচাই করলে এই দুর্নীতির প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরানে মুক্তির ডাক: পাহলভির আশাবাদ, জনবিক্ষোভের নতুন পর্যায় নতুন নিউজ

পাসপোর্ট অধিদফতরে রোহিঙ্গা সিন্ডিকেট; ধরাছোঁয়ার বাইরে মূল হোতারা

আপডেট সময় : ০৩:৪৪:৪৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ ডিসেম্বর ২০২৫
ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদফতরের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে কয়েক লাখ টাকার ‘প্যাকেজ ডিলে’ বাংলাদেশের পাসপোর্ট হাতিয়ে নিচ্ছে রোহিঙ্গারা, যা বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি ও পাসপোর্টের মানকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

দেশের সাধারণ নাগরিকরা যখন একটি পাসপোর্ট পেতে মাসের পর মাস ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন, তখন কক্সবাজারের ক্যাম্প থেকে আসা রোহিঙ্গারা অতি সহজেই বাংলাদেশি পাসপোর্ট পেয়ে যাচ্ছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর উত্তরা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসসহ বিভিন্ন কার্যালয়ে একটি শক্তিশালী দালাল চক্র ও অসাধু কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে এই ‘রোহিঙ্গা পাসপোর্ট সিন্ডিকেট’ গড়ে উঠেছে। প্রতিটি পাসপোর্টের বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি উত্তরা অফিস থেকে ১১৮ জন রোহিঙ্গাকে পাসপোর্ট দেওয়ার একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এলেও মূল দায়ীদের কঠোর শাস্তির বদলে ‘লঘুদণ্ড’ দিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

তদন্ত ও নামমাত্র শাস্তি: পাসপোর্ট অধিদফতরের নিজস্ব তদন্তে ১১৮ জন রোহিঙ্গার পাসপোর্ট পাওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, উত্তরার ঠিকানা ব্যবহারকারী এই ব্যক্তিরা মূলত রোহিঙ্গা। এই অপরাধে উপ-সহকারী পরিচালক নিগার সুলতানাকে মাত্র এক বছরের জন্য বার্ষিক বর্ধিত বেতন স্থগিত এবং সুপারিনটেনডেন্ট মো. আবুল হোসেনকে কেবল ‘তিরস্কার’ করা হয়েছে। অথচ আবুল হোসেন এর আগে কুয়েত দূতাবাসে থাকাকালীনও একই ধরনের অপরাধে অভিযুক্ত হয়েছিলেন। বার বার একই গুরুতর অপরাধ করা সত্ত্বেও কোনো ফৌজদারি ব্যবস্থা না নিয়ে তাঁকে কেবল বিভাগীয় শাস্তির আড়ালে দায়মুক্তি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

যেভাবে চলে ‘প্যাকেজ ডিল’: অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট ইস্যু করার ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট চেইন মেইনটেইন করা হয়:

  • আবেদন গ্রহণ: আবেদনকারীর ভাষা বা নথিপত্র সন্দেহজনক হলেও মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তা গ্রহণ করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।
  • ভেরিফিকেশন জালিয়াতি: পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) নেতিবাচক রিপোর্ট আসা সত্ত্বেও ‘ম্যানুয়াল রিভিউ’ এর মাধ্যমে আবেদনগুলো অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়।
  • সার্ভার সিন্ডিকেট: দিয়াবাড়িতে অবস্থিত মূল সার্ভারে তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা ৩০ জন কর্মকর্তার একটি অংশ এই সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত। ফলে সার্ভারে ভুয়া নথি শনাক্ত হলেও আবেদনগুলো আটকানো হয় না।

প্রভাবশালীদের ছত্রছায়া: অভিযোগ রয়েছে, এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা অধিদফতরের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। পরিচালক মো. সাইদুর রহমান, পরিচালক নাদিরা আক্তার এবং অতিরিক্ত মহাপরিচালক এ টি এম আবু আসাদের মতো প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের নাম এই সিন্ডিকেটের আশ্রয়দাতা হিসেবে আলোচনায় এসেছে। রাজনৈতিক পালাবদলের সাথে সাথে এসব কর্মকর্তা নিজেদের পরিচয় পরিবর্তন করে প্রভাব খাটিয়ে চলেছেন। ফরেনসিক তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত পাসপোর্ট ইস্যু হওয়া ফাইলগুলো যাচাই করলে এই দুর্নীতির প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।