মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ক্ষমতাসীন জান্তা বাহিনী, আরাকান আর্মি (এএ) এবং বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে চলমান লড়াই এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। রাখাইনের মংডু টাউনশিপ এলাকায় জান্তা বাহিনীর তীব্র বিমান হামলার পাশাপাশি স্থলভাগে আরাকান আর্মির সঙ্গে আরসা (ARSA), আরএসও (RSO) এবং নবী হোসেন বাহিনীর মধ্যে রক্তক্ষয়ী ত্রিমুখী সংঘর্ষ চলছে। ওপার থেকে ছোড়া গুলি ও গোলার আঘাতে বাংলাদেশের সীমান্ত উপজেলা টেকনাফে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গুলিতে গুরুতর আহত এক শিশু বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুশয্যায় রয়েছে।
নাফ নদ পেরিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টাকালে যৌথ বাহিনীর হাতে ৫৩ জন সশস্ত্র সদস্য আটক হয়েছেন। সীমান্তে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা পুরোপুরি ব্যাহত হচ্ছে এবং ঘরবাড়িতে বোমার কম্পন অনুভূত হচ্ছে।
টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের তেচ্ছিব্রিজ গ্রামে গতকাল সকালে নিজ বাড়ির উঠানে খেলার সময় ৯ বছরের শিশু হুজাইফা আফনান আকস্মিক গুলিবিদ্ধ হয়। গুরুতর অবস্থায় তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশিদ জানিয়েছেন, বুলেটটি শিশুটির মুখ দিয়ে ঢুকে সরাসরি মস্তিষ্কে আঘাত করেছে, যার ফলে তার অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। এই ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ জনতা কক্সবাজার-টেকনাফ সড়ক অবরোধ করলে বিজিবি, পুলিশ ও সেনাবাহিনী গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
সীমান্তের উত্তপ্ত পরিস্থিতি ও আটক অভিযান:
- সশস্ত্র সদস্যদের অনুপ্রবেশ: বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জানিয়েছে, রাখাইনে যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে নাফ নদ পার হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় সশস্ত্র গোষ্ঠীর ৫৩ সদস্যকে আটক করা হয়েছে। আটককৃতদের মধ্যে বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ছিল। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাদের টেকনাফ থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
- সীমান্তে গোলাবর্ষণ ও জনজীবন: স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দারা জানিয়েছেন, গত তিন দিন ধরে হোয়াইক্যং ও লম্বাবিল সীমান্তের ওপারে দিনরাত অবিরাম গোলাগুলি ও বোমা বিস্ফোরণ চলছে। ওপার থেকে আসা গুলি লোকজনের ঘরবাড়ি, চিংড়ি ঘের ও ফসলি জমিতে এসে পড়ছে। তীব্র বিস্ফোরণের শব্দে সীমান্তবর্তী ঘরবাড়ি কেঁপে উঠছে, যার ফলে সাধারণ মানুষ ঘরের বাইরে বের হতে ভয় পাচ্ছেন।
- নিরাপত্তা জোরদার: উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নাফ নদ ও সীমান্তজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে বিজিবিসহ যৌথ বাহিনী। উখিয়া-৬৪ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল জহিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, সীমান্তের প্রতিটি পয়েন্টে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে যাতে কোনোভাবেই নতুন করে অনুপ্রবেশ না ঘটে।
টেকনাফ উপজেলা প্রশাসন সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা করতে এবং সতর্ক থাকতে বিশেষ পরামর্শ দিয়েছে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ এই গৃহযুদ্ধ এখন সরাসরি বাংলাদেশের সীমান্ত জনপদের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জান্তা ও বিদ্রোহীদের এই মরণপণ লড়াই দীর্ঘায়িত হলে সীমান্ত পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে এবং মানবিক সংকটের ঝুঁকি বাড়বে।
রিপোর্টারের নাম 






















