ঢাকা ০৬:০৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

যে জাতিকে ভূমিকম্প দিয়ে ধ্বংস করেছিলেন আল্লাহ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১১:৩৮:২৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ৩২ বার পড়া হয়েছে

আজকের পৃথিবীতে ঝড়, জলোচ্ছ্বাস কিংবা ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো মানুষের প্রকৃত সীমাবদ্ধতা স্মরণ করিয়ে দেয়। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে, এই ঘটনাগুলো কখনো মুমিনদের জন্য পরীক্ষা, আবার কখনো পাপ ও সীমালঙ্ঘনে নিমজ্জিত মানুষের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা।

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেছেন যে তিনি তাঁর বান্দাদের ভয়, ক্ষুধা, সম্পদ, জীবনহানির পরীক্ষার মাধ্যমে পরখ করবেন। এই পরীক্ষায় যারা ধৈর্য ধরে ‘আমরা আল্লাহরই জন্য, এবং তাঁর দিকেই ফিরে যাব’ বলে ঘোষণা দেন, তাদের জন্য সুসংবাদ রয়েছে (সুরা বাকারা: ১৫৫–১৫৬)।


লূত (আ.)-এর জাতির সীমালঙ্ঘন ও অবক্ষয়ইতিহাসে এমন বহু জাতির দৃষ্টান্ত রয়েছে যারা সতর্কবার্তা সত্ত্বেও অপকর্ম থেকে ফিরে আসেনি এবং ফলস্বরূপ ভয়ংকর শাস্তির মুখোমুখি হয়েছে। এদের মধ্যে অন্যতম ছিল হজরত লূত (আ.)-এর জাতি, যাদের ধ্বংস ঘটেছিল এক প্রচণ্ড ভূমিকম্প ও আকাশ থেকে নিক্ষিপ্ত পাথরের মাধ্যমে।আল্লাহ এই জাতিকে উর্বর ভূমি, প্রচুর সম্পদ এবং প্রাচুর্যময় জীবন দান করেছিলেন। কিন্তু এই সমৃদ্ধি তাদের আল্লাহর বিধান ভুলিয়ে দিয়ে সীমালঙ্ঘনকে তাদের জীবনের অংশে পরিণত করে। এই জাতিই ছিল পৃথিবীর প্রথম যারা সমকামিতার মতো অশ্লীল কাজ শুরু করেছিল। এ প্রসঙ্গে কুরআনে আল্লাহ বলেছেন: ‘তোমরা এমন অশ্লীলতা করছ যা তোমাদের পূর্বে কেউ করেনি। তোমরা মেয়েদের ছেড়ে পুরুষদের কাছে যাচ, তোমরা সীমালঙ্ঘনকারী জাতি।’ (সুরা আ’রাফ: ৮০–৮১)।

লূত (আ.) বারবার তাদের এই পাপাচার আল্লাহর কঠিন শাস্তি ডেকে আনবে বলে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু জাতি তাকে উপহাস করত, তার কথা উপেক্ষা করত, এমনকি তার স্ত্রীও পাপীদের পক্ষ নিয়েছিল।


ফেরেশতাদের আগমন ও চূড়ান্ত সতর্কবার্তা

একদিন ফেরেশতাত্রয়—জিব্রাইল (আ.), ইস্রাফিল (আ.) এবং মিকাইল (আ.)—সুদর্শন যুবকের রূপে লূত (আ.)-এর এলাকায় আসেন। লূত (আ.) বুঝতে পেরেছিলেন তার জাতির পাপাচারী পুরুষেরা অতিথিদের ক্ষতি করতে পারে, তাই তিনি গোপনে তাদের আশ্রয় দেন। কিন্তু তার স্ত্রী পাপী সম্প্রদায়ের কাছে এই খবর ফাঁস করে দেয়। অশ্লীল উদ্দেশ্যে লূত (আ.)-এর ঘর ঘিরে ফেলে তারা।

তখন ফেরেশতারা নিজেদের পরিচয় দিয়ে লূত (আ.)-কে আশ্বস্ত করেন এবং বলেন: ‘হে লূত! আমরা তোমার পালনকর্তার প্রেরিত ফেরেশতা। এরা তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। তুমি রাতের কিছু অংশ বাকি থাকতে তোমার পরিবার নিয়ে বেরিয়ে পড়ো। কেউ পিছনে তাকাবে না। তোমার স্ত্রীও পাপীদের সাথে শাস্তির আওতাভুক্ত হবে।’ (সূরা হুদ: ১১)। এরপর জিব্রাইল (আ.) এক আঘাতে পাপী দলটির চোখ অন্ধ করে দিলে তারা আতঙ্কিত হয়ে ছুটোছুটি করতে থাকে, আর লূত (আ.) পরিবার নিয়ে এলাকা ত্যাগ করেন।


ধ্বংসের ঝড় এবং ইতিহাসের ভয়ংকরতম শাস্তি

লূত (আ.) তার পরিবারকে নিয়ে নিরাপদ দূরত্বে পৌঁছানোর পরই অবাধ্য জাতির ওপর আল্লাহর ঘোষিত পরিণতি নেমে আসে। গভীর ভোরের অন্ধকারে প্রথমে প্রবল ভূমিকম্পে সমগ্র জনপদ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।

এরপর জিব্রাইল (আ.) তার ডানার শক্তি দিয়ে পুরো নগরীটিকে ভিত্তিসহ আকাশে তুলে নেন। নগরীটিকে এত উঁচুতে উঠানো হয় যে প্রথম আসমানের ফেরেশতারাও জনপদের পশুপাখির ডাক শুনতে পান। তারপর আচমকা সেই নগরীটিকে উল্টো করে ভূমির ওপর ফেলে দেওয়া হয়।

শাস্তি এখানেই শেষ হয়নি; নগরী পতনের পর আকাশ থেকে নেমে আসে পাথরের বৃষ্টি, যেখানে প্রতিটি পাপীর নাম লেখা ছিল। শহরের বাইরে থাকা লোকেরাও এই শাস্তি থেকে রেহাই পায়নি। সবশেষে সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত এলাকায় দূষিত, অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি প্রবাহিত করা হয়, যার ফলে পুরো অঞ্চলটি হয়ে ওঠে নিঃজীব ও অনুর্বর। এ বিষয়ে আল্লাহ কুরআনে বলেন: ‘আমি জনপদটিকে উল্টে দিয়েছি এবং তাদের ওপর স্তরে স্তরে পাথর বর্ষণ করেছি।’ (সূরা হুদ: ৮২)।


ডেড সি বা মৃত সাগরে ধ্বংসের স্মৃতি

হজরত লূত (আ.)-এর জাতির সেই ভয়াবহ ধ্বংসভূমি আজ পরিচিত বাহরে মাইয়েত বা ডেড সি (Dead Sea) নামে। এটি বর্তমানে ফিলিস্তিন ও জর্দানের মাঝে বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। পৃথিবীর অন্যতম সবচেয়ে নিচু স্থানে অবস্থিত এই সাগরের পানিতে রয়েছে অস্বাভাবিক পরিমাণে লবণ ও খনিজ, যা স্বাভাবিক পানির চেয়ে বহু গুণ বেশি ঘন।

এই অতিরিক্ত ঘনত্বের কারণে এখানে কোনো মাছ, ব্যাঙ বা জলজ প্রাণী বেঁচে থাকতে পারে না, তাই একে ‘মৃত সাগর’ বলা হয়। এই পানি এত ভারী যে মানুষ সহজেই এর ওপর ভাসতে পারে। চারপাশে প্রাণের কোনো চিহ্ন নেই। বহু গবেষক মনে করেন, এই এলাকার অস্বাভাবিক ভূস্তর, অতিলবণাক্ত পানি এবং চিরপ্রাণহীন প্রকৃতি সেই ভয়ংকর ধ্বংসযজ্ঞের চিরস্থায়ী স্মারক হিসেবে আজও দাঁড়িয়ে আছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

বিপিএল মহারণ: আজ সিলেট-রংপুর, ঢাকা-রাজশাহী; টিভিতে কখন দেখবেন?

যে জাতিকে ভূমিকম্প দিয়ে ধ্বংস করেছিলেন আল্লাহ

আপডেট সময় : ১১:৩৮:২৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২৫

আজকের পৃথিবীতে ঝড়, জলোচ্ছ্বাস কিংবা ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো মানুষের প্রকৃত সীমাবদ্ধতা স্মরণ করিয়ে দেয়। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে, এই ঘটনাগুলো কখনো মুমিনদের জন্য পরীক্ষা, আবার কখনো পাপ ও সীমালঙ্ঘনে নিমজ্জিত মানুষের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা।

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেছেন যে তিনি তাঁর বান্দাদের ভয়, ক্ষুধা, সম্পদ, জীবনহানির পরীক্ষার মাধ্যমে পরখ করবেন। এই পরীক্ষায় যারা ধৈর্য ধরে ‘আমরা আল্লাহরই জন্য, এবং তাঁর দিকেই ফিরে যাব’ বলে ঘোষণা দেন, তাদের জন্য সুসংবাদ রয়েছে (সুরা বাকারা: ১৫৫–১৫৬)।


লূত (আ.)-এর জাতির সীমালঙ্ঘন ও অবক্ষয়ইতিহাসে এমন বহু জাতির দৃষ্টান্ত রয়েছে যারা সতর্কবার্তা সত্ত্বেও অপকর্ম থেকে ফিরে আসেনি এবং ফলস্বরূপ ভয়ংকর শাস্তির মুখোমুখি হয়েছে। এদের মধ্যে অন্যতম ছিল হজরত লূত (আ.)-এর জাতি, যাদের ধ্বংস ঘটেছিল এক প্রচণ্ড ভূমিকম্প ও আকাশ থেকে নিক্ষিপ্ত পাথরের মাধ্যমে।আল্লাহ এই জাতিকে উর্বর ভূমি, প্রচুর সম্পদ এবং প্রাচুর্যময় জীবন দান করেছিলেন। কিন্তু এই সমৃদ্ধি তাদের আল্লাহর বিধান ভুলিয়ে দিয়ে সীমালঙ্ঘনকে তাদের জীবনের অংশে পরিণত করে। এই জাতিই ছিল পৃথিবীর প্রথম যারা সমকামিতার মতো অশ্লীল কাজ শুরু করেছিল। এ প্রসঙ্গে কুরআনে আল্লাহ বলেছেন: ‘তোমরা এমন অশ্লীলতা করছ যা তোমাদের পূর্বে কেউ করেনি। তোমরা মেয়েদের ছেড়ে পুরুষদের কাছে যাচ, তোমরা সীমালঙ্ঘনকারী জাতি।’ (সুরা আ’রাফ: ৮০–৮১)।

লূত (আ.) বারবার তাদের এই পাপাচার আল্লাহর কঠিন শাস্তি ডেকে আনবে বলে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু জাতি তাকে উপহাস করত, তার কথা উপেক্ষা করত, এমনকি তার স্ত্রীও পাপীদের পক্ষ নিয়েছিল।


ফেরেশতাদের আগমন ও চূড়ান্ত সতর্কবার্তা

একদিন ফেরেশতাত্রয়—জিব্রাইল (আ.), ইস্রাফিল (আ.) এবং মিকাইল (আ.)—সুদর্শন যুবকের রূপে লূত (আ.)-এর এলাকায় আসেন। লূত (আ.) বুঝতে পেরেছিলেন তার জাতির পাপাচারী পুরুষেরা অতিথিদের ক্ষতি করতে পারে, তাই তিনি গোপনে তাদের আশ্রয় দেন। কিন্তু তার স্ত্রী পাপী সম্প্রদায়ের কাছে এই খবর ফাঁস করে দেয়। অশ্লীল উদ্দেশ্যে লূত (আ.)-এর ঘর ঘিরে ফেলে তারা।

তখন ফেরেশতারা নিজেদের পরিচয় দিয়ে লূত (আ.)-কে আশ্বস্ত করেন এবং বলেন: ‘হে লূত! আমরা তোমার পালনকর্তার প্রেরিত ফেরেশতা। এরা তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। তুমি রাতের কিছু অংশ বাকি থাকতে তোমার পরিবার নিয়ে বেরিয়ে পড়ো। কেউ পিছনে তাকাবে না। তোমার স্ত্রীও পাপীদের সাথে শাস্তির আওতাভুক্ত হবে।’ (সূরা হুদ: ১১)। এরপর জিব্রাইল (আ.) এক আঘাতে পাপী দলটির চোখ অন্ধ করে দিলে তারা আতঙ্কিত হয়ে ছুটোছুটি করতে থাকে, আর লূত (আ.) পরিবার নিয়ে এলাকা ত্যাগ করেন।


ধ্বংসের ঝড় এবং ইতিহাসের ভয়ংকরতম শাস্তি

লূত (আ.) তার পরিবারকে নিয়ে নিরাপদ দূরত্বে পৌঁছানোর পরই অবাধ্য জাতির ওপর আল্লাহর ঘোষিত পরিণতি নেমে আসে। গভীর ভোরের অন্ধকারে প্রথমে প্রবল ভূমিকম্পে সমগ্র জনপদ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।

এরপর জিব্রাইল (আ.) তার ডানার শক্তি দিয়ে পুরো নগরীটিকে ভিত্তিসহ আকাশে তুলে নেন। নগরীটিকে এত উঁচুতে উঠানো হয় যে প্রথম আসমানের ফেরেশতারাও জনপদের পশুপাখির ডাক শুনতে পান। তারপর আচমকা সেই নগরীটিকে উল্টো করে ভূমির ওপর ফেলে দেওয়া হয়।

শাস্তি এখানেই শেষ হয়নি; নগরী পতনের পর আকাশ থেকে নেমে আসে পাথরের বৃষ্টি, যেখানে প্রতিটি পাপীর নাম লেখা ছিল। শহরের বাইরে থাকা লোকেরাও এই শাস্তি থেকে রেহাই পায়নি। সবশেষে সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত এলাকায় দূষিত, অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি প্রবাহিত করা হয়, যার ফলে পুরো অঞ্চলটি হয়ে ওঠে নিঃজীব ও অনুর্বর। এ বিষয়ে আল্লাহ কুরআনে বলেন: ‘আমি জনপদটিকে উল্টে দিয়েছি এবং তাদের ওপর স্তরে স্তরে পাথর বর্ষণ করেছি।’ (সূরা হুদ: ৮২)।


ডেড সি বা মৃত সাগরে ধ্বংসের স্মৃতি

হজরত লূত (আ.)-এর জাতির সেই ভয়াবহ ধ্বংসভূমি আজ পরিচিত বাহরে মাইয়েত বা ডেড সি (Dead Sea) নামে। এটি বর্তমানে ফিলিস্তিন ও জর্দানের মাঝে বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। পৃথিবীর অন্যতম সবচেয়ে নিচু স্থানে অবস্থিত এই সাগরের পানিতে রয়েছে অস্বাভাবিক পরিমাণে লবণ ও খনিজ, যা স্বাভাবিক পানির চেয়ে বহু গুণ বেশি ঘন।

এই অতিরিক্ত ঘনত্বের কারণে এখানে কোনো মাছ, ব্যাঙ বা জলজ প্রাণী বেঁচে থাকতে পারে না, তাই একে ‘মৃত সাগর’ বলা হয়। এই পানি এত ভারী যে মানুষ সহজেই এর ওপর ভাসতে পারে। চারপাশে প্রাণের কোনো চিহ্ন নেই। বহু গবেষক মনে করেন, এই এলাকার অস্বাভাবিক ভূস্তর, অতিলবণাক্ত পানি এবং চিরপ্রাণহীন প্রকৃতি সেই ভয়ংকর ধ্বংসযজ্ঞের চিরস্থায়ী স্মারক হিসেবে আজও দাঁড়িয়ে আছে।