পবিত্র কোরআনের সুরা আল-বাকারায় বর্ণিত গরুর অলৌকিক ঘটনাটি কেবল একটি ঐশ্বরিক নিদর্শন নয়, বরং মানবজাতির জন্য গভীর নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষার এক শক্তিশালী বার্তা। বনি ইসরাইলের মধ্যে সংঘটিত এক জটিল হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে আল্লাহ তাআলা যে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তা প্রথমে মানুষের যুক্তির সীমার বাইরে ছিল।
হত্যাকাণ্ডের পর আল্লাহ তাআলা নবী মুসা (আ.)-এর মাধ্যমে বনি ইসরাইলকে একটি গরু জবেহ করার নির্দেশ দেন। এই নির্দেশ শুনে বনি ইসরাইল প্রথমে উপহাসের সুরে প্রশ্ন তোলে—মুসা (আ.) কি তাদের সঙ্গে ঠাট্টা করছেন? মুসা (আ.) দৃঢ়ভাবে উত্তর দেন, আল্লাহর নবীরা কখনো ঠাট্টা-বিদ্রুপ করেন না; বরং তিনি কেবল আল্লাহর নির্দেশই তাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন।
### অহেতুক প্রশ্ন ও কঠিন নির্দেশ
আল্লাহর আদেশ সহজভাবে পালন করার পরিবর্তে বনি ইসরাইল গরুটি কেমন হবে, তার বয়স, রং ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন করতে থাকে। তাদের এই জিদ ও টালবাহানার ফলেই আল্লাহ তাআলা গরুটির বিবরণ ক্রমে আরও নির্দিষ্ট করে দেন।
একটি সাধারণ নির্দেশ পরিণত হয় অত্যন্ত কঠিন ও ব্যয়বহুল এক দায়িত্বে। আল্লাহ নির্ধারিত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী, গরুটি হতে হবে মধ্য বয়সী, গাঢ় হলুদ বর্ণের, সুদর্শন এবং কোনো কাজে ব্যবহৃত নয়।
ফলে বনি ইসরাইল এমন একটি দুর্লভ গরুর সন্ধানে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে, যা শেষ পর্যন্ত পাওয়া যায় এক দরিদ্র কিন্তু অতিশয় মাতৃভক্ত যুবকের কাছে। ওই যুবকের কাছে তার মায়ের নির্দেশের চেয়ে অধিক মূল্যবান কিছুই ছিল না।
### অলৌকিক উপায়ে সত্য প্রকাশ
অবশেষে বনি ইসরাইল ওই যুবকের কাছ থেকে তার মায়ের নির্দেশ অনুযায়ী বিপুল অর্থের বিনিময়ে দুর্লভ গরুটি সংগ্রহ করে এবং তা জবাই করে। এরপর আল্লাহর নির্দেশ মেনে ওই গরুর একটি অংশ নিহত ব্যক্তির দেহে স্পর্শ করানো হয়।
ঠিক তখনই ঘটে এক বিস্ময়কর ঘটনা। নিহত ব্যক্তি জীবিত হয়ে ঘোষণা করে যে, তার নিজের ভ্রাতুষ্পুত্রই তাকে হত্যা করেছে। এই সত্য প্রকাশের পর সে আবার মৃত্যুবরণ করে।
পবিত্র কোরআনে এই বিস্ময়কর ঘটনা সম্পর্কে বলা হয়েছে—
> ‘অতঃপর আমি বললাম, এর (জবাইকৃত গরুর) এক অংশ দ্বারা তাকে আঘাত করো। এভাবেই আল্লাহ মৃতকে জীবিত করেন এবং তোমাদের জন্য তাঁর নিদর্শনসমূহ প্রকাশ করেন, যাতে তোমরা অনুধাবন করো।’ (সুরা বাকারা: ৭৩)
এভাবেই একটি জটিল হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচিত হয় এবং হত্যাকারী তার প্রাপ্য শাস্তির মুখোমুখি হয়।
### ঘটনার গভীর শিক্ষা ও চিরন্তন বার্তা
সুরা আল-বাকারার এই আশ্চর্য ঘটনা মানবজাতির জন্য কয়েকটি মৌলিক শিক্ষা তুলে ধরে:
১. **আল্লাহ সর্বশক্তিমান:** এই ঘটনা প্রমাণ করে, আল্লাহ চাইলে মৃতকেও জীবিত করতে পারেন।
২. **আনুগত্যই মুক্তির পথ:** আল্লাহর নির্দেশে অহেতুক প্রশ্ন ও টালবাহানা কাজকে সহজ না করে বরং কঠিন করে তোলে। সরল আত্মসমর্পণেই শান্তি নিহিত।
৩. **কোনো অপরাধ গোপন থাকে না:** আল্লাহ যেকোনো উপায়ে সত্য প্রকাশ করেন এবং পাপী তার শাস্তি থেকে রেহাই পায় না।
৪. **নৈতিক ইঙ্গিত:** অনেক তাফসিরবিদের মতে, এই ঘটনার মাধ্যমে বনি ইসরাইলের গরু-কেন্দ্রিক মানসিকতার প্রতিও পরোক্ষ আঘাত করা হয়েছে।
৫. **মাতৃভক্তির মর্যাদা:** গরুর মালিক দরিদ্র যুবকের প্রতি আল্লাহর বিশেষ সাহায্য প্রমাণ করে যে, পিতা-মাতার আনুগত্য দুনিয়া ও আখেরাতে কল্যাণ বয়ে আনে।
আজকের যুগেও, যখন মানুষ সন্দেহ ও অজুহাতে সত্য থেকে দূরে সরে যায়, তখন এই কোরআনি ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আল্লাহর আদেশে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ, তাঁর অসীম ক্ষমতার প্রতি আস্থা এবং গোপন পাপ থেকে বিরত থাকার শিক্ষাই শান্তি, ন্যায় ও সমাধানের একমাত্র পথ।
রিপোর্টারের নাম 

























