দীর্ঘদিনের তিক্ততা, অবিশ্বাস আর কূটনৈতিক টানাপোড়েন শেষে অবশেষে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে শুরু করেছে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক। বাংলাদেশের নবনির্বাচিত সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সাম্প্রতিক দিল্লি সফর দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্কের বরফ গলাতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এই সফরের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন দীর্ঘ ১৬ বছরের ‘একপাক্ষিক তোষণ’ নীতির অবসান ঘটেছে, অন্যদিকে তেমনি পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির ভিত্তিতে একটি টেকসই অংশীদারত্বের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
বিএনপির সঙ্গে নয়া রসায়ন ও দিল্লির বার্তা
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের যে চরম অবনতি ঘটেছিল, ড. খলিলুর রহমানের এই সফরের মাধ্যমে তার একটি ইতিবাচক সমাধান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর বাংলাদেশের নতুন সরকারের প্রতিনিধিদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে স্পষ্ট করেছেন যে, দিল্লি এখন নির্বাচিত সরকারের সঙ্গেই দীর্ঘমেয়াদী কাজ করতে আগ্রহী। জয়শঙ্কর তাঁর বার্তায় বলেন, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিভিন্ন দিক শক্তিশালী করার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ঢাকা ও দিল্লি ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখতে সম্মত হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগ পরবর্তী জমানায় বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা ছাড়া ভারতের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই, এবং এই সফর সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।
দিল্লির কাছে ঢাকার স্পষ্ট দাবি ও ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এই সফরে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল এবং তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রী হরদীপ পুরীর সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর আনুষ্ঠানিক দাবি জানানো হয়েছে। এছাড়া ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ ওসমান হাদীর হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহভাজনদেরও হস্তান্তরের দাবি তোলে ঢাকা।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি অনুসরণ করবে। সম্পর্কের ভিত্তি হবে পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও উভয়পক্ষের সুবিধা। একইসঙ্গে দেশে চলমান সংকটের কথা মাথায় রেখে ডিজেল ও সারের সরবরাহ বৃদ্ধির জন্য ভারতের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে।
ভিসা সহজীকরণ ও জ্বালানি সহায়তার আশ্বাস
সাধারণ মানুষের জন্য অন্যতম সুখবর হলো ভারতের ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের আশ্বাস। বৈঠকে ভারতীয় পক্ষ জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহগুলোতেই বাংলাদেশিদের জন্য বিশেষ করে চিকিৎসা ও ব্যবসায়িক ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা হবে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদের মতে, আওয়ামী লীগের আমলের ‘একপাক্ষিক ঝোঁক’ কাটিয়ে বিএনপি সরকার এখন আত্মমর্যাদার সাথে ভারতের সাথে সম্পর্ক রাখতে চায়। বর্তমানে দেশে যে জ্বালানি সংকট চলছে, ভারতের রিফাইনারি স্টেশনগুলো ব্যবহারের মাধ্যমে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সম্পর্ক এখন রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্র, ব্যক্তি বনাম ব্যক্তি নয়
প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির সফরের তাৎপর্য তুলে ধরে বলেন, শেখ হাসিনা এখন রাজনৈতিকভাবে অস্তিত্বহীন। তাই ভারতের সঙ্গে এখন আর ব্যক্তিনির্ভর সম্পর্কের সুযোগ নেই। এখন যা হচ্ছে তা হলো বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটি রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক। ভবিষ্যতে কীভাবে কোনো ব্যক্তির তোষণ না করে মানুষে মানুষে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটানো যায়, সেটিই এই আলোচনার মূল উপজীব্য ছিল। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাহবুবুল আলমও মনে করেন, এই সফর দুই দেশের সহযোগিতার ক্ষেত্রসমূহকে ভবিষ্যতে আরও ফলপ্রসূ ও টেকসই পর্যায়ে উন্নীত করার লক্ষ্যে একটি শক্তিশালী ভিত্তি রচনা করবে।
রিপোর্টারের নাম 



















