ঢাকা ১০:২২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬

হামে মৃত্যু ও গাফিলতি: প্রতিরোধের সুযোগ থাকতেও কেন ঝরছে শিশুর প্রাণ?

২০২৬ সালের মধ্যে হাম নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও বাংলাদেশ বর্তমানে এক নজিরবিহীন মহামারির মুখে দাঁড়িয়েছে। বছরের শুরু থেকে ৩ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত সারাদেশে ৫,৭৯২ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, যার মধ্যে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত হয়েছে ৭৭১ জন। দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৬টিতেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে, যার তীব্রতা সবচেয়ে বেশি ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোভিড-১৯ মহামারির সময় টিকাদানে যে ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি হয়েছিল এবং বর্তমানে অপুষ্টি ও টিকার ডোজ পূর্ণ না করার কারণে শিশুদের মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। হাম কেবল সাধারণ জ্বর নয়; এটি নিউমোনিয়া, এনসেফালাইটিস (মস্তিষ্কের প্রদাহ) ও তীব্র ডায়রিয়ার মতো জটিলতা তৈরি করে শিশুকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। টিকাদানে অনিয়ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো গুজব এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার তদারকিতে দুর্বলতাই এই সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আজ ৫ এপ্রিল, ২০২৬ রবিবার থেকে সরকার দেশব্যাপী ‘জাতীয় জরুরি টিকাদান কর্মসূচি’ (National Emergency Vaccination Campaign) শুরু করছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী সকল শিশুকে এই কর্মসূচির আওতায় অতিরিক্ত এক ডোজ হাম-রুবেলা (MR) টিকা দেওয়া হবে, এমনকি শিশুটি আগে টিকা নিয়ে থাকলেও। সারা দেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা সদর হাসপাতাল, সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ঢাকার বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল ও সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে বিশেষ বুথের মাধ্যমে এই সেবা প্রদান করা হবে। এছাড়া তৃণমূল পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিক, সিটি করপোরেশনের নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং ইপিআই আউটরিচ সেন্টারগুলোতেও টিকা পাওয়া যাবে। বিশেষ করে ৩০টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ‘হটস্পট’ এলাকায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

চিকিৎসকদের বিশেষ পরামর্শ হলো—শিশুর ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে বাধ্যতামূলকভাবে এমআর টিকা নিশ্চিত করা। যদি শিশুর মধ্যে তীব্র জ্বর, শরীরে লালচে ফুসকুড়ি, শ্বাসকষ্ট (বুক দেবে যাওয়া), অবিরাম বমি বা খিঁচুনি দেখা দেয়, তবে ঘরোয়া চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। আক্রান্ত শিশুকে অন্তত ৭ থেকে ১০ দিন আইসোলেশনে রাখা এবং ভিটামিন-এ সাপ্লিমেন্ট নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। গুজব প্রতিরোধে তথ্যভিত্তিক প্রচার এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিটি শিশুর টিকা নিশ্চিত করাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পঙ্গুত্বের হাত থেকে বাঁচাতে এই সমন্বিত উদ্যোগ ও সচেতনতাই পারে হামের এই মরণঘাতী বিস্তার রোধ করতে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

পারমাণবিক ইস্যু অজুহাত, যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ইরান

হামে মৃত্যু ও গাফিলতি: প্রতিরোধের সুযোগ থাকতেও কেন ঝরছে শিশুর প্রাণ?

আপডেট সময় : ১১:১৩:০৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৫ এপ্রিল ২০২৬

২০২৬ সালের মধ্যে হাম নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও বাংলাদেশ বর্তমানে এক নজিরবিহীন মহামারির মুখে দাঁড়িয়েছে। বছরের শুরু থেকে ৩ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত সারাদেশে ৫,৭৯২ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, যার মধ্যে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত হয়েছে ৭৭১ জন। দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৬টিতেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে, যার তীব্রতা সবচেয়ে বেশি ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোভিড-১৯ মহামারির সময় টিকাদানে যে ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি হয়েছিল এবং বর্তমানে অপুষ্টি ও টিকার ডোজ পূর্ণ না করার কারণে শিশুদের মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। হাম কেবল সাধারণ জ্বর নয়; এটি নিউমোনিয়া, এনসেফালাইটিস (মস্তিষ্কের প্রদাহ) ও তীব্র ডায়রিয়ার মতো জটিলতা তৈরি করে শিশুকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। টিকাদানে অনিয়ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো গুজব এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার তদারকিতে দুর্বলতাই এই সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আজ ৫ এপ্রিল, ২০২৬ রবিবার থেকে সরকার দেশব্যাপী ‘জাতীয় জরুরি টিকাদান কর্মসূচি’ (National Emergency Vaccination Campaign) শুরু করছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী সকল শিশুকে এই কর্মসূচির আওতায় অতিরিক্ত এক ডোজ হাম-রুবেলা (MR) টিকা দেওয়া হবে, এমনকি শিশুটি আগে টিকা নিয়ে থাকলেও। সারা দেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা সদর হাসপাতাল, সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ঢাকার বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল ও সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে বিশেষ বুথের মাধ্যমে এই সেবা প্রদান করা হবে। এছাড়া তৃণমূল পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিক, সিটি করপোরেশনের নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং ইপিআই আউটরিচ সেন্টারগুলোতেও টিকা পাওয়া যাবে। বিশেষ করে ৩০টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ‘হটস্পট’ এলাকায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

চিকিৎসকদের বিশেষ পরামর্শ হলো—শিশুর ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে বাধ্যতামূলকভাবে এমআর টিকা নিশ্চিত করা। যদি শিশুর মধ্যে তীব্র জ্বর, শরীরে লালচে ফুসকুড়ি, শ্বাসকষ্ট (বুক দেবে যাওয়া), অবিরাম বমি বা খিঁচুনি দেখা দেয়, তবে ঘরোয়া চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। আক্রান্ত শিশুকে অন্তত ৭ থেকে ১০ দিন আইসোলেশনে রাখা এবং ভিটামিন-এ সাপ্লিমেন্ট নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। গুজব প্রতিরোধে তথ্যভিত্তিক প্রচার এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিটি শিশুর টিকা নিশ্চিত করাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পঙ্গুত্বের হাত থেকে বাঁচাতে এই সমন্বিত উদ্যোগ ও সচেতনতাই পারে হামের এই মরণঘাতী বিস্তার রোধ করতে।