দেশের অর্থনীতিতে রাজস্ব আদায়ের ক্রমবর্ধমান চাপের মধ্যেও সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) শুল্ক-কর পরিশোধে চরম উদাসীনতা দেখাচ্ছে। চট্টগ্রাম কাস্টমসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত টানা ৫০ মাস ধরে পেট্রোবাংলার বকেয়া শুল্ক-করের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা। বিপুল পরিমাণ এই বকেয়ার কারণে দেশের ফিসক্যাল ডিসিপ্লিন ও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
কাস্টমস আইন অনুযায়ী, ইলেকট্রনিক মাধ্যমে বিল অব এন্ট্রি দাখিল করে পণ্য শুল্কায়ন ও শুল্ক-কর পরিশোধের বাধ্যবাধকতা থাকলেও পেট্রোবাংলা পণ্য খালাসের এক মাস পরেও তা দাখিল করছে না, যা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের এই সময়ের মধ্যে অপরিশোধিত বিল অব এন্ট্রির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৭০টি। যদিও সংস্থাটি ৪৫টি বিল অব এন্ট্রির বিপরীতে ১ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে, তবে ২০২৫ সালের আগস্টের পর থেকে নতুন করে কোনো বকেয়া পরিশোধ করা হয়নি।
এই বিপুল বকেয়া আদায়ের লক্ষ্যে চট্টগ্রাম কাস্টমস থেকে বারবার চিঠি ও টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলেও পেট্রোবাংলা আশানুরূপ সাড়া দেয়নি। এমনকি ২০২২ সালে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও সংস্থাটি কোনো উত্তর প্রদান করেনি। পরবর্তীতে কাস্টমস থেকে বিন (BIN) লক করা বা ব্যাংক হিসাব জব্দের হুঁশিয়ারি দেওয়া হলে পেট্রোবাংলা জানায় যে, অর্থ বিভাগ থেকে ভর্তুকি পেলেই কেবল এই বকেয়া পরিশোধ করা সম্ভব হবে।
বর্তমানে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের অজুহাতে এলএনজি আমদানিতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট থেকে অব্যাহতি চেয়ে এনবিআরের কাছে আবেদন করেছে সংস্থাটি। এনবিআরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মতে, আইজিএম (IGM)-এর বিপরীতে বিল অব এন্ট্রি দাখিল না করেই পণ্য ব্যবহার করা কাস্টমস আইনের পরিপন্থী এবং এর ফলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ‘অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড’ সিস্টেমে এলএনজির হিসাব মেলানো বা রিকনসিলেশন প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে।
অন্যদিকে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক এই বকেয়ার পেছনে ‘দ্বৈত কর’ নীতিকে দায়ী করেছেন। তার মতে, বন্দরে একবার কর দেওয়ার পর গ্রাহকের কাছে বিক্রির সময় পুনরায় কর দাবি করা হচ্ছে, যা অযৌক্তিক। সংস্থার অন্য কর্মকর্তাদের দাবি, আমদানির সময় দেওয়া অগ্রিম আয়কর (AIT) বছর শেষে ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও এনবিআর তা দিচ্ছে না। বর্তমানে এই অমীমাংসিত ইস্যুগুলো নিয়ে দুই সংস্থার মধ্যে আলোচনা চলছে।
উল্লেখ্য যে, ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ঝুলে থাকা ১৩ হাজার ২৭৮ কোটি টাকা বকেয়া আদায়ের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ‘বুক অ্যাডজাস্টমেন্ট’ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫ হাজার কোটি এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩ হাজার ২৭৮ কোটি টাকা এনবিআরকে পরিশোধ করার জন্য পেট্রোবাংলাকে ঋণ দেওয়ার কথা রয়েছে অর্থ বিভাগের। তবে চলমান আমদানির ওপর নতুন করে হাজার হাজার কোটি টাকার বকেয়া বাড়তে থাকায় জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 

























