মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধাবস্থা বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে, যার ফলে আমদানির বিকল্প উৎস খোঁজার বিষয়টি এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৬৮ লাখ টন, যার মধ্যে প্রায় ৬৩ লাখ টনই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এই আমদানিকৃত তেলের একটি বড় অংশ অর্থাৎ ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল (ক্রুড অয়েল) মূলত সৌদি আরব ও দুবাই থেকে হরমুজ প্রণালি হয়ে বাংলাদেশে আসে। হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ২২ শতাংশই এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটির ওপর নির্ভরশীল।
সাম্প্রতিক সময়ে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই রুটটি বন্ধ থাকায় সরবরাহ নিয়ে চরম আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। যদিও ১ এপ্রিল ইরান বাংলাদেশি কিছু জাহাজকে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে এবং গত ১০ মার্চ আশ্বস্ত করেছে যে তারা বাংলাদেশি জাহাজে বাধা দেবে না, তবুও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। বিশেষ করে গত ২ মার্চ সৌদি আরবের ‘রাস তানুরা’ শোধনাগারে ড্রোন হামলার পর সেটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ থাকা এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কঠোর নজরদারি বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) গত অর্থবছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৫ লাখ ১০ হাজার ৯৪৪ টন অপরিশোধিত তেল মূলত দুটি উৎস থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে—সৌদি আরবের ‘সৌদি আরামকো’ থেকে ৭ লাখ ৯৮ হাজার ৯৩৩ টন এবং দুবাইয়ের ‘আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি’ থেকে ৭ লাখ ১২ হাজার ৬১১ টন। এই পুরো পরিমাণ তেলই হরমুজ প্রণালি পার হয়ে দেশে পৌঁছায়। অন্যদিকে, ৪৭ লাখ টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল যেমন ডিজেল, জেট ফুয়েল ও অকটেন মূলত মালয়েশিয়া, চীন, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত, সিঙ্গাপুর ও ওমানসহ আটটি দেশ থেকে আনা হয়।
গত অর্থবছরে বিপিসি ৩৩ লাখ ৪২ হাজার ১৪ টন ডিজেলসহ বিপুল পরিমাণ জেট ফুয়েল ও ফার্নেস অয়েল আমদানি করেছে। চলতি বছরেও ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে যা যথারীতি ওই ঝুঁকিপূর্ণ রুট দিয়েই আসার কথা। এই প্রেক্ষাপটে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বদরুল ইমাম সতর্ক করেছেন যে, হরমুজ প্রণালির এই অস্থিরতা বাংলাদেশকে বড় ধরনের সরবরাহের ঝুঁকিতে ফেলেছে। তার মতে, এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে শুধুমাত্র একটি রুটের ওপর নির্ভর না করে ইন্দোনেশিয়া বা এশিয়ার অন্যান্য দেশ থেকে তেল আমদানি বাড়ানোর জন্য সরকারের দ্রুত ও সুনির্দিষ্ট বিকল্প পরিকল্পনা থাকা অত্যন্ত জরুরি।
বিপিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, ইরানের ইতিবাচক বার্তার কারণে আপাতত বড় কোনো বিপর্যয় না ঘটলেও এবং বর্তমানে অল্প পরিসরে তেল আসলেও, যুদ্ধের স্থায়িত্বের ওপরই ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা নির্ভর করছে। মূলত মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো সংঘাত আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দ্রুত প্রভাব ফেলে, যা সামাল দিতে হলে জ্বালানি আমদানির উৎস ও রুটে বৈচিত্র্য আনা এখন অনিবার্য হয়ে পড়েছে।
রিপোর্টারের নাম 
























