আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়তে থাকায় বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর নজিরবিহীন চাপ তৈরি হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চরম উত্তেজনার ফলে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। গত ৩০ মার্চ সকালে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৬ ডলার ১০ সেন্টে পৌঁছায়, যা এক দিনেই ৩.১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে ডব্লিউটিআই ক্রুডের দামও বেড়ে ১০২ ডলার ৩০ সেন্টে দাঁড়িয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই সংঘাত আরও তীব্র হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার পর্যন্ত স্পর্শ করতে পারে।
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এই পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ, কারণ গবেষণা বলছে যে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০ ডলার বাড়লে বাংলাদেশের বার্ষিক আমদানিতে অতিরিক্ত প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় বেড়ে যায়। যদি তেলের দাম দীর্ঘ সময় ১২০ ডলারের ওপরে থাকে, তবে বছরে অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ৬১ হাজার কোটি টাকার সমান। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ’-এর প্রধান গবেষক এম জাকির হোসেন খান জানান, বর্তমানে বাংলাদেশ ৯৫ শতাংশ জ্বালানির জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এই অস্থিরতা সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও জাতীয় বাজেটের ওপর আঘাত হানছে।
বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেও সরকার আপাতত দেশের ভেতরে ভোক্তা পর্যায়ে তেলের দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে সরকারকে এক বিশাল অংকের ভর্তুকির বোঝা কাঁধে নিতে হচ্ছে। বর্তমানে দেশে প্রতি লিটার ডিজেল ১০০ টাকায় বিক্রি হলেও এর প্রকৃত আমদানি ও সরবরাহ ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৯৮ টাকা; অর্থাৎ প্রতি লিটার ডিজেলে সরকার প্রায় ৯৮ টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে। একইভাবে ১২০ টাকার অকটেনের প্রকৃত খরচ পড়ছে ১৫০ টাকার বেশি। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে, শুধু এপ্রিল মাসেই এই দাম সমন্বয় না করার ফলে সরকারকে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে।
জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ সংসদে জানিয়েছেন যে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ৯৮ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় তা বাজেটের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক প্রাক্কলন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের শেষ তিন মাসেই অতিরিক্ত ৩০০ কোটি ডলার ব্যয় হতে পারে। এই ঘাটতি মেটাতে সরকার এখন আইএমএফ থেকে দেড় বিলিয়ন ডলার এবং এডিবি ও বিশ্বব্যাংক থেকে বড় অংকের বাজেট সহায়তা ও ঋণ নেওয়ার জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। আইএমএফ-এর শর্ত ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে এই বিশাল ভর্তুকি জোগাড় করা সরকারের জন্য একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধির চেইন রিঅ্যাকশন হিসেবে বিদ্যুৎ খাতেও ভর্তুকির চাহিদা ব্যাপক হারে বেড়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ ডিজেল, ফার্নেস অয়েল ও এলএনজি নির্ভর হওয়ায় উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিক বেড়েছে এবং বিদ্যুৎ বিভাগ ইতিমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে অতিরিক্ত ২০ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা ভর্তুকি দাবি করেছে। এতে বিদ্যুৎ খাতে মাসিক ভর্তুকির পরিমাণ ৩ হাজার ২৫০ কোটি থেকে ৫ হাজার কোটিতে পৌঁছাতে পারে এবং পুরো বছরে এই অংক ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম মনে করেন, বিদ্যুৎ খাতের লুণ্ঠন ও অপচয় বন্ধ করতে পারলে এই ভর্তুকির চাপ অনেকাংশেই কমানো সম্ভব হতো।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সতর্ক করেছেন যে, জ্বালানির এই বাড়তি ব্যয় মেটাতে গিয়ে চলতি হিসাবের ঘাটতি বাড়বে এবং টাকার ওপর অবমূল্যায়নের চাপ সৃষ্টি হবে, যা সামগ্রিক জিডিপির ১.১ শতাংশের সমান হতে পারে। এর ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং উৎপাদন খরচ বাড়লে তা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার ওপর মূল্যস্ফীতির বোঝা হিসেবে চেপে বসবে। বিশেষজ্ঞরা এখন বিকল্প হিসেবে সৌরবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।
রিপোর্টারের নাম 

























