মধ্যপ্রাচ্যের চলমান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বাংলাদেশকে এক চতুর্মুখী সংকটের মুখে ঠেলে দিলেও জাতীয় সংসদে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে চলছে তথাকথিত সংবিধান সংস্কার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে নিরর্থক বচসা। জ্বালানি সংকট এবং বিপন্ন অর্থনীতির এই চরম মুহূর্তে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী জোটের মধ্যকার এই রাজনৈতিক বিতর্ক সাধারণ জাতিকে কেবল হতাশই করছে না, বরং ক্রমান্বয়ে ক্ষুব্ধ করে তুলছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে যেখানে সংসদের উচিত ছিল সম্মিলিতভাবে সংকট মোকাবিলার কার্যকরী পরিকল্পনা গ্রহণ করা, সেখানে সংবিধানের তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে পড়ে থাকা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার যুদ্ধ সারা বিশ্বের উন্নত ও অনুন্নত সব দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছে এবং এর ভয়াবহ প্রভাব ইতিমধ্যে জ্বালানি নিরাপত্তা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর পড়েছে। বাংলাদেশ এই পরিস্থিতির অন্যতম মারাত্মক শিকারে পরিণত হতে চলেছে কারণ দেশের জ্বালানি আমদানির সিংহভাগই আরব ও পার্সিয়ান গালফ অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমান সরকারের অনভিজ্ঞতার কারণে সংকটের প্রকৃত স্বরূপ সঠিক সময়ে অনুধাবন করতে ব্যর্থ হওয়ায় জ্বালানি সংকট ইতিমধ্যে আতঙ্কজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
জ্বালানি খাতের বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, ডিজেল ছাড়া পেট্রোল ও অকটেনের পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও গুজব ছড়িয়ে বাজারে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়েছে এবং সরকার যথাসময়ে সাপ্লাই চেইন নিয়ন্ত্রণে নিতে ব্যর্থ হয়েছে। যুদ্ধের কারণে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় দীর্ঘ সময় ভর্তুকি দিয়ে উচ্চ মূল্যে জ্বালানি আমদানি করা সরকারের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়বে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় পরিবহন খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে যা বাংলাদেশের জন্য বড় বিপদ।
সামনে আসন্ন গ্রীষ্মকালে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির চাহিদা যখন তুঙ্গে উঠবে, তখন সার কারখানা ও শিল্প উৎপাদন সচল রাখাই হবে প্রধান চ্যালেঞ্জ। এমন পরিস্থিতিতে উচ্চমূল্যে জ্বালানি আমদানি অব্যাহত রাখতে হলে অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম বাড়ানো ছাড়া বিকল্প থাকবে না, যার ফলে মুদ্রাস্ফীতি চরমে পৌঁছাবে এবং জনজীবনে চরম অশান্তি সৃষ্টি হবে। দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদদের এখনই বুঝতে হবে যে এই সংকট সম্পূর্ণ বৈষয়িক এবং এই মুহূর্তে কম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে বিতর্ক না করে আসল সংকট সামাল দিতে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস নিবেদন করা জরুরি।
সংবিধান সংস্কারের প্রসঙ্গে এটি মনে রাখা প্রয়োজন যে, বর্তমান জাতীয় সংসদের সবাই বিদ্যমান সংবিধান রক্ষার শপথ নিয়ে সংসদ সদস্য হয়েছেন। এমনকি পূর্ববর্তী অনির্বাচিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও একই শপথ নিয়েছিল, তাই সেই সরকারের কোনো সংবিধানবিরোধী কাজের স্বীকৃতি বর্তমান সংসদ আইনগতভাবেই দিতে পারে না। নির্বাচিত সংসদের ওপর কোনো অনির্বাচিত সরকারের সংবিধান বহির্ভূত অনুশাসন প্রযোজ্য হওয়া গণতান্ত্রিক রীতির পরিপন্থী।
তবে জাতীয় স্বার্থে সংসদ চাইলে সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নিতে পারে, কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক সংকটের প্রেক্ষাপটে সেগুলো কোনোভাবেই অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য নয়। সরকার ইতিমধ্যে সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন কৃচ্ছতাসাধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে। দেশের সাধারণ মানুষকে আস্থায় নিয়ে এবং সংশ্লিষ্ট সকল মহলকে অবহিত রেখে পরিকল্পিতভাবে এই সংকট উত্তরণই এখন সময়ের প্রধান দাবি।
রিপোর্টারের নাম 

























