ঢাকা ০৫:১২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

কোভিডের চেয়েও শক্তিশালী সংক্রমণক্ষম হাম: দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া মহামারিতে মৃত ২২ শিশু

দেশে বর্তমানে হাম বা মিজেলসের সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে যা পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়ে দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম কোভিডের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি শক্তিশালী একটি ছোঁয়াচে রোগ এবং একজন আক্রান্ত শিশু থেকে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে আরও ১৮ জন শিশুর মধ্যে এই ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়তে পারে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং আক্রান্ত শিশুদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সরকার ইতিমধ্যে রাজধানীসহ দেশের সকল সরকারি হাসপাতালে বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত দেশে মোট ৬৭৫ জন হামে আক্রান্ত হয়েছেন যার মধ্যে জানুয়ারি মাসে ৭৮ জন, ফেব্রুয়ারি মাসে ২৪১ জন এবং মার্চ মাসে সর্বোচ্চ ৩৫৬ জন শনাক্ত হয়েছেন।

দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৬টি জেলাতেই এখন এই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ২৪৪ জন আক্রান্ত হয়েছেন যার মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে ৮৫ জন এবং ঢাকা জেলায় ৩২ জন রয়েছেন। এছাড়া রাজশাহী বিভাগে ১৩৭ জন, চট্টগ্রামে ৯৩ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৮০ জন এবং বরিশাল ও খুলনা বিভাগে ৫১ জন করে রোগী শনাক্ত হয়েছে। বিপরীতে এখন পর্যন্ত রাঙামাটি, বান্দরবান, বাগেরহাট ও পঞ্চগড়সহ মাত্র ৮টি জেলায় কোনো রোগী পাওয়া যায়নি। গত বছরের এই সময়ে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল মাত্র ৯ জন যা বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে স্পষ্ট করে তোলে।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের ইনচার্জ প্রফেসর ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে কোভিডকালীন সময়ে প্রায় ৩০ শতাংশ শিশুর নিয়মিত টিকা থেকে বঞ্চিত হওয়াকে চিহ্নিত করেছেন। তিনি জানান, সময়মতো টিকা না পাওয়ায় শিশুদের শরীরে প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডির ঘাটতি দেখা দিয়েছে এবং পর্যাপ্ত আইসোলেশন ব্যবস্থা ও পুষ্টিহীনতা এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের (আইডিএইচ) জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. শ্রীবাস পাল জানিয়েছেন যে, গত তিন মাসে মৃত ২২টি শিশুর অধিকাংশেরই বয়স ছিল মাত্র ৩ থেকে ১০ মাস।

সাধারণত শিশুদের নিয়মিত টিকাদানের সময় হওয়ার আগেই তারা আক্রান্ত হচ্ছে এবং এর সাথে নিউমোনিয়া বা হার্টের জটিলতা যুক্ত হওয়ায় মৃত্যুঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, হামের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে জ্বর, সর্দি, শরীর ব্যথা এবং চোখ লাল হওয়ার পাশাপাশি শরীরে লালচে র‍্যাশ বা ছোপ দেখা দেয়। বিশেষ করে গালের ভেতরে ‘কপলিক স্পট’ দেখা দিলে হাম নিশ্চিত হওয়া যায়। পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এখন বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ৬ মাস বয়সী শিশুদেরও হামের টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল জানিয়েছেন যে, নতুন করে জরুরি ভিত্তিতে টিকা সংগ্রহের জন্য সরকার ইতিমধ্যে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরান যুদ্ধে মার্কিনদের সমর্থন হ্রাস: ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও তলানিতে

কোভিডের চেয়েও শক্তিশালী সংক্রমণক্ষম হাম: দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া মহামারিতে মৃত ২২ শিশু

আপডেট সময় : ১১:১৮:৫৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২৬

দেশে বর্তমানে হাম বা মিজেলসের সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে যা পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়ে দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম কোভিডের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি শক্তিশালী একটি ছোঁয়াচে রোগ এবং একজন আক্রান্ত শিশু থেকে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে আরও ১৮ জন শিশুর মধ্যে এই ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়তে পারে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং আক্রান্ত শিশুদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সরকার ইতিমধ্যে রাজধানীসহ দেশের সকল সরকারি হাসপাতালে বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত দেশে মোট ৬৭৫ জন হামে আক্রান্ত হয়েছেন যার মধ্যে জানুয়ারি মাসে ৭৮ জন, ফেব্রুয়ারি মাসে ২৪১ জন এবং মার্চ মাসে সর্বোচ্চ ৩৫৬ জন শনাক্ত হয়েছেন।

দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৬টি জেলাতেই এখন এই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ২৪৪ জন আক্রান্ত হয়েছেন যার মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে ৮৫ জন এবং ঢাকা জেলায় ৩২ জন রয়েছেন। এছাড়া রাজশাহী বিভাগে ১৩৭ জন, চট্টগ্রামে ৯৩ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৮০ জন এবং বরিশাল ও খুলনা বিভাগে ৫১ জন করে রোগী শনাক্ত হয়েছে। বিপরীতে এখন পর্যন্ত রাঙামাটি, বান্দরবান, বাগেরহাট ও পঞ্চগড়সহ মাত্র ৮টি জেলায় কোনো রোগী পাওয়া যায়নি। গত বছরের এই সময়ে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল মাত্র ৯ জন যা বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে স্পষ্ট করে তোলে।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের ইনচার্জ প্রফেসর ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে কোভিডকালীন সময়ে প্রায় ৩০ শতাংশ শিশুর নিয়মিত টিকা থেকে বঞ্চিত হওয়াকে চিহ্নিত করেছেন। তিনি জানান, সময়মতো টিকা না পাওয়ায় শিশুদের শরীরে প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডির ঘাটতি দেখা দিয়েছে এবং পর্যাপ্ত আইসোলেশন ব্যবস্থা ও পুষ্টিহীনতা এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের (আইডিএইচ) জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. শ্রীবাস পাল জানিয়েছেন যে, গত তিন মাসে মৃত ২২টি শিশুর অধিকাংশেরই বয়স ছিল মাত্র ৩ থেকে ১০ মাস।

সাধারণত শিশুদের নিয়মিত টিকাদানের সময় হওয়ার আগেই তারা আক্রান্ত হচ্ছে এবং এর সাথে নিউমোনিয়া বা হার্টের জটিলতা যুক্ত হওয়ায় মৃত্যুঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, হামের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে জ্বর, সর্দি, শরীর ব্যথা এবং চোখ লাল হওয়ার পাশাপাশি শরীরে লালচে র‍্যাশ বা ছোপ দেখা দেয়। বিশেষ করে গালের ভেতরে ‘কপলিক স্পট’ দেখা দিলে হাম নিশ্চিত হওয়া যায়। পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এখন বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ৬ মাস বয়সী শিশুদেরও হামের টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল জানিয়েছেন যে, নতুন করে জরুরি ভিত্তিতে টিকা সংগ্রহের জন্য সরকার ইতিমধ্যে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে।