ঢাকা ০৫:১৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

জেট ফুয়েলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে পর্যটন ও এভিয়েশন খাতে চরম বিপর্যয়

দেশের এভিয়েশন খাত বর্তমানে এক নজিরবিহীন ও ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়েছে যা সাধারণ যাত্রী থেকে শুরু করে পুরো অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। উড়োজাহাজের জ্বালানি বা জেট ফুয়েলের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক—সব রুটেই বিমান ভাড়া আকাশচুম্বী হতে শুরু করেছে। গত ২৫ মার্চ থেকে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) জেট এ-১ জ্বালানির দাম প্রায় ৮০ শতাংশ বাড়িয়ে দেওয়ার পর এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

বিইআরসি-এর নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে প্রতি লিটার জ্বালানির দাম ১১২.৪১ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০২.২৯ টাকা করা হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের ক্ষেত্রে এটি ০.৭৩৮৪ ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১.৩২১৬ ডলারে উন্নীত হয়েছে। জ্বালানির এই আকাশচুম্বী দামের কারণে এয়ারলাইনগুলো তাদের পরিচালন ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ যাত্রীদের পকেটে। গত কয়েক দিনের ব্যবধানে অভ্যন্তরীণ রুটে গন্তব্যভেদে ভাড়া ১০০০ থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে যার ফলে ঢাকা–কক্সবাজার রুটে ভাড়া বর্তমানে ১২ হাজার টাকায় ঠেকেছে এবং ঢাকা–চট্টগ্রাম রুটে ভাড়া বেড়ে হয়েছে প্রায় ১১ হাজার টাকা।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, একটি এয়ারলাইন্সের মোট পরিচালন ব্যয়ের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশই জ্বালানি তেল খরচ এবং টিকে থাকতে হলে ভাড়া বাড়ানো ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই। তাত্ত্বিকভাবে রুটভেদে মূল ভাড়া ১৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে তবে প্রতিযোগিতার কারণে আন্তর্জাতিক রুটে এই বৃদ্ধির হার ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়বেন প্রবাসীকর্মীরা কারণ মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রুটগুলোতে বিশেষ করে ঢাকা–জেদ্দা, রিয়াদ, দুবাই ও কুয়েত রুটে ভাড়া ৬৫ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এছাড়া ব্যাংকক, কুয়ালালামপুর ও সিঙ্গাপুর রুটে যাওয়া-আসার ভাড়া ৩৮ হাজার থেকে ৫৫ হাজার টাকায় পৌঁছাতে পারে। এভিয়েশন ও পর্যটন বিশেষজ্ঞ এ টি এম নজরুল ইসলাম মনে করেন এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশীয় এয়ারলাইনগুলো চরম চাপে পড়বে এবং বিদেশি এয়ারলাইনগুলো যারা নিজেদের দেশ থেকে কম খরচে জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারে তারা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে যা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়াবে। একইসঙ্গে কার্গো বা পণ্য পরিবহন খরচ বাড়লে বাজারে সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি হবে।

এভিয়েশন ব্যবসায়ীরা এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিকে ‘সম্পূর্ণ অযৌক্তিক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এওএবি)-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক হাবে জেট ফুয়েলের দাম বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম যেমন কলকাতায় প্রতি লিটার ০.৬২ ডলার এবং দুবাইয়ে ০.৫৮৭ ডলার অথচ বাংলাদেশে এই দাম ১.৩ ডলারের বেশি। এওএবি মহাসচিব ও নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান হুশিয়ারি দিয়েছেন যে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা না হলে দেশীয় এয়ারলাইনগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

জ্বালানির এই দাম বৃদ্ধির ধাক্কায় পর্যটন খাতও স্থবির হয়ে পড়ার পথে। ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সভাপতি মোহাম্মদ রাফিউজ্জামান জানিয়েছেন যে ভ্রমণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ট্যুর প্যাকেজের খরচ আকাশচুম্বী হচ্ছে এবং সাধারণ পর্যটকদের মাঝে ভ্রমণের আগ্রহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। এমনকি আসন্ন ঈদের মতো দীর্ঘ ছুটিতেও পর্যটকদের কাঙ্ক্ষিত সমাগম দেখা যাচ্ছে না যা এই খাতের গভীর সংকটকেই স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন এই মূল্যবৃদ্ধি হঠাৎ না করে ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করা উচিত ছিল যাতে সংশ্লিষ্ট খাতগুলো এই বিশাল চাপ সামলানোর সুযোগ পেত।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরান যুদ্ধে মার্কিনদের সমর্থন হ্রাস: ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও তলানিতে

জেট ফুয়েলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে পর্যটন ও এভিয়েশন খাতে চরম বিপর্যয়

আপডেট সময় : ১১:০৫:১২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২৬

দেশের এভিয়েশন খাত বর্তমানে এক নজিরবিহীন ও ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়েছে যা সাধারণ যাত্রী থেকে শুরু করে পুরো অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। উড়োজাহাজের জ্বালানি বা জেট ফুয়েলের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক—সব রুটেই বিমান ভাড়া আকাশচুম্বী হতে শুরু করেছে। গত ২৫ মার্চ থেকে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) জেট এ-১ জ্বালানির দাম প্রায় ৮০ শতাংশ বাড়িয়ে দেওয়ার পর এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

বিইআরসি-এর নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে প্রতি লিটার জ্বালানির দাম ১১২.৪১ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০২.২৯ টাকা করা হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের ক্ষেত্রে এটি ০.৭৩৮৪ ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১.৩২১৬ ডলারে উন্নীত হয়েছে। জ্বালানির এই আকাশচুম্বী দামের কারণে এয়ারলাইনগুলো তাদের পরিচালন ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ যাত্রীদের পকেটে। গত কয়েক দিনের ব্যবধানে অভ্যন্তরীণ রুটে গন্তব্যভেদে ভাড়া ১০০০ থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে যার ফলে ঢাকা–কক্সবাজার রুটে ভাড়া বর্তমানে ১২ হাজার টাকায় ঠেকেছে এবং ঢাকা–চট্টগ্রাম রুটে ভাড়া বেড়ে হয়েছে প্রায় ১১ হাজার টাকা।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, একটি এয়ারলাইন্সের মোট পরিচালন ব্যয়ের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশই জ্বালানি তেল খরচ এবং টিকে থাকতে হলে ভাড়া বাড়ানো ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই। তাত্ত্বিকভাবে রুটভেদে মূল ভাড়া ১৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে তবে প্রতিযোগিতার কারণে আন্তর্জাতিক রুটে এই বৃদ্ধির হার ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়বেন প্রবাসীকর্মীরা কারণ মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রুটগুলোতে বিশেষ করে ঢাকা–জেদ্দা, রিয়াদ, দুবাই ও কুয়েত রুটে ভাড়া ৬৫ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এছাড়া ব্যাংকক, কুয়ালালামপুর ও সিঙ্গাপুর রুটে যাওয়া-আসার ভাড়া ৩৮ হাজার থেকে ৫৫ হাজার টাকায় পৌঁছাতে পারে। এভিয়েশন ও পর্যটন বিশেষজ্ঞ এ টি এম নজরুল ইসলাম মনে করেন এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশীয় এয়ারলাইনগুলো চরম চাপে পড়বে এবং বিদেশি এয়ারলাইনগুলো যারা নিজেদের দেশ থেকে কম খরচে জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারে তারা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে যা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়াবে। একইসঙ্গে কার্গো বা পণ্য পরিবহন খরচ বাড়লে বাজারে সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি হবে।

এভিয়েশন ব্যবসায়ীরা এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিকে ‘সম্পূর্ণ অযৌক্তিক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এওএবি)-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক হাবে জেট ফুয়েলের দাম বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম যেমন কলকাতায় প্রতি লিটার ০.৬২ ডলার এবং দুবাইয়ে ০.৫৮৭ ডলার অথচ বাংলাদেশে এই দাম ১.৩ ডলারের বেশি। এওএবি মহাসচিব ও নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান হুশিয়ারি দিয়েছেন যে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা না হলে দেশীয় এয়ারলাইনগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

জ্বালানির এই দাম বৃদ্ধির ধাক্কায় পর্যটন খাতও স্থবির হয়ে পড়ার পথে। ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সভাপতি মোহাম্মদ রাফিউজ্জামান জানিয়েছেন যে ভ্রমণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ট্যুর প্যাকেজের খরচ আকাশচুম্বী হচ্ছে এবং সাধারণ পর্যটকদের মাঝে ভ্রমণের আগ্রহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। এমনকি আসন্ন ঈদের মতো দীর্ঘ ছুটিতেও পর্যটকদের কাঙ্ক্ষিত সমাগম দেখা যাচ্ছে না যা এই খাতের গভীর সংকটকেই স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন এই মূল্যবৃদ্ধি হঠাৎ না করে ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করা উচিত ছিল যাতে সংশ্লিষ্ট খাতগুলো এই বিশাল চাপ সামলানোর সুযোগ পেত।