বিগত এক দশকে (২০১৩-২০২২ সাল) বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে প্রায় ৬ হাজার ৮৩০ কোটি মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। বর্তমান বাজারে প্রতি ডলার ১২৩ টাকা হিসেবে স্থানীয় মুদ্রায় এই অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৮ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা, যা দিয়ে অনায়াসেই ২৫টি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব ছিল। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই) তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে আলোচ্য সময়ে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের ১৫ দশমিক ৮৬ শতাংশই পাচার হয়েছে। মূলত আমদানিতে পণ্যের মূল্য বেশি দেখিয়ে (ওভার ইনভয়েসিং) এবং রপ্তানিতে মূল্য কম দেখিয়ে (আন্ডার ইনভয়েসিং) এই বিপুল অর্থ পাচার করা হয়েছে। এশিয়ায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে অর্থ পাচারের এই দৌড়ে শীর্ষ দশের তালিকায় উঠে এসেছে বাংলাদেশের নাম।
জিএফআই-এর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে প্রতি বছর গড়ে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৬৮৩ কোটি ডলার পাচার হয়েছে যার একটি বড় অংশ অর্থাৎ ৩ হাজার ২৮০ কোটি ডলারের গন্তব্য ছিল বিশ্বের উন্নত দেশগুলো। যেহেতু বাংলাদেশের বাণিজ্যের বড় অংশ ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পন্ন হয় তাই পাচারকারীরা ওইসব দেশকেই নিরাপদ মনে করেছে। সংস্থাটি দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের তথ্যের গরমিল বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বাংলাদেশ যদি কোনো দেশ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানির তথ্য দেয় অথচ সংশ্লিষ্ট দেশটি যদি ৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানির তথ্য দেখায় তবে মাঝখানের এই ১ বিলিয়ন ডলারের পার্থক্যকেই অর্থ পাচার হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। জিএফআই-এর মতে সুশাসনের অভাব এবং অর্থনৈতিক কাঠামোগত দুর্বলতাই এই অর্থ পাচারের প্রধান কারণ যা দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ ও জনসেবামূলক বিনিয়োগকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে।
এই প্রতিবেদনের বিষয়ে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন জানান যে বাণিজ্যের আড়ালে মানি লন্ডারিংয়ের বিষয়টি অস্বীকার করার উপায় নেই তবে তিনি দাবি করেন যে জিএফআই-এর এই রিপোর্টটি মূলত ধারণার ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। তিনি আরও জানান যে বিএফআইইউ বর্তমানে অর্থ পাচার বন্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে এবং নজরদারি কয়েকগুণ বাড়ানো হয়েছে যাতে দেশ ও জনগণের স্বার্থে কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া না হয়। অন্যদিকে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন যে শিল্পের যন্ত্রপাতি আমদানির আড়ালে দেশ থেকে বড় অঙ্কের টাকা পাচার হচ্ছে কারণ আমদানির হারের তুলনায় দেশে প্রকৃত শিল্পায়ন দৃশ্যমান নয়। তিনি আমদানিকৃত পণ্যের মূল্যের একটি সঠিক ডাটাবেজ তৈরি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি আরও জোরদার করার পরামর্শ দিয়েছেন।
অর্থ পাচারের ভয়াবহতা সম্পর্কে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদনে আরও ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বাধীন ওই কমিটির মতে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরে বাংলাদেশ থেকে মোট ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে যা গত ৫ বছরের জাতীয় বাজেটের চেয়েও বেশি। প্রতিবেদনে বলা হয় যে এই ১৫ বছরে পাচার হওয়া অর্থ দিয়ে ৭৮টি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব ছিল। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাত, বিদ্যুৎ-জ্বালানি এবং বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ছিল দুর্নীতির প্রধান উৎস যেখানে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) প্রায় ৪০ শতাংশ অর্থ আমলারা লুটপাট করেছে বলে শ্বেতপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে জিএফআই শুল্ক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, আঞ্চলিক চুক্তির মাধ্যমে তথ্য বিনিময় এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির জোরালো সুপারিশ করেছে।
রিপোর্টারের নাম 
























