ঢাকা ০৩:৪৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

জাকাত ও ইসলামিক সামাজিক অর্থনীতি

কিছুদিন হলো ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন শেষ হয়েছে। চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর দেশের মানুষের মধ্যে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক নিপীড়ন ও অর্থনৈতিক শোষণের জাঁতাকল থেকে মুক্তির জন্য মানুষের মনে তীব্র আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। এর আগেও বহুবার রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছিল, কিন্তু মানুষের ভাগ্যের উন্নতি সেভাবে হয়নি; বরং শোষণ ও বৈষম্যের মাত্রা অনেক সময় বেড়েছে। দেশের ব্যক্তি খাতের আপাতবিকাশ ও সাফল্যে শহর-নগরে কোথাও কোথাও গতি, প্রবৃদ্ধি আর সেবার মান বাড়লেও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমানের দৃশ্যমান উন্নতি লক্ষণীয় হয়নি। এখনো দেশের এক-চতুর্থাংশের বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছেন। পিপিআরসি’র সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, দেশে এখন দারিদদ্র্যের হার প্রায় ২৮ শতাংশ। সরকারি হিসাবেই ২০২২ সালে এই হার ছিল ১৮ দশমিক ৭। দারিদ্র্য বৃদ্ধির এই চিত্র আমাদের উদ্বিগ্ন করে। দারিদ্র্যের পাশাপাশি অতিদারিদ্র্যের হারও বেড়েছে। সরকারি হিসাবে ২০২২ সালে অতিদারিদ্র্যের হার ছিল ৫ দশমিক ৬। তিন বছর পর এসে অতিদারিদ্র্যের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩৫-এ। বাংলাদেশে দারিদ্র্য হ্রাসের হার টেকসই করা যাচ্ছে না। প্রবৃদ্ধির সাফল্য যেমন সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে না, তেমনি বিভিন্ন দুর্যোগে দারিদ্র্য আবার বেড়েও যায়। বিগত সরকারের শেষ সময়ে অর্থনীতিতে যে বিশৃঙ্খল অবস্থা ও লুটপাট চলছিল, তা জনজীবনে মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ফেলছে। জুলাই বিপ্লবের পর সামষ্টিক অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এলেও পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়। নতুন সরকারের উদ্যোগগুলো আশা করি সফলতা দেখাবে।

দেশে সম্পদ ও আয়ের বৈষম্য বেশ প্রকট এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এটি আরো বেড়েছে। ২০২৬ সালের ‘ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি রিপোর্ট’ এবং বিভিন্ন আর্থিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে শীর্ষ এক শতাংশ ধনীর হাতে দেশের মোট সম্পদের প্রায় ২৪ শতাংশ পুঞ্জীভূত। দেশের সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের দখলে রয়েছে মোট সম্পদের ৫৮ শতাংশ। বিপরীতে দেশের দরিদ্রতম ৫০ শতাংশ মানুষের হাতে রয়েছে মোট সম্পদের মাত্র ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। জাতীয় আয়ের প্রায় ৪১ শতাংশ অর্জন করে ওপরের ১০ শতাংশ উচ্চবিত্ত মানুষ, যেখানে নিচের ৫০ শতাংশ মানুষ পায় মাত্র ১৯ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুদ্রাস্ফীতি ও স্থবির মজুরির কারণে স্বল্প আয়ের মানুষ অর্থনৈতিক চাপে রয়েছে, যার ফলে গিনি সূচক গত কয়েক বছরে বেড়েছে। দেশের করব্যবস্থা মূলত পরোক্ষ কর বা ভ্যাটনির্ভর, যা দরিদ্রদের ওপর বেশি চাপ সৃষ্টি করে। সরাসরি আয়করের তুলনায় ধনীদের জন্য উত্তরাধিকার বা সম্পদ করের অভাব এই বৈষম্যকে আরো স্থায়ী করছে। গ্রামীণ এলাকায় নিম্নমানের শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের অভাব নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ওপরে ওঠার সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশে গত এক দশকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও এর সুফল সাধারণ মানুষের তুলনায় উচ্চবিত্তদের কাছে বেশি পৌঁছেছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরান যুদ্ধে মার্কিনদের সমর্থন হ্রাস: ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও তলানিতে

জাকাত ও ইসলামিক সামাজিক অর্থনীতি

আপডেট সময় : ১২:৪৮:১৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৭ মার্চ ২০২৬

কিছুদিন হলো ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন শেষ হয়েছে। চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর দেশের মানুষের মধ্যে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক নিপীড়ন ও অর্থনৈতিক শোষণের জাঁতাকল থেকে মুক্তির জন্য মানুষের মনে তীব্র আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। এর আগেও বহুবার রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছিল, কিন্তু মানুষের ভাগ্যের উন্নতি সেভাবে হয়নি; বরং শোষণ ও বৈষম্যের মাত্রা অনেক সময় বেড়েছে। দেশের ব্যক্তি খাতের আপাতবিকাশ ও সাফল্যে শহর-নগরে কোথাও কোথাও গতি, প্রবৃদ্ধি আর সেবার মান বাড়লেও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমানের দৃশ্যমান উন্নতি লক্ষণীয় হয়নি। এখনো দেশের এক-চতুর্থাংশের বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছেন। পিপিআরসি’র সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, দেশে এখন দারিদদ্র্যের হার প্রায় ২৮ শতাংশ। সরকারি হিসাবেই ২০২২ সালে এই হার ছিল ১৮ দশমিক ৭। দারিদ্র্য বৃদ্ধির এই চিত্র আমাদের উদ্বিগ্ন করে। দারিদ্র্যের পাশাপাশি অতিদারিদ্র্যের হারও বেড়েছে। সরকারি হিসাবে ২০২২ সালে অতিদারিদ্র্যের হার ছিল ৫ দশমিক ৬। তিন বছর পর এসে অতিদারিদ্র্যের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩৫-এ। বাংলাদেশে দারিদ্র্য হ্রাসের হার টেকসই করা যাচ্ছে না। প্রবৃদ্ধির সাফল্য যেমন সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে না, তেমনি বিভিন্ন দুর্যোগে দারিদ্র্য আবার বেড়েও যায়। বিগত সরকারের শেষ সময়ে অর্থনীতিতে যে বিশৃঙ্খল অবস্থা ও লুটপাট চলছিল, তা জনজীবনে মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ফেলছে। জুলাই বিপ্লবের পর সামষ্টিক অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এলেও পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়। নতুন সরকারের উদ্যোগগুলো আশা করি সফলতা দেখাবে।

দেশে সম্পদ ও আয়ের বৈষম্য বেশ প্রকট এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এটি আরো বেড়েছে। ২০২৬ সালের ‘ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি রিপোর্ট’ এবং বিভিন্ন আর্থিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে শীর্ষ এক শতাংশ ধনীর হাতে দেশের মোট সম্পদের প্রায় ২৪ শতাংশ পুঞ্জীভূত। দেশের সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের দখলে রয়েছে মোট সম্পদের ৫৮ শতাংশ। বিপরীতে দেশের দরিদ্রতম ৫০ শতাংশ মানুষের হাতে রয়েছে মোট সম্পদের মাত্র ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। জাতীয় আয়ের প্রায় ৪১ শতাংশ অর্জন করে ওপরের ১০ শতাংশ উচ্চবিত্ত মানুষ, যেখানে নিচের ৫০ শতাংশ মানুষ পায় মাত্র ১৯ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুদ্রাস্ফীতি ও স্থবির মজুরির কারণে স্বল্প আয়ের মানুষ অর্থনৈতিক চাপে রয়েছে, যার ফলে গিনি সূচক গত কয়েক বছরে বেড়েছে। দেশের করব্যবস্থা মূলত পরোক্ষ কর বা ভ্যাটনির্ভর, যা দরিদ্রদের ওপর বেশি চাপ সৃষ্টি করে। সরাসরি আয়করের তুলনায় ধনীদের জন্য উত্তরাধিকার বা সম্পদ করের অভাব এই বৈষম্যকে আরো স্থায়ী করছে। গ্রামীণ এলাকায় নিম্নমানের শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের অভাব নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ওপরে ওঠার সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশে গত এক দশকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও এর সুফল সাধারণ মানুষের তুলনায় উচ্চবিত্তদের কাছে বেশি পৌঁছেছে।