শুরুতেই পরিষ্কার করে বলি, আমি আইনের কিছুই বুঝি না। আমি কোনও প্রতিষ্ঠানকেও প্রতিনিধিত্ব করি না। এখানে যা বলছি, সেটি কেবলই আমার নিজের কথা।
আর আমার ব্যক্তিগত মতামত হলো, শিরোনামের প্রশ্নটিকে ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই।
বাংলাদেশে এখন এমন একটি অবস্থা, যেখানে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের সময় পুলিশ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত হওয়া উচিত কিনা— এই প্রশ্নটি করাটাই যেন রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক। কারও কারও কাছে এটি অভ্যুত্থানের নৈতিক শক্তিকে দুর্বল করার চেষ্টা বলে মনে হয়। এই ব্যাপারটি আমার কাছে অনেকদিন ধরেই খুবই রহস্যময় মনে হচ্ছে। যেকোনও অস্বাভাবিক মৃত্যুর তদন্ত করা যে আমাদের রাষ্ট্রের দায়িত্ব— এই মৌলিক ন্যায়বিচারের ব্যাপারটি কেন কারও মাথায় আসছে না?
জাতি হিসেবে আমাদের কেন এই প্রশ্ন থেকে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হবে, জুলাই আন্দোলনের সময় যে পুলিশ হত্যাকাণ্ড হয়েছিল, সেখানে আসলে কী ঘটেছিল? কারা জড়িত ছিল?
জুলাই-আগস্টের অস্থিরতার সময় অন্তত ৪৪ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটে ৪ আগস্ট সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায়। সেখানে ১৫ জন পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। অনেকেই আত্মসমর্পণ করার চেষ্টা করছিলেন, কেউ কেউ আশপাশের বাড়িতে লুকিয়ে ছিলেন— সেখান থেকে টেনে বের করে হত্যা করা হয়।
শুধু এনায়েতপুর নয়। ঢাকার যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, আশুলিয়া, কুমিল্লা, নোয়াখালী, রংপুরসহ বিভিন্ন জায়গায় পুলিশ সদস্যদের হত্যা করা হয়েছে। কোথাও পিটিয়ে, কোথাও আগুনে পুড়িয়ে, কোথাও গাছে ঝুলিয়ে।
ধরা যাক, এই পুলিশ সদস্যের প্রত্যেকেই সেদিন নিরপরাধ আন্দোলনকারীদের গুলি করছিল। আমার এই ‘ধরা’টি কী ঠিক হলো, না ভুল হলো— সেটি তদন্ত না করে নিশ্চিত বলা সম্ভব নয়। তবুও তর্কের খাতিরে আমি ধরে নিলাম। তারপরও তো এরা ছিলেন কারও বাবা, কারও ছেলে, কারও ভাই। তাহলে সেই পরিবারের কী জানার অধিকার নেই যে, আসলে কী হয়েছিল? বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তি গোলাম আজমও তো আদালতে দাঁড়িয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার পেয়েছিলেন। তাহলে এই মানুষগুলোর মৃত্যুর কারণটি কেন আমরা জানবো না? কেন ময়নাতদন্ত হবে না?
এটি সত্য যে, জুলাই আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল এক গভীর ক্ষোভ থেকে। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানো হয়েছিল। বহু মানুষ নিহত হন। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই।
অর্থাৎ আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর সত্য দাঁড়িয়ে আছে— রাষ্ট্র সহিংসতা করেছে। আবার আন্দোলনকারীদের একটি অংশও সহিংসতা করেছে।
আরেকটি ব্যাপার আমার কাছে ভীষণ রহস্যময়। জুলাই আন্দোলনের একটি বড় ফলাফল হিলো— জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তারা সবাইকে বলে, তারা নতুন ও আরও সুন্দর একটি বাংলাদেশ চায়। আমার প্রশ্ন হলো— আইনের শাসন কি সেই নতুন বাংলাদেশে থাকবে? যদি সেটি তারা চায়, তাহলে অস্বাভাবিক মৃত্যুর তদন্তে তাদের আপত্তি কেন?
তারা কি আশঙ্কা করছে যে, বিএনপি এই মামলাগুলোকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে? নাকি এর পেছনে আরও গভীর কোনও কারণ আছে? তারা কি ভয় পাচ্ছে যে, তদন্ত হলে জুলাইয়ের ঘটনাগুলোর কিছু অস্বস্তিকর সত্য সামনে চলে আসবে?
এই আশঙ্কাগুলো পুরোপুরি অমূলক নয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে ফৌজদারি মামলাকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ক্ষমতায় থাকা সরকার অনেক সময় বিরোধীদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে হয়রানি করেছে।
তাই বলে কি আমরা কোর্ট-কাচারি বন্ধ করে দেবো? পুলিশ কি চাকরি ছেড়ে দিয়ে বাড়ি চলে যাবে?
বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা নিখুঁত নয়। পৃথিবীর কোনও দেশেই বিচারব্যবস্থা নিখুঁত নয়। কোনও দিনই হবে না। আদালত কখনও কখনও রাজনৈতিক চাপের মধ্যে থাকে, তদন্তে ভুল হয়, সরকারি কৌঁসুলী পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে।
কিন্তু যদি আমরা বলি, “বিচারব্যবস্থা পুরোপুরি নিখুঁত না হওয়া পর্যন্ত কোনও হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করা যাবে না,” তাহলে পৃথিবীর কোনও দেশেই কোনও অপরাধের তদন্ত হতো না।
আরেকটি যুক্তিও শুনতে পাচ্ছি। কেউ কেউ বলছেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বিহারিদের ওপর যে হত্যাকাণ্ড হয়েছিল, সেগুলোর তো তদন্ত হয়নি। তাহলে এখন পুলিশ হত্যাকাণ্ড কেন তদন্ত করতে হবে? এই যুক্তি নৈতিকভাবে শক্ত নয়।
এই মানুষরা বলতে চাচ্ছে— অতীতে কোনও অন্যায়ের বিচার হয়নি, তাই বর্তমানেও বিচার না হলেই চলবে! ঐতিহাসিক ব্যর্থতা কখনও নতুন ব্যর্থতার অজুহাত হতে পারে না।
যদি ১৯৭১ সালের পর বিহারিদের ওপর হওয়া হত্যাকাণ্ডের সঠিক তদন্ত না হয়ে থাকে, সেটি আমাদের ইতিহাসের একটি নৈতিক ক্ষত। সেটি নতুন অন্যায়কে ন্যায্যতা দেওয়ার কারণ হতে পারে না।
আমার বরং ভিন্ন একটি প্রস্তাব আছে। দুটো তদন্তই আমরা পাশাপাশি করি না কেন? ১৯৭১ সালের অমীমাংসিত সত্যগুলোও সামনে আসুক। ২০২৪ সালের ঘটনাগুলোরও সত্য বের হয়ে আসুক। সত্যকে ভয় পাওয়ার কী আছে? আমার একটি ভীষণ পছন্দের উক্তি হলো— সূর্যালোক জীবাণুনাশী।
এনায়েতপুরে যা ঘটেছে, তা বাস্তব। যাত্রাবাড়ী বা উত্তরা বা নোয়াখালীর ঘটনাগুলোও বাস্তব। আবার আন্দোলনকারীদের ওপর রাষ্ট্রের গুলিও বাস্তব। এই সত্যগুলো একে অপরকে বাতিল করে না। ন্যায়বিচার মানে এই নয় যে, অন্যায়ের শিকার যারা, তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চালাতে হবে।
যদি পুলিশের হাতে হওয়া হত্যাকাণ্ড তদন্ত হয়, কিন্তু পুলিশের বিরুদ্ধে হওয়া হত্যাকাণ্ড তদন্ত না হয়— তাহলে আইন পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে যায়। আবার যদি শুধু পুলিশের হত্যাকাণ্ড তদন্ত হয় কিন্তু রাষ্ট্রের সহিংসতা চাপা পড়ে যায়— তাহলেও আইন বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। কোনোটিই জাতি হিসেবে আমাদের সামনের দিকে এগোনোর ভিত্তি হতে পারে না।
নতুন নির্বাচিত সরকারকে আমি বলবো, রাষ্ট্রের অপরাধ তদন্ত করুন। জনতার অপরাধও তদন্ত করুন। প্রয়োজনে স্বাধীন কমিশন গঠন করুন। বিচারপ্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করুন। রাজনৈতিক অপব্যবহার ঠেকানোর ব্যবস্থা করুন। কিন্তু রাজনৈতিক অস্বস্তির কারণে ফৌজদারি প্রক্রিয়াকে থামিয়ে দেবেন না। জুলাই যদি সত্যিই দায়মুক্তির অবসানের আন্দোলন হয়ে থাকে, তাহলে সেই দায়মুক্তি বেছে বেছে প্রয়োগ করা যাবে না।
সবশেষে যারা পুলিশ হত্যাকাণ্ডের তদন্তের বিরোধিতা করছেন, তাদের কাছে আমার কয়েকটি সরাসরি প্রশ্ন আছে— আপনারা কি লুকাতে চাইছেন? আপনাদের কেন মনে হচ্ছে, আপনারা আন্দোলনের অংশ হিসেবে কী কী করেছেন, সেটি দেশবাসীর জানার অধিকার নেই? তদন্ত হলে কি আপনাদের কারও কারও ব্যাপারে আমাদের ধারণা খারাপ হয়ে যাবে? কতটুকু খারাপ হয়ে যাবে?
যেকোনও বিপ্লব হলো মানুষের ক্ষমতার পরীক্ষা। কিন্তু বিপ্লব শেষ হওয়ার পর থেকেই শুরু হয় বিপ্লবীদের চরিত্রের পরীক্ষা। আপনারা কেন সেই পরীক্ষায় অটোপাশ চাচ্ছেন? আমরা সবাই যে নতুন দিনের সূর্যের কথা বলছি, তার আলো সবজায়গায় ছড়িয়ে পড়লে ক্ষতি কী?
লেখক: তত্ত্বীয় কোয়ান্টাম কম্পিউটার বিজ্ঞানী
রিপোর্টারের নাম 




















